• বুধবার, ২২ মে ২০১৯, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
সিলিন্ডার বোমায় সয়লাব দেশ

মানহীন সিলিন্ডারে সয়লাব দেশ

ছবি : বাংলাদেশের খবর

জাতীয়

সিলিন্ডার বোমায় সয়লাব দেশ

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

দেশে গ্যাস সিলিন্ডার যেন ভয়ানক বোমায় রূপ নিচ্ছে। মানহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও অনিরাপদ সিলিন্ডার ব্যবহার থামছে না। উল্টো এর ব্যবহারও বাড়ছে। যার কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি। প্রতিনিয়ত কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতিরোধে সরকারের পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। অথচ সরকার সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারে উৎসাহিত করছে সাধারণ মানুষকে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চকবাজারের ঘটনা থেকে সিলিন্ডার গ্যাসের ঝুুঁকি বিবেচনায় এখনই শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় প্রাণহানি ও দুর্ঘটনা থামানো যাবে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রান্না করতে গিয়ে তীব্র গ্যাস সঙ্কট এখন প্রতিদিনের সমস্যা। এমনকি কিছু কিছু এলাকা আছে যেখানে দিনের অধিকাংশ সময়ই গ্যাসের দেখা মেলে না। গ্যাস সঙ্কট থেকে রেহাই পেতে অনেকেই ঝুঁকছেন এলপিজি সিলিন্ডারের দিকে।

অন্যদিকে আবাসিক ভবনে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে কয়েক বছর ধরে। এর ফলেও দেশে এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার বেড়েছে। বেড়েছে গাড়ির সংখ্যাও। আর ব্যয় কমাতে বেশির ভাগ গাড়ি এখন চলছে গ্যাসে। রাজধানীর চকবাজারে গত বুধবার ভয়াবহ আগুনে অন্তত ৭০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রাণহানির এই সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। এই ঘটনায় একাধিক সংস্থা এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। তবে প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে গ্যাসের সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাত। তবে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশে রাসায়নিকের দোকান ও গোডাউন থাকাতে।

বিস্ফোরক পরিদফতরের প্রধান পরিদর্শক মো. শামসুল আলমও একটি কমিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি গতকাল শুক্রবার জানান, আমরা ঘটনাস্থল থেকে অনেক ক্লু পেয়েছি। ধারণা করা হচ্ছে তিনটি কারণে আগুন লাগতে পারে। কারণগুলো হচ্ছে- গ্যাস সিলিন্ডার, বিদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ও কেমিক্যাল বিস্ফোরণ।

বিস্ফোরক পরিদফতর সূত্র বলছে, প্রাকৃতিক গ্যাস রূপান্তরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতেই সিলিন্ডার পরীক্ষা করা হয়। সরকারের রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি (আরপিজিসিএল) ও তার অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান সিএনজি কনভারশন ও পুনঃপরীক্ষা করে থাকে। সারা দেশে পরীক্ষার কেন্দ্র রয়েছে এখন ১৯টি।

গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ন্ত্রণে একটি বিধিমালা রয়েছে। বিধিমালায় বিশদ বিষয় উঠে এসেছে। বিস্ফোরণ রোধে মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিস্ফোরক আইনের শর্ত লঙ্ঘন করে মজুত করা হচ্ছে সিলিন্ডার। অনুমোদন ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিক্রিও করা হচ্ছে এসব সিলিন্ডার। ফলে প্রায় ঘটছে দুর্ঘটনা। মারাও যাচ্ছে অনেকে।

জানা গেছে, সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করার অনুমোদন রয়েছে ৬০টি কোম্পানির। এর মধ্যে ১৫টির বেশি প্রতিষ্ঠান এলপিজি সিলিন্ডার সরবরাহ করছে না। সরকারি হিসাব মতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এলপিজি সিলিন্ডার আমদানি হয়েছে ৩৯ লাখ ৬৪ হাজার ৭২৮টি। আর দেশে তৈরি হয়েছে ১১ লাখ চার হাজার ৩৪৫ সিলিন্ডার। গত পাঁচ বছরে বোতলজাতকরণ হয়েছে এক কোটি ২৩ লাখ সিলিন্ডার। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এসব সিলিন্ডার অনুমোদন ও ব্যবহারবিধি প্রচার করে বিস্ফোরক পরিদফতর।

সূত্রগুলো বলছে, আবাসিক ভবনে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে কয়েক বছর ধরে। গত চার বছরে দেশে এলপিজি সিলিন্ডারের ব্যবহার বেড়েছে পাঁচগুণ। চাহিদা বাড়ায় বাজারজাতকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। ফলে যেখানে সেখানে অবৈধভাবে মজুত করে এই ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার বেচাকেনা বেড়েছে। সরকারও গ্যাসের চাহিদা মোতাবেক জোগান দিতে না পেরে এলপিজিতে যেতে গ্রাহকদের উৎসাহিত করে আসছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী একাধিকবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলেছেন, মূল্যবান গ্যাস ও তার সংযোগ এখন যেনতেনভাবে আর আবাসিকে দেওয়া হবে না। আমাদের আস্তে আস্তে এলপিজিতে যেতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের নীতি হয়তো ঠিক আছে। তবে এলজিপি নিরাপদ না করে এর ব্যবহার বাড়ালে কী পরিণতি হতে পারে, সেটি দেখা গেল চকবাজার ট্র্যাজেডি থেকে। একসঙ্গে ব্যাপক প্রাণহানির কারণে হয়তো বিষয়টি বড় আকারে সামনে এসেছে। কিন্তু সারা দেশে গ্যাস বিস্ফোরণে প্রাণহানি চলছেই। 

বিস্ফোরক দফতরের সূত্র বলছে, বেশির ভাগ দোকানি বিস্ফোরক পরিদফতরের লাইসেন্স ছাড়াই এ ব্যবসা করছে। এলপিজি সিলিন্ডার এখন পাড়া-মহল্লার মুদি দোকানেও পাওয়া যাচ্ছে। এসব দোকানির অনেকেরই ট্রেড লাইসেন্স নেই। গ্যাস সিলিন্ডার বেচাকেনারও অনুমোদন নেই। এসব দোকানে নেই আগুন নির্বাপক যন্ত্র। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে প্রতিকারেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। ঘনবসতিপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা। ফলে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। আর জনবল সঙ্কটের কারণে বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না বিস্ফোরক পরিদফতর।

হিসাব বলছে, ৫০ লাখের বেশি এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বেচাকেনা হয়েছে গত অর্থবছরে। এর আগের অর্থবছরে এই বিক্রির পরিমাণ ছিল ৫২ লাখ ৮৯ হাজার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২১ লাখ ৮৫ হাজার এলপি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই বিক্রির পরিমাণ ছিল মাত্র ১০ লাখ সিলিন্ডার। বর্তমানে লাখ লাখ সিলিন্ডার বিক্রি হলেও সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার মজুতের জন্য সব মিলিয়ে মাত্র ৬ হাজার লাইসেন্স নিয়েছে। এর মধ্যে অনেকে আবার লাইসেন্স নবায়ন করেনি। বেশির ভাগই লাইসেন্স ছাড়া বিক্রি করছে। আবার ৪০টি সিলিন্ডার মজুতের লাইসেন্স নিলেও শত শত মজুত রেখে বিক্রি করছে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর টাঙ্গাইল জেলায় অভিযান চালিয়ে দেখেছে, ৯৫ শতাংশ দোকানে বিস্ফোরক পরিদফতরের লাইসেন্স নেই। অবৈধভাবে সিলিন্ডার বিক্রির অপরাধে ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে সংস্থাটি। বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে ডিলারদের লাইসেন্স আছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখছে না।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পাড়া-মহল্লার, অলি-গলির ছোট ছোট দোকান, খুচরা বাজারের দোকান, আবাসিক এলাকার দোকানগুলোতে যত্রতত্র ফেলে রেখে বিক্রি করছে এলপিজি সিলিন্ডার। আর সিলিন্ডারগুলো মেয়াদ আছে কি না, সেটিও তারা পরীক্ষা করাচ্ছে না ঠিকমতো।

দেশে বিস্ফোরক আইন ১৮৮৪-এর অধীনে গ্যাস সিলিন্ডার বিধিমালা-২০০৪-এর ৬৯ ধারা অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া অনধিক ১০টি গ্যাসপূর্ণ সিলিন্ডার মজুত করা যাবে। তবে সেই বিধির ৭০ ধারা অনুযায়ী, এসব সিলিন্ডার মজুত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি এবং সরঞ্জাম মজুত রাখতে হবে। এলপিজি স্থাপনা প্রাঙ্গণে ধূমপান, দিয়াশলাই বা আগুন লাগতে পারে এমন কোনো বস্তু বা সরঞ্জাম রাখা যাবে না। মজুত করা স্থানের কাছে আলো বা তাপের উৎস থাকা চলবে না। কিন্তু এসব আইনের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।

মো. শামসুল আলম বলেন, বর্তমানে এলপিজি গ্যাস বিক্রির ক্ষেত্রে সারা দেশে ছয় হাজার সনদ আছে। তিনি বলেন, সনদ না নিয়ে বিক্রি করলে বিষয়টি আইন অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসন দেখার কথা। আমাদের জনবল কম থাকায় এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা না থাকায় ব্যবস্থা নিতে পারছে না।

সূত্রগুলো বলছে, একই চিত্র গাড়িগুলোতেও। ব্যয় কমাতে এখনই রাজধানীসহ সারা দেশে গ্যাসের গাড়ি বাড়ছে। নিয়ম মোতাবেক, এসব সিলিন্ডার নির্ধারিত সময় পর পর পরীক্ষা করে নেওয়ার কথা। কিন্তু একটি চক্র সেটি না করেই চালাচ্ছে দিনের পর দিন। এতে তাদের নিজেদের জীবন যেমন ঝুঁকিপূর্ণ হচ্ছে তেমনি পরিবার-পরিজনও আক্রান্ত হচ্ছেন। আর গণপরিবহনে যাত্রীরা আক্রান্ত হচ্ছে। এসব বন্ধ করতে হবে। অসাধু চক্রকে সতর্ক হতে হবে, সচেতন হতে হবে।

গ্যাসচালিত তিন লাখ যানবাহনের সিলিন্ডারের মধ্যে রিটেস্ট করা হয়েছে মাত্র কয়েক হাজার গাড়ির।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৩২শ’ পাউন্ড চাপে যখন গ্যাস ভরা হয় তখন রাস্তায় এক একটি গাড়ি চলন্ত বোমা হয়ে ওঠে। এ জন্য এর সঠিক মান রক্ষা করা জরুরি। সিএনজিচালিত গাড়ির পাঁচ বছরের বেশি পুরনো সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার আইন কেউ মানছে না। রিটেস্টের মেয়াদোত্তীর্ণ প্রায় আড়াই লাখ গাড়ি বিপজ্জনক সিলিন্ডার নিয়ে রাস্তায় রয়েছে। এ অবস্থায় গত কয়েক বছরে রাস্তার ঝুঁকি অনেক বেড়ে গেছে। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) আরপিজিসিএল ছাড়াও এ খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন ও বেসরকারি অপারেটররা পাঁচ বছর বয়সি সিলিন্ডার পরীক্ষার জন্য বার বার তাগাদা দিয়ে আসছে। কিন্তু গাড়ির মালিকরা সিলিন্ডার পরীক্ষার ব্যাপারে তেমন কোনো সাড়া দিচ্ছেন না।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads