• বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫
ads
এস কে সিনহার ‘স্বপ্নভঙ্গ’

সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বইয়ের প্রচ্ছদ

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

এস কে সিনহার ‘স্বপ্নভঙ্গ’

গোয়েন্দা চাপে দেশান্তরী ও পদত্যাগে বাধ্য হই

  • প্রকাশিত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সাঈদ আহমেদ/নাজমুল আহসান রাজু

বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা) একটি আত্মজীবনীমূলক বই প্রকাশ করেছেন। ‘অ্যা ব্রোকেন ড্রিম : রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্র্যাসি’ বা ‘একটি স্বপ্নভঙ্গ : আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র’ নামের বইটিতে গোয়েন্দা সংস্থার হুমকিতে তিনি দেশত্যাগ ও পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। বইটি সম্পর্কে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বইটি আমি দেখিনি, পড়িওনি। না পড়ে মন্তব্য করা সমীচীন নয়।

বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান আমাজান ডটকমের ওয়েবসাইটে বইটি বিক্রি হচ্ছে হু হু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভাইরাল হয়েছে বইটির প্রচ্ছদ। কিন্ডেল ভার্সনেও এটি পাওয়া যাচ্ছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে এর বিক্রি শুরু হয়। ৬১০ পৃষ্ঠার এ বইয়ের মূল্য ১০ ডলার।

এস কে সিনহা লিখেছেন, সংসদের বিরুদ্ধে গিয়েছি বলে প্রধানমন্ত্রী ও তার দলের লোকজন আমাকে অভিযুক্ত করেন। আইনমন্ত্রীসহ মন্ত্রীরা আমার বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগ আনেন। যখন আমি আমার বাসভবনে অবরুদ্ধ ছিলাম, তখন বিচারপতি ও আইনজীবীদের আমার সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেওয়া হয়। গণমাধ্যমে খবর আসে, আমি অসুস্থ ও চিকিৎসা ছুটিতে আছি। অনেক মন্ত্রী বলেন, আমি চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাচ্ছি। তিনি আরো লিখেছেন, অধস্তন আদালতের একজন আইনজীবী থেকে বিচারিক সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়ায় বিচার বিভাগের পরিবর্তন ও প্রতিবন্ধকতা দেখার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু ২০১৭ সালে স্বাধীন বিচার বিভাগের পক্ষে একটি ঐতিহাসিক রায় দেওয়ার পর বর্তমান সরকার আমাকে বলপ্রয়োগে পদত্যাগ এবং নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে।

গ্রন্থের সারসংক্ষেপেই উঠে এসেছে ওই সময় তাকে ঘিরে সংঘটিত নানা ঘটনা। তিনি লিখেছেন, ২০১৭ সালে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে একটি ঐতিহাসিক রায় দেওয়ার পর সরকার আমাকে বল প্রয়োগের মাধ্যমে পদত্যাগ এবং নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে। অথচ সেটি ছিল বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সর্বসম্মত একটি রায়। রায়ের পর্যবেক্ষণটি সাধারণ মানুষ ও সুশীল সমাজের প্রশংসা অর্জন করে। দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার (প্রভাবশালী এ সংস্থাটির নাম উল্লেখ রয়েছে) হুমকির মুখে বিদেশে থাকা অবস্থায় পদত্যাগ করেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। 

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন পদত্যাগ করা সাবেক এই প্রধান বিচারপতি।

বইয়ে এস কে সিনহা লিখেছেন, বিচার বিভাগ একটি রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এটি উদার গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। বাংলাদেশের উত্থান হয়েছে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এবং বাহাত্তরের সংবিধানে গণতন্ত্রকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। একই সঙ্গে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়।

তিনি লিখেছেন, অধস্তন আদালতের একজন আইনজীবী থেকে বিচারিক সর্বোচ্চ পদে আসীন হওয়ায় বিচার বিভাগের পরিবর্তন ও প্রতিবন্ধকতা দেখার সুযোগ পেয়েছি। দুঃখজনক ও অভূতপূর্ব ধারাবাহিক ঘটনার শুরু নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা থেকে। ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বিচারকদের অপসারণে সংবিধান সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় আমার বিরুদ্ধে অন্যায় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়। ষোড়শ সংশোধনী বিচারকদের অপসারণে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের (এসজেসি) বিধান উঠিয়ে দেয়। সংবিধান এসজেসির সামনে অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়েছিল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ প্রক্রিয়া বিচার বিভাগকে সুরক্ষা দিয়েছিল রাজনৈতিক নেতাদের খামখেয়ালি আচরণ থেকে। ২০১৬ সালের ৪ মে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ সংশোধনীকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিল। রায়ের পর থেকে সংসদ সদস্যরা আইনসভাকে অকার্যকর করার জন্য বিচারকদের অভিযুক্ত এবং অসম্মান দেখানো শুরু করেন। যা হোক, সরকারপক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিল বেঞ্চের সাতজন বিচারপতি এটি শোনেন। আমি ছিলাম বেঞ্চের প্রধান। ২০১৭ সালের ৩ জুলাই আপিল বিভাগ সর্বসম্মতভাবে সরকারের আপিল খারিজ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। ২০১৭ সালের ১ আগস্ট পর্যবেক্ষণসহ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর  জাতীয় সংসদ সুপ্রিম কোর্টের রায় বাতিল করতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তকে অনুমোদন দেয়। প্রধানমন্ত্রী ও তার দলের লোকজন সংসদের বিরুদ্ধে গিয়েছি বলে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। যখন আমি বাসভবনে অবরুদ্ধ ছিলাম তখন বিচারপতি ও আইনজীবীদের আমার সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেওয়া হয় এবং গণমাধ্যম জানায় আমি অসুস্থ ও চিকিৎসা ছুটিতে আছি। অনেক মন্ত্রী বলেন, আমি চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাচ্ছি। তখন আমি একটি বিবৃতিতে বলেছি, আমি অসুস্থ নই এবং আমি বিদেশেও যাচ্ছি না। আমি আশা করেছিলাম আদালতের অবকাশকালীন ছুটির পর পরিস্থিতি শান্ত হবে এবং সংশ্লিষ্টদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। সরকার বুঝতে পারবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য রায়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং এতে সমগ্র জাতি লাভবান হবে।

শেষ পর্যন্ত দেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা আমার পরিবার ও বন্ধুদের হুমকি দিলে ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হই।

বইটির শেষ প্রচ্ছদে সংক্ষিপ্ত জীবনী রয়েছে বিচারপতি এস কে সিনহার। এতে বলা হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি আইনে ডিগ্রি অর্জন করেন। তার বিচারিক ক্যারিয়ারের শুরু ১৯৭৪ সালে সিলেটের দায়রা জজ আদালতে। ১৯৭৮ সালে হাইকোর্ট বিভাগের এবং ১৯৯০ সালে আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে তিনি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি নিযুক্ত হন এবং ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে পদোন্নতি পান। তিনি বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্য থেকে তিনি প্রথম প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হন ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি। তার এ নিয়োগে অনেক বিতর্ক ও সমালোচনা সৃষ্টি করে। ফলে সরকারের অনেক মন্ত্রী এবং কর্মকর্তাকে সমালোচনার শিকার হতে হয়েছিল। ২০১৭ সালের ১১ নভেম্বর তিনি বিদেশে থাকা অবস্থায় প্রধান বিচারপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ১১ নভেম্বর সিঙ্গাপুরের বাংলাদেশ হাই কমিশনে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন বিচারপতি এস কে সিনহা। এটাই ছিল বাংলাদেশে কোনো প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের প্রথম ঘটনা। ওইদিন সকালে পদত্যাগপত্রটি বঙ্গভবনে পৌঁছে। পরে ১৪ নভেম্বর তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি। এর আগে ১৩ অক্টোবর এক মাসের ছুটি নিয়ে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলেন।

বিচারপতি এস কে সিনহা ছুটিতে গেলে গত ২ অক্টোবর থেকে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিল বিভাগের প্রবীণতম বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হন।

এর আগে ১ আগস্ট উচ্চ আদালতের বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দিয়ে করা ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় প্রকাশিত হয়। রায়ে প্রধান বিচারপতির দেওয়া বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ নিয়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিলেন মন্ত্রী, দলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীদের সংগঠন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের আইনজীবীরা। তারা প্রধান বিচারপতির পদত্যাগের দাবিও তোলেন। সমালোচনার মধ্যেই ১ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছে সুরেন্দ্র কুমার সিনহা হঠাৎ করেই এক মাসের ছুটি চেয়ে চিঠি দেন। ১১ অক্টোবর চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার কথা উল্লেখ করে করা প্রধান বিচারপতির এক আবেদনের প্রেক্ষিতে তার ছুটি ১০ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। গত ১৩ অক্টোবর শেষ রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন প্রধান বিচারপতি। দেশ ছাড়ার আগে তিনি তার বাসভবনের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি অসুস্থ নই। বিচার বিভাগের স্বার্থে ফিরে আসব। ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে একটি মহল প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়েছে।’ তিনি একটি লিখিত বিবৃতিও সাংবাদিকদের দিয়ে যান। পরের দিন সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন পাল্টা একটি বিবৃতিতে জানায় প্রধান বিচারপতির বক্তব্য বিভ্রান্তিমূলক। আরো বলা হয়, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ ওঠার পর তার কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এ কারণে তার সঙ্গে বসতে চাননি আপিল বিভাগের বিচারপতিরা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads