• সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬
ads
পুরো কাজ না করেই সমাপ্ত ১০৬ প্রকল্প

ছবি : সংগৃহীত

জাতীয়

উন্নয়নে অসঙ্গতি

পুরো কাজ না করেই সমাপ্ত ১০৬ প্রকল্প

আইএমইডির প্রতিবেদন

  • জাহিদুল ইসলাম
  • প্রকাশিত ২০ মার্চ ২০১৯

প্রাথমিক শিক্ষার বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্য সামনে রেখে ২০১২ সালে প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির তৃতীয় পর্যায় (পিইডিপি-৩) বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বিশ্বব্যাংকসহ ১৪ দাতা দেশ ও সংস্থা আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে এর কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল ২০১৭ সালের শেষ দিন পর্যন্ত। ১৮ হাজার ১৫৪ কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১৬ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা। বরাদ্দের ১ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা ব্যয় না করেই প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। এর ফলে কাজও বাকি থাকে আট শতাংশ। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এডিপি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল মঙ্গলবার প্রতিবেদনটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় উপস্থাপন করা হয়।

প্রতিবেদনটি পর্যালোচনায় গত অর্থবছরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় ১০৬ প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে কাজ বাকি রেখেই। ওই অর্থবছরে মোট ২৪৬ প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হলেও শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে ১৪০ প্রকল্পের। অবশিষ্ট প্রকল্পের কিছু না কিছু কাজ বাকি রয়েছে। সমাপ্ত ঘোষিত মাত্র ৯টি প্রকল্পের শতভাগ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। বরাদ্দ থাকলেও কিছু না কিছু অর্থ অবশিষ্ট রয়েছে ২৪৭ প্রকল্পের।

কাজ শেষ না করে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণার বিষয়টিকে বরাবরই উন্নয়নে বড় অসঙ্গতি হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে আইএমইডি। তবে এবারের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাস্তবতা বিবেচনা না করেই অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বেশকিছু প্রকল্পের অনেক অংশ বাদ দিতে হয়েছে। এর মাধ্যমে জনগণের অর্থের অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে জাতীয় জীবনে এর সুফল প্রতিফলিত হচ্ছে না।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মীর্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলাম বলেন, প্রকল্প নির্বাচনে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেওয়া হয়েছে। অনেক প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় কাজ জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। তা ছাড়া বাস্তবায়নকারী বিভাগগুলো অনেক সময় মনগড়া ঘোষণা দেয়। জবাবদিহিতার হাত থেকে রক্ষা পেতে এমনটি করা হয়।

আইএমইডির প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ১ হাজার ৭৪০ প্রকল্পের মধ্যে গত অর্থবছর ২৯২টি প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণার জন্য রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৮৮ প্রকল্পের কাজ শেষ ঘোষণা করা হয়েছে। সমাপ্তির জন্য রাখা তালিকার বাইরের আরো ৫৮ প্রকল্প শেষ ঘোষণা করা হয় গত অর্থবছর। সব মিলে মোট ২৪৬ প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে শতভাগ কাজ শেষ হয়েছে ১৪০ প্রকল্পের। আর কোনো না কোনো কাজ বাকি রয়েছে অবশিষ্ট ১০৬ প্রকল্পের।

গত অর্থবছরে শেষ করা হয়েছে এমন প্রকল্পগুলোর আর্থিক অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনের পৃথক তালিকায়। এতে বলা হয়েছে ২৪৬ প্রকল্পের মধ্যে মাত্র ৯টির বরাদ্দ অর্থের শতভাগ ব্যয় হয়েছে। ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১৫৫ প্রকল্পের। সমাপ্ত ঘোষিত ৫০ প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ছিল ৭৬ থেকে ৮৯ শতাংশের মধ্যে। ৫১ থেকে ৭৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে ২৪ প্রকল্পে। সমাপ্ত ঘোষিত দুই প্রকল্পে একটি পয়সাও ব্যয় হয়নি। ২৫ শতাংশের কম অর্থ ব্যয় করে সমাপ্তি টানা হয়েছে চার প্রকল্পের। ২৬ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ব্যয় হয়েছে দুটিতে।

প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদনসহ বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে এডিপি বাস্তবায়নে গতি আসছে না বলে জানিয়েছে আইএমইডি। বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই অনেক প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়। প্রকল্প দলিলে অনেক সময় খাতভিত্তিক ব্যয়ের পরিকল্পনা থাকে না। এর ফলে অনেক সময় নির্দিষ্ট সময়ে ব্যয়ের সীমারেখা মেনে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায় না।

তা ছাড়া ভূমি অধিগ্রহণের কাজ হয় বিলম্বে। আবার অনেক সময় ভূমি অধিগ্রহণে বাড়তি সময় দরকার হয় মামলার কারণে। প্রকল্প পরিচালকের বদলির কারণেও প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হয়। প্রতিবেদনে আইএমইডি বেশ কয়েকটি সমস্যা চিহ্নিত করেছে। পাশাপাশি কয়েকটি সুপারিশও করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পিইডিপি-৩ প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশব্যাপী ৩ হাজার ৬৮৫ শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ, ২ হাজার ৭০৯টি বিদ্যালয় পুনর্নির্মাণ, ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৫৫টি টয়লেট স্থাপন, ৪৯ হাজার ৩০০টি নলকূপ, ৫৩ হাজার ৭৫০টি প্রস্রাবখানা নির্মাণ, ১১ হাজার ৬০০টি শ্রেণিকক্ষ মেরামতের লক্ষ্য সামনে রেখে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। এতে ১৮ হাজার ১৫৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ১৬ হাজার ৬৬৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। অর্থ ব্যয় করতে না পারায় প্রকল্পের আট শতাংশ কাজ বাকি থাকে।

অর্থ ব্যয় ও কাজ বাকি রেখে প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত ঘোষণার কারণে জানতে চাইলে প্রকল্পটির সর্বশেষ পরিচালক (পিডি) প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক ও সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সচিব ড. আবু হেনা মো. মোস্তফা কামাল বলেন, ‘প্রকল্পটি ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এর সমাপ্তি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তবে দুই মাস আগে আমি ওই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে অন্য মন্ত্রণালয়ে এসেছি। এ অবস্থায় কাগজপত্র না দেখে এর কারণ বলা সম্ভব নয়।’ এ বিষয়ে তথ্য জানতে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের বর্তমান মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। অবশ্য অধিদফতরের দায়িত্বে থাকা বর্তমান মহাপরিচাল ড. এএফএম মনজুর কাদির মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি।

আইএমইডির ভারপ্রাপ্ত সচিব আবুল মনছুর মো. ফাইজুল্লাহ বলেন, অনেক সময় এক প্রকল্পের কিছু কাজ হয়তো অন্য কোনো প্রকল্পে চলে যায়। অথবা একই কাজের বিষয়ে অনেক সময় নতুন প্রকল্প নেওয়া হতে পারে। এরকম নানা কারণ থাকতে পারে। এ বিষয়টি আর্থিক বা পরিকল্পনা শৃঙ্খলার পরিপন্থি নয়। তবে কাজ শেষ না করে প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণার প্রকৃত কারণ এই মুহূর্তে বলা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বিশ্বব্যাংকের লিড ইকনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন এ বিষয়ে বাংলাদেশের খবরকে বলেন, পুরো কাজ না করে প্রকল্প সমাপ্ত করলে প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ নাও হতে পারে। কিছু কাজ না করায় যে কাজগুলো হয়েছে সেগুলো থেকেও সুফল প্রাপ্তি দেরি হতে পারে। ফলে কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও মিলতে পারে। সেই সঙ্গে এক্ষেত্রে অপচয়ের সম্ভাবনাও থেকে যায়। তিনি আরো বলেন, এভাবে প্রকল্প সমাপ্ত করার যে কাজ বাকি থাকে সেই কাজটি আর নাও হতে পারে। আবার অন্য কোনোভাবে করার ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দে জটিলতা তৈরি হয়। 

আইএমইডির তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত অর্থবছর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি প্রকল্প শেষ হলেও শতভাগ কাজ হয়েছে মাত্র একটিতে। চার প্রকল্পের কিছু কাজ বাকি রয়েছে। অবশ্য মন্ত্রণালয়ের সমাপ্ত ঘোষিত কোনো প্রকল্পেরই শতভাগ অর্থ ব্যয় হয়নি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের মোট ২২ প্রকল্প সমাপ্ত ঘোষণা করা হলেও শতভাগ কাজ হয়েছে ৯টিতে। কাজ বাকি রেখেই সমাপ্ত করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের ১৩টি প্রকল্প। অবশ্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের সমাপ্ত ঘোষণা করা কোনো প্রকল্পেই বরাদ্দের শতভাগ অর্থ ব্যয় হয়নি। মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের শেষ করা আট প্রকল্পের কোনোটির কাজ শতভাগ শেষ হয়নি। বরাদ্দ অর্থের শতভাগ ব্যয়ও হয়নি কোনো প্রকল্পে। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সমাপ্ত ঘোষণা করা ছয় প্রকল্পের মধ্যে শতভাগ কাজ হয়েছে মাত্র দুটিতে।

সড়ক ও মহাসড়ক বিভাগের ২১ প্রকল্পের শতভাগ কাজ করে সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বিভাগের সমাপ্ত ঘোষণা করা ১২ প্রকল্পের কিছু কাজ বাকি রয়েছে। ৩৩ প্রকল্পের মধ্যে শতভাগ অর্থ ব্যয় হয়েছে মাত্র দুটিতে।

বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) ভবন নির্মাণে নেওয়া ৫৭৯ কোটি টাকার প্রকল্প শেষ করা হয়েছে ৪৫৯ কোটি টাকা ব্যয় করে। কাজ বাকি থাকতেই ২০১৪ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের সমাপনী টানা হয়েছে। অবশ্য এর কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রকল্পটির তৎকালীন পরিচালক বেপজার প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল কবীর।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads