• মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০১৯, ১২ চৈত্র ১৪২৪
ads
বাংলা ভাষা বাঙালির সত্তা

প্রতীকী ছবি

জাতীয়

বাংলা ভাষা বাঙালির সত্তা

  • হিমেল আহমেদ
  • প্রকাশিত ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ভাষা নিঃসন্দেহে একটি জাতির প্রাণস্বরূপ। লাখো শহীদের রক্তে অর্জিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্রের স্বাধীনতাকামী মানুষ ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। ১৯৭১-এর স্বাধীনতার বীজ রোপণ হয়েছিল ’৫২-র ভাষা আন্দোলনে। বায়ান্ন না পেলে একাত্তরও পেতাম না। একটু ভেবে দেখুন, ১৯৫১’র একুশ এসেছিল বাংলার নির্যাতিত মানুষের মুক্তির পথে হাঁটার অনুপ্রেরণা হিসেবেই। কেননা তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাংলার নিরীহ জনগণের ওপর যেভাবে অন্যায় অবিচার করে চলছিল, তাতে নিঃসন্দেহে প্রতিবাদী হওয়া ছাড়া স্বাধীনতা আন্দোলনও সফল হতো না। বাংলার প্রতিবাদী মানুষের সাহস ও স্বাধীন হওয়ার স্বপ² স্বপ²ই থেকে যেত! বাংলাদেশ আজ বিশ্বের সামনে পাকিস্তানের চেয়ে অনেক এগিয়েছে। অর্থনৈতিক সূচকে অথবা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন প্রমাণ করে বাংলাদেশ পাকিস্তান রাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে আছে যা আমাদের জন্য অনেক বড় এক প্রাপ্তি। এই রাষ্ট্র একসময় আমাদের শোষণ-শাসন করেছে, শুধু ভাষাবৈষম্যতার কারণে অন্যায় অবিচার করেছে। একই ধর্মপ্রধান ভূখণ্ড হওয়া সত্ত্বেও সেই ধর্মের সম্মানও পাকিস্তান তখন রাখতে পারেনি। ভাষাবৈষম্য— যেন বাংলার মানুষের জন্য জন্মগতভাবে নির্যাতিত হওয়ার জন্যই সৃষ্টি করা হলো। বিশ্বের অন্য কোথাও এ ধরনের নিদর্শন পাওয়া যাবে না।

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের কথাই বলি; ভারতে মাতৃভাষার সংখ্যা কয়েকশ। এসআইএল ইন্টারন্যাশনালের হিসাব অনুসারে এদের সংখ্যা ৪১৫। এই ভাষাগুলোর রয়েছে আরো বহু উপভাষা। ১৯৯১ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত আদমশুমারিতে উপভাষাগুলোকে গণনায় ধরে ১ হাজার ৫৭৬টি মাতৃভাষার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুসারে ২৯টি ভাষা আছে, যাতে ১০ লাখ বা তার বেশি লোক কথা বলে। আরো ১২২টি ভাষা আছে যাতে কমপক্ষে ১০ হাজার লোক কথা বলেন। এই ভাষাগুলোর বাইরেও ভারতবর্ষের ইতিহাসে ফারসি ও ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভারত সরকার সংস্কৃত ভাষা ও তামিল ভাষাকে ভারতের দুটি ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী ভারত সরকারের দাফতরিক ভাষা দেবনাগরী অক্ষরে হিন্দি এবং ইংরেজি। হিন্দি এবং ইংরেজি বিভিন্² দাফতরিক কাজে ব্যবহার করা হয়; যেমন- সংসদের কাজে, আইন ও বিচারবিষয়ক কাজে, রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্র সরকারের মধ্যে বার্তা প্রেরণে ইত্যাদি। ভারতের রাজ্যগুলোর স্বাধীনতা আছে তাদের নিজস্ব সরকারি ভাষা ঠিক করার। ভারত দ্বিতীয় কোনো রাষ্ট্র যেখানে বাংলা ভাষার প্রচলন সবচেয়ে বেশি। কলকাতার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলে। ভাষাবৈষম্যের দিক থেকে ভারত অনেক উন্²ত।

বাংলাদেশ-পাকিস্তানের এই ভাষাবৈষম্য স্বাধীনতার স্বপ² দেখিয়েছিল, যার ফলে আমরা আজ স্বাধীন। পাকিস্তান সরকার যখন ঘোষণা দিল- বাংলা নয়, শুধু উর্দু হবে দুই পাকিস্তানের প্রধান ভাষা। পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের মানুষ তখন থেমে থাকেনি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গঠনের পর পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরাই পাকিস্তান সরকারে প্রাধান্য পায়। পাকিস্তান সরকার ঠিক করে উর্দু ভাষাকে সমগ্র পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা করা হবে, যদিও পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু ভাষার প্রচলন ছিল খুবই কম। পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষি মানুষ এই সিদ্ধান্ত মোটেই মেনে নিতে চায়নি। সেই থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষার সমমর্যাদার দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন। পাকিস্তান সরকার ভীত হয়ে ভাষার এই আন্দোলন বন্ধ করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে। এই আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীরা মিলে একটি মিছিল শুরু করেন। মিছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছে এলে পুলিশ মিছিলের ওপর গুলি চালায়। গুলিতে নিহত হন আবদুস সালাম, রফিক, বরকত, জব্বারসহ আরো অনেকে। এ ঘটনার প্রতিবাদে সারা পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং তীব্র আকার ধারণ করে। অবশেষে ১৯৫৬ সালে এসে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয় বাংলাকে স্বীকৃতি দিতে।

বাংলায় কোনো রক্তই বৃথা যায়নি। সব নির্যাতনের জবাব দিয়েছে বাঙালি। বাংলা ভাষাও শহীদদের আত্মত্যাগের রক্তের ওপর হেঁটে অর্জন করেছে তার প্রাপ্য মর্যাদা। এই ভাষা আমার জেনেটিক কোড। আমার সত্তা। বাংলা ভাষার অমর্যাদা কখনো সহনীয় নয়। যদিও দেশে সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা প্রচলিত তবু এই শুদ্ধতা নিয়ে মতবিরোধ আছে, যা অচিরেই দূর করা উচিত। ভাষা শহীদদের সঠিক মূল্যায়নের অভাব রয়েছে অনেকেই অভিযোগ করেন। এদিকেও দৃষ্টি দেওয়া উচিত আমাদের। ভাষা শহীদদের সম্মানে তৈরি শহীদ মিনারের পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও কিন্তু আমাদেরই। একুশ কিংবা একাত্তর,  বাঙালির জীবনের মাইলফলক হিসেবে থাকবে। এই চেতনা ও আদর্শ অনুসারে আমাদের এগুতে হবে। ’৫২-র মতোই হতে হবে অন্যায় অবিচারের প্রতিবাদী। বাংলার ভাষা শহীদদের ঋণ কখনো শোধ হওয়ার নয়। ভাষা শহীদদের জানাই আমাদের অফুরন্ত ভালোবাসা আর শ্রদ্ধা।

 

লেখক : নিবন্ধকার

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads