• শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০১৯, ৮ চৈত্র ১৪২৪
ads
বাড়ছে শিশু ক্যানসার

বাড়ছে শিশু ক্যানসার

প্রতীকী ছবি

জাতীয়

বাড়ছে শিশু ক্যানসার

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বাংলাদেশে শিশু ক্যানসার বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। সে হারে অত্যাধুনিক চিকিৎসাসেবা পর্যাপ্ত নয়। উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেক পরিবারই আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসা করাতে পারছে না। তাছাড় এখনো প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো যায়নি। ফলে অনেক শিশুকে বাঁচানো যাচ্ছে না। অন্যদিকে রোগটি সঠিক সময়ে শনাক্ত করা যাচ্ছে না।

সরকারি-বেসরকারি সূত্রগুলো বলছে, এসব কারণে অনেক শিশুর অকাল মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না। এর থেকে উত্তরণে সরকারকে আরো কার্যকর উদ্যোগ হাতে নিতে হবে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে যাতে সচেতনতা তৈরি হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ওয়ার্ল্ড চাইল্ড ক্যানসারের হিসাব মতে, বিশ্বে প্রতিবছর ৩ লাখ শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশেও অন্য রোগের মতো শিশুদের ক্যানসার বাড়ছে। প্রতিবছর ৮ হাজার শিশুর ক্যানসার ধরা পড়ছে। তবে সঠিক কোনো সংখ্যা পাওয়া যায়নি।

তবে দেশের কয়েকটি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা বিচার করে বলা যায়, প্রতি মাসে গড়ে ১১শ শিশু ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, সারা দেশে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৫ লাখের কাছাকাছি হবে।

তবে উচ্চ ব্যয়, পরিবারের বিরক্তি, দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা না থাকায় আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশ বাঁচানো যাচ্ছে না।

জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু হেমাটোলজি ও অনকোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এটিএম আতিকুর রহমান গতকাল টেলিফোনে বলেন, শিশুদের ক্যানসার নিয়ে আমরা অনেক উন্নতি করেছি। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র নেই। শনাক্তকরণসহ চিকিৎসা ব্যবস্থা সারা দেশে রয়েছে। শিশুদের সবচেয়ে বেশি হয় ব্লাড ক্যান্সার। কিন্তু সারা দেশে চিকিৎসা আছে। তবে দেশের সব মেডিকেল কলেজগুলোতে একটি আলাদা বিভাগ খোলা জরুরি। এটি করা গেলে মৃত্যু অনেকটা কমানো যাবে।

তিনি বলেন, পরিবারেরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে। আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি, চিকিৎসা চলাকালে পরিবার হতাশ হয়ে পড়ে। চিকিৎসা বন্ধ করে। কিংবা অনিয়মিত হয়ে যায়। ফলে অনেক শিশুর প্রাণহানি ঠেকানো যাচ্ছে না।

অন্যদিকে সরকারের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম জানান, এই রোগটি নিয়ে আমাদের চিকিৎসাসেবা পর্যাপ্ত করা হয়েছে। তবে শুধু চিকিৎসা পর্যাপ্ত হলে চলবে না। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হতে হবে। যাতে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত করা যায়।

ক্যানসার আক্রান্ত শিশু আফসানা আকতার। তার বয়স এখন ৬ বছর। তিন বছর বয়সে তার ক্যানসার শনাক্ত করেন চিকিৎসকরা। তারপর থেকে টানা তিন বছরের চিকিৎসায় আফসানা এখন সুস্থ প্রায়। তার বাবা মো. আনোয়ার হোসেন জানান, মধ্যবিত্তের জন্য এই রোগ খুবই কষ্টের। তিন বছরে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় শয্যা না পাওয়ায় মেয়েকে নিয়ে যাতায়াত করতে হয়েছে নিয়মিত। এটিও ভোগান্তির। তাই এর চিকিৎসাসেবা সারা দেশে নিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের ৮০ শতাংশই নিরাময়যোগ্য। সেজন্য প্রয়োজন যথাসময়ে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে মরণব্যাধি এ রোগের চিকিৎসা সুযোগ রয়েছে। তবে প্রায় ৮ কোটি শিশুর দেশে ক্যানসার আক্রান্ত শিশুর জন্য চিকিৎসক সংখ্যা পর্যাপ্ত নয়।

রাজধানীর বাইরে ৮টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পদ সৃষ্টি হলেও ডাক্তার নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ইতোমধ্যে ক্যানসার চিকিৎসায় সুনাম অর্জন করলেও সে খ্যাতি অক্ষুণ্ন রাখা এখন জটিল হয়ে পড়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি অ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের এক চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডাক্তার, নার্স, অবকাঠামো আর সরঞ্জামের অভাবে দেশের ৯০ শতাংশ ক্যানসার আক্রান্ত শিশুকে চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে আর্থিক অনটন ও অজ্ঞতার জন্যও অনেক অভিভাবক চিকিৎসা করাতে চান না। যাদের অর্থ-সম্পদ আছে তারা বিদেশে চিকিৎসা করাচ্ছেন। এই চিকিৎসক আরো বলেন, এ রোগের চিকিৎসা দেশেই সম্ভব। সঠিক সময়ে ধৈর্যসহকারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা করালে প্রায় ৮০ শতাংশ রোগী সুস্থ করে তোলা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ডাক্তার, নার্স, অবকাঠামো এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম জরুরি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ না থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জেনিটিক্যাল কারণ, ভাইরাস, খাবারে টক্সিনের উপস্থিতি, কেমিক্যালস, পরিবেশগত সমস্যায় শিশুদের ক্যানসার হয়। শিশুদের সঠিক চিকিৎসার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার যেমন পালংশাক, ব্রুকলি, ডিমের কুসুম, মটরশুঁটি, কলিজা, মুরগির মাংস, কচুশাক, কলা, মিষ্টিআলু, কমলা, শালগম, দুধ, বাঁধাকপি, বরবটি, কাঠবাদাম মতো ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম এবং আয়রযুক্ত খাবার খাওয়াতে হবে এই সময়ে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সূত্র বলছে, ২০১৭ সালে শিশু ক্যানসার ওয়ার্ডে ৭৩৭ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। যার মধ্যে ১৫৭ শিশু মারা গেছে। আংশিক চিকিৎসা নিয়ে চলে যায় ২৬১ শিশু। আর চিকিৎসা নিতে অস্বীকৃতি জানায় ৮৭ শিশুর পরিবার। পুরোপুরি চিকিৎসা নিয়েছে মাত্র ৯৪ শিশু।

ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত নানা রকমের ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন রোগীর অভিভাবকরা। অনভিজ্ঞ ইন্টার্নি ডাক্তারদের দিয়ে এখানে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অনেক রোগীই ভুল চিকিৎসার শিকার হয়।

দেশে ১৯৯৩ সাল থেকে ক্যানসার আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া শুরু হলেও এসব রোগীর জন্য ২০১২ সালে শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি-ব্লক ভবনের তৃতীয় তলায় একটি বিভাগ খোলা হয়। এখন এর পরিধি বাড়ানো জরুরি হয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads