• শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০১৯, ৮ চৈত্র ১৪২৪
ads
বাংলার জাগরণ হবেই : ভাষাসৈনিক আবদুল গফুর

প্রতীকী ছবি

জাতীয়

বাংলার জাগরণ হবেই : ভাষাসৈনিক আবদুল গফুর

  • আল কাছির
  • প্রকাশিত ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

‘বর্তমানে বাংলা ভাষার আরেকটা প্রতিপক্ষ দাঁড়িয়েছে। সেটা হলো ইংরেজি। আমরা ইংরেজির মায়া ছাড়তে পারিনি। অনেক সময় আমরা বাংলার সঙ্গে ইংরেজি মিলিয়ে কথা বলি। আবার বাংলা যেখানে বলা চলে সেখানেও ইংরেজিতে কথা বলি।’ ‘আমি বিশ্বাস করি, ইংরেজি একটা আন্তর্জাতিক ভাষা। তার একটা প্রভাব আছে। তবে আস্তে আস্তে এটা দূর হয়ে যাবে বলে আমি মনে করি।’

আলাপকালে বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে এমনটাই বলেন ভাষাসৈনিক অধ্যাপক আবদুল গফুর। পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক

সংগঠন তমদ্দুন মজলিসের সক্রিয় কর্মী ছিলেন অধ্যাপক আবদুল গফুর। ছাত্রজীবনে তমদ্দুন মজলিসের সঙ্গে নিজেকে জড়িত করেন তিনি। তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাসেমের সঙ্গে অগ্রণী সহযোগীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আবদুল গফুর। ভাষা আন্দোলন ছাড়াও পাকিস্তান আন্দোলন এবং স্বায়ত্তশাসন আন্দোলনের সক্রিয় কর্মীও ছিলেন তিনি। মিছিল, মিটিং ও সেমিনারে বক্তব্য রেখে দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিলেন অধ্যাপক আবদুল গফুর।

ভাষা আন্দোলন ও বিভিন্ন বিষয়ে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ হয় তার। আলাপের শুরুতেই ভাষা সৈনিক অধ্যাপক আবদুল গফুর বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছে কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার আগে থেকেই। যখন ঠিক হলো পাকিস্তান হচ্ছে, তখন তার রাষ্ট্রভাষা কী হবে সেটা নিয়েও আলাপ-আলোচনা চলছিল। কংগ্রেস আগে থেকেই ঠিক করেছিল, ভারতের রাষ্ট্রভাষা হবে হিন্দি। কিন্তু মুসলিম লীগ এ পয়েন্টে বিভক্ত হয়ে গেল। পাকিস্তানের অধিকাংশ অফিসার তখন ছিল উর্দু ভাষী। আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হওয়ার আগেই তারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ধরে নিয়ে পোস্টকার্ড, ইনভেলপ, মানি অর্ডার ফরমসহ আরো বিভিন্ন কিছু ছাপানো শুরু করল। ইংরেজির পাশাপাশি উর্দুতেও ছাপা শুরু হলো। এতে করে এদিকের মানুষের মনের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিল, কিছু প্রশ্নের আর্বিভাব হলো। সে প্রশ্নের জবাবেই ভাষা আন্দোলন শুরু হলো।’

কথা না থামিয়ে তিনি আরো বলেন, সে প্রশ্নের জবাব দিতে এগিয়ে আসলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন পদার্থ বিজ্ঞানের প্রভাষক অধ্যাপক আবুল কাসেম। নতুন রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ভিত শক্তিশালী করার জন্য ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর তার মাধ্যমে জন্ম হয় তমদ্দুন মজলিসের। এই সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রথম প্রতিবাদ জানানো হলো ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ এ নামে একটি বই ছাপানোর মাধ্যমে। সে বইয়ে তিনটি লেখা ছিল। একটি লিখেছেন অধ্যাপক আবুল কাসেম নিজেই। বাকি দুটি লিখেছেন ড. কাজী মোতাহার হোসেন এবং বিখ্যাত সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ। এই তিনটি লেখার মাধ্যমে বাংলাকে কেন রাষ্ট্র ভাষা করা উচিত, সেটা তুলে ধরা হয়েছিল। ৯১ বছর বয়সী এ ভাষা সৈনিক মনে করেন, সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহারের প্রতি অবহেলা ধীরে ধীরে দূর হবে বলে। তার ভাষায়, ‘দেখুন, আমরা যদি পাকিস্তান না পেতাম তাহলে কিন্তু বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন সম্ভব হতো না। যদি অখণ্ড ভারত হিসেবে আমরা স্বাধীনতা পেতাম তাহলে হিন্দি ভাষীর যে বিরাট সংখ্যা তাদের কাছে বাংলার দাবি তুলে তাদের মোকাবেলা সম্ভব হতো না। পাকিস্তান হয়েছে বলেই আমরা বাংলার জন্য আন্দোলন করতে পেরেছি। কারণ গোটা পাকিস্তানের মধ্যে অধিকাংশ লোক কথা বলে বাংলায়।’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা ব্যবহার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি বাংলাদেশ যদি শক্তিশালী হয় তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলার ব্যবহার শুরু হতে আর বেশি সময় লাগবে না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেরও অনেক লোক আছে। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, বিহার মিলিয়ে পৃথিবীতে বাংলাভাষীর সংখ্যা কিন্তু ২০ কোটির ওপরে। প্রায় ২৪-২৫ কোটির মতো। সেজন্য আমি মনে করি, বাংলাভাষীদের সংখ্যার কারণেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলার ব্যবহার বাড়বে। আপনি দেখেন, বিদেশে এক বাঙালির সঙ্গে আরেক বাঙালির দেখা হলে তারা কিন্তু বাংলায়ই কথা বলেন। এটা ক্রমেই বাড়বে। বাংলাদেশ যদি স্বাধীন থাকতে পারে তাহলে তাকে কেন্দ্র করেই বাংলা ভাষীদের জাগরণ হবে এবং বাংলাকে জাতিসংঘের অন্যতম ভাষা করার যে চিন্তা সেটাও সফল হতে পারে।

প্রবীণ এ ভাষা সৈনিকের মতে, স্বাধীনতা রক্ষায় ভাষার চেতনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা রক্ষায় যেমনি বাংলা ভাষাকে শক্তিশালী করতে হবে তেমনি বাংলাদেশকেও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ দরকার। বিশেষ করে ‘আমতলা’। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই আমতলাকে চেনে না। বিষয়টিকে দুঃখজনক বলে উল্লেখ করে অধ্যাপক আবদুল গফুর বলেন, ‘এই স্থানগুলোর সংরক্ষণ দরকার। আমতলায় প্রফেসর আবুল কাসেম নিজে সভা করেছেন। ছাত্র-শিক্ষক মিলে বাংলা ভাষার দাবিতে সভা করেছিল।’

১৯২৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি বৃহত্তর ফরিদপুর (বর্তমান রাজবাড়ী) জেলার পাংশা থানার দাদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই ভাষা সৈনিক। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী আবদুল গফুর দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনে নিজেকে একাধারে শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও সংগঠক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ১৯৪৭ সালে সাংবাদিকতা শুরু করা অধ্যাপক আবদুল গফুর এখনো সে পেশায় নিযুক্ত রেখেছেন নিজেকে। তিনি ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ, ঢাকার আবুজর গিফারী কলেজে অধ্যাপনা করেছেন ১৭ বছর। ১৯৮০ থেকে ৮৯ সাল পর্যন্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রকাশনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলা একাডেমি, নজরুল একাডেমি, আবুজর গিফারী সোসাইটিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন অধ্যাপক আবদুল গফুর। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০০৫ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে।

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads