• রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ব গণমাধ্যমের অবদান

মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ব গণমাধ্যমের অবদান

সংরক্ষিত ছবি

জাতীয়

মুক্তিযুদ্ধে বিশ্ব গণমাধ্যমের অবদান

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ১৫ মার্চ ২০১৯

পঁচিশ মার্চ রাতের অন্ধকারে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাক হানাদার বাহিনীর সশস্ত্র হামলার তথ্য-সংবাদ প্রচারে বিশ্ব গণমাধ্যমের অনবদ্য ভূমিকা রয়েছে। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক মফিদুল হকের এক লেখা থেকে জানা যায়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বিশ্ব গণমাধ্যমে বহুল আলোচিত ঘটনা এবং মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয় অর্জনে তা অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছিল। পঁচিশ মার্চ কাল রাত থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের সেইসব ঘটনার নির্মমতা, অন্যায্যতার পাশাশাপি পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) স্বাধিকার আন্দোলনের ন্যায্য দাবিকে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকরা মানবিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অবস্থান ছিল মানবিক ও ন্যায়ের পক্ষে। বিদেশি সাংবাদিকদের সেই অবস্থান বিশ্ববাসীর সামনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতাকে যুক্তির সঙ্গে তুলে ধরে এবং পর্যায়ক্রমে সচেতন বিশ্ববিবেকের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়।

মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি গণমাধ্যমের ভূমিকাবিষয়ক তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭১ সালে যুদ্ধের শুরু থেকেই বিদেশি সাংবাদিকরা পাকিস্তানি বাহিনীর ধ্বংসলীলা, নির্মম হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ ও নিপীড়নের বর্বরতার কাহিনী খুব দ্রুত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। আশ্চর্যজনক ব্যাপারটি হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে বিশ্বের বেশ কিছু দেশের সমর্থন না থাকার পরও বাংলাদেশে অবস্থানকারী সেসব দেশের সাংবাদিকরা এই যুদ্ধের অমানবিকতার বিপক্ষে এবং সর্বতোভাবে বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতেও পিছু হটেননি। যদিও পশ্চিমা সরকারগুলো বাংলাদেশের মুক্তির বিরোধিতা করেছিল, তবে সেসব দেশের নবীন সাংবাদিকরা অবস্থান নিয়েছিলেন মানবতার পক্ষে। ক্ষেত্রবিশেষে বাঙালির জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের ন্যায্যতার পক্ষেও তারা অবস্থান নেন। তারা নিজেদের প্রচেষ্টায় পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) স্বাধীনতা আন্দোলনের পক্ষে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের নিষ্ঠুর নির্যাতন ও গণহত্যার বিপক্ষে বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে যে ভূমিকা নিয়েছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসকে তাদের এই ভূমিকা গৌরবান্বিত করে বৈকি।

উল্লেখ করা প্রয়োজন, পাকিস্তান বিষয়ে মার্কিন নীতির সমালোচনায় মুখর থেকেছে সে দেশেরই নিউইয়র্ক টাইমস, নিউজ উইক, ওয়াশিংটন পোস্ট, টাইম এবং নামি-দামি সব কাগজ।

মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, একাত্তরের ২৫ মার্চের গণহত্যার চিত্র যাতে বিশ্ববাসী জানতে না পারে, সেজন্য পাক হানাদার বাহিনী বিশেষ ব্যবস্থাও নিয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিংয়ের জন্য তাদের পরিকল্পনা সফলতার মুখ দেখেনি। লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফে ‘ট্যাঙ্কস ক্রাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান’ শিরোনামে এক প্রতিবেদন লিখে সাইমন ড্রিংই সর্বপ্রথম পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যার খবর বিশ্ববাসীকে জানান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কাল রাতে বাঙালি নিধনে যে গণহত্যা চালানো হয়, এই খবর যাতে বিশ্ববাসী না পায় সে ব্যাপারে পাক শাসকদের ব্যাপক তৎপরতায় ঢাকায় বন্দুকের মুখে সব বিদেশি সাংবাদিককে আটকে রেখে করাচিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কিছু হোটেলকর্মীর সহযোগিতায় সে রাতে হোটেলেই লুকিয়ে থাকেন লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ রিপোর্টার সাইমন ড্রিং এবং ফটোসাংবাদিক মাইকেল লরেন্ট। তারা দুজন হোটেলের ছাদে উঠে চারদিকের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। কারফিউ তুলে নেওয়ার পর শহর ঘুরে অপারেশন সার্চলাইটের নিষ্ঠুরতার আলামতের ছবি তোলেন। শেষ পর্যন্ত প্লেনে করাচি হয়ে ব্যাংকক পৌঁছে সব ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য পাঠান। ডেইলি টেলিগ্রাফে প্রকাশিত ঞধহশং ঈৎঁংয জবাড়ষঃ রহ চধশরংঃধহ, ৭০০০ ঝষধঁমযঃবৎবফ, ঐড়সবং নঁৎহবফ শিরোনামে সেই প্রতিবেদনটিই ছিল পাকিস্তানের সামরিক অপারেশনের প্রথম তথ্যনির্ভর বিবরণ- যা পড়ে বিশ্ববাসী স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। সারা বিশ্ববিবেককে নাড়া দিতে সক্ষম হয় এই প্রতিবেদন।

এপ্রিল মাসে ঢাকার ‘স্বাভাবিক’ অবস্থা বিশ্ববাসীকে জানানোর উদ্দেশ্যে পাকিস্তান সামরিক সরকার ৮ জন সাংবাদিককে ঢাকায় নিয়ে আসে। কিন্তু আমন্ত্রিত সাংবাদিকদের মধ্যে করাচির সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস প্রোপাগান্ডা ছড়াতে সহযোগিতার বদলে তুলে ধরেন প্রকৃত চিত্র। তিনি পূর্ব বাংলায় ১০ দিন অবস্থান করে যুদ্ধাপরাধের নানা তথ্য নিয়ে ‘জেনোসাইড’ শিরোনামে দ্য সানডে টাইমসে ১৩ জুন ১৯৭১ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেন। এছাড়া দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সিডনি শ্যানবাগ, ইতালির সাংবাদিক ওরিয়ানা ফেলাচি, ফরাসি সাংবাদিক বার্নার্ড হেনরি লেভিসহ অনেক বিদেশি সাংবাদিক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি প্রত্যক্ষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলার মুক্তির সপক্ষে বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে দায়িত্বশীল ভূমিকা নেন। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদকরা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে এসে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য প্রকাশ করেন। এভাবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত গণমাধ্যমের প্রতিবেদকরা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ প্রকাশ করেন। ২৬ মার্চ গার্ডিয়ান পত্রিকায় ঢাকা থেকে তাড়ানো বিদেশি সাংবাদিকদের অন্যতম মার্টিন অ্যাডনির তিনটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। তিনি একটি প্রতিবেদনে বলেন, অখণ্ড পাকিস্তানের নামে নিরস্ত্র জনতার ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চলছে সামরিক সরকারের। আর তাতে নিশ্চিত হলো- পাকিস্তান আর এক থাকতে পারে না। দুই বছর, পাঁচ বছর বা ১০ বছর- যত দিনই লাগুক না কেন, দেশটা ভাগ হবেই।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের সংবাদপত্রের পাশাপাশি বেতার কেন্দ্র ‘আকাশবাণী’ দেব দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে যথার্থভাবে তুলে ধরে। এছাড়া সে সময় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, রেডিও অস্ট্রেলিয়া, রেডিও জাপান। নানা দেশে নানান ভাষায় যুদ্ধের খবর প্রচার করে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস। আরো স্মরণীয় ঘটনার অবতারণা করেন বয়সের ভারে ৭০ পেরোনো ফরাসি দার্শনিক আন্দ্রে মালরোর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার ঘোষণা। কবি-গায়ক জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান এবং ভারতের পণ্ডিত রবিশঙ্কর নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে সাড়া জাগানো ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আয়োজন করে বাংলাদেশের সপক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরি এবং ফান্ড সংগ্রহে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। কলিন জ্যাকসনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে বিচিত্র পেশার ১০ সদস্যের দল- ওমেগা। এই দলের সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঙালি শরণার্থীদের জন্য ব্যাপক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যম বিবিসি ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ প্রচার করে, ‘পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের হুলিয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সমর্থকরা এখনো যশোর, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা নিয়ন্ত্রণ করছে।’ টাইম ম্যাগাজিন অত্যন্ত স্পর্শকাতর মানবীয় ভাষায় প্রতিবেদন প্রকাশ করে- ইষড়ড়ফু ইরৎঃয ড়ভ ইধহমষধফবংয নামক দেশটির রক্তিম জন্মলগ্নে রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো পাকিস্তানের পক্ষ নিলেও বিশ্বনন্দিত গণমাধ্যম ও নিয়োজিত সাংবাদিকরা সরব ছিলেন মানবতার পক্ষে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীনের নীতি বাঙালির আকাঙ্ক্ষাবিরোধী হলেও সেসব দেশের গণমাধ্যমের ঐকান্তিক ভূমিকার সুবাদে বাংলাদেশের পক্ষে দ্রুত জনমত গড়ে ওঠে। এসব সাংবাদিকের সাহসী ভূমিকার ফলে বিশ্বের প্রায় সব গণমাধ্যমেই পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের খবর বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপনা করা হয়। যুদ্ধের নির্মমতার ছবি প্রচারের ফলে বিশ্ববিবেক খুব দ্রুত বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন জানায়। যদিও তখন ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যার খবর চেপে রাখতে বিদেশি সাংবাদিকদের ভয়-ভীতি ও দেশ থেকে বের করে দেওয়ার মাধ্যমেও দমানো যায়নি। অকুতোভয়ে সংবাদকর্মীরা নিষ্ঠার সঙ্গে আক্রান্ত পূর্ব বাংলার (বাংলাদেশ) প্রকৃত খবর জানিয়ে দিয়েছেন বিশ্ববাসীকে। এর ফলেই গড়ে ওঠে বিশ্বজনমত। নয় মাসের জীবনক্ষয়ী যুদ্ধে তাদের এই সহায়ক ভূমিকা বাঙালির চূড়ান্ত বিজয় অর্জনে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads