• বুধবার, ২১ আগস্ট ২০১৯, ৬ ভাদ্র ১৪২৫
ads
পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনলে বিশেষ সুযোগ

ছবি : সংগ‍ৃহীত

জাতীয়

পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনলে বিশেষ সুযোগ

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ১৪ মে ২০১৯

ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার রোধ ও পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে বিশেষ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার। জানা গেছে, সরকারের সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে শিগগিরই কার্যকর উদ্যোগ নেবে। আসন্ন বাজেটে বক্তৃতায় এ ব্যাপারে দিকনির্দেশনাও আসতে পারে। তার আগে এ-সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির বৈঠক হবে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এতে সভাপতিত্ব করার কথা রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সরকার পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে বিশেষ সুযোগ দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে। বিদেশে যেসব অর্থ রয়েছে সেগুলো দেশে এনে বিনিয়োগ করলে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে। জানতে চাওয়া হবে না ওইসব অর্থের উৎস। পৃথিবীর অনেক দেশে এমন নজির রয়েছে। বিদেশে সরিয়ে নেওয়া অর্থ দেশে আনতে উৎসাহ দেওয়া হয়। যাতে দেশের অর্থনীতিতে এই অর্থ গতিশীল পরিবেশ তৈরি করে।

বহুল আলোচিত মুসা বিন শমসের ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা (২০ বিলিয়ন ইউরো) দেশে আনার অনুমতি চেয়ে সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছেন। শ্রীলঙ্কার কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন-এর সুইজারল্যান্ড শাখায় এই টাকা সংরক্ষিত আছে। এ অর্থ তার আন্তর্জাতিক বাজারে অস্ত্র ব্যবসার মুনাফার অংশ। তার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অংশীদার আদনান খাসোগির কাছ থেকে তিনি এ অর্থ পেয়েছেন। কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়া তিনি বাংলাদেশে এই টাকা স্থানান্তরের জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

সম্প্র্রতি বিষয়টি জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালকে একটি চিঠি দিয়েছেন মুসা বিন শমসের। ওই চিঠিতে তিনি বলেছেন, এ টাকা দেশে আনা হলে শুধু আমি ও আমার পরিবার উপকৃত হবে না, দেশও সুবিধাভোগী হবে। এজন্য টাকা দেশে আনার ব্যাপারে দ্রুত সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

সরকার মনে করছে, কেবল আইনি কাঠামোতে বিদেশে সরিয়ে নেওয়া অর্থ ফেরত আনা যাবে না। কারণ আন্তর্জাতিক অনেক ব্যাংক অর্থ পাচারকারীদের সুরক্ষা দিয়ে থাকে। তাই দেশে এসব ব্যক্তিকে সুরক্ষা দিতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, পাচার করা অর্থ দেশে আনলে কোনো অসুবিধা হবে না। বিশেষ সহায়তা দিয়ে বিনা প্রশ্নে সেসব অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে। এটি নিশ্চিত করা গেলে বিপুল পরিমাণ অর্থ খুব সহজে দেশে আসবে।

একটি বিশেষ বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বিদেশে আমরা অর্থ পাচার ঠেকাতে চাই। শুধু পাচার ঠেকানো নয়। পাচার করা অর্থ যাতে দেশে ফেরত আসে, তার জন্য আমরা বিশেষ পরিকল্পনা করছি। আমি পারব। আমি ব্যর্থ হইনি। ব্যর্থ হব না। 

এদিকে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স সক্রিয় নয়। ২০১৩ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ অ্যাটর্নি জেনারেলকে আহ্বায়ক করে একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করা হয়। গঠনের পর ৫ বছর চলে গেছে। এই সময়ে হাতেগোনা কয়েকটি বৈঠক হয়েছে এই টাস্কফোর্সের। নিষ্ক্রিয়তার কারণে আগে একই ধরনের দুটি টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করা হয়। একই পথে চলছে তৃতীয় দফায় গঠিত টাস্কফোর্স। 

উচ্চ পর্যায়ের টাস্কফোর্স বিদেশে পাচার হওয়া অর্থসম্পদ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা, তদারকি ও সমন্বয় করার কথা। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রথম এই টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তবে এ যাবৎকালে বড় কোনো সাফল্য আসেনি এর মাধ্যমে। সরকারের ওই কমিটি কেবল কাগজে কমিটি হয়েই রয়েছে।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের ২৮ মে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনে টাস্কফোর্সটি গঠন করে। অ্যাটর্নি জেনারেল এর আহ্বায়ক। বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে গঠিত এ টাস্কফোর্সে রয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), অর্থ মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিরা। ১০ সদস্যের টাস্কফোর্সকে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্বিক সহায়তা দিচ্ছে।     

গত ১০ বছরে (২০০৬ থেকে ২০১৫) বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৩০৯ কোটি ডলার বা ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্ট্রেগ্রিটির (জিএফআই) বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। অবশ্য অর্থ পাচারের এই তথ্য দেশের সরকারের কোনো সংস্থা কখনোই স্বীকার করেনি।

সম্প্রতি বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান জানান, চার হাজার কোটি টাকা পাচারের তথ্য তারা পেয়েছেন। এ নিয়ে তারা অনুসন্ধান করছেন। জিএফআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫৯০ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। ২০১৪ সালে দেশ থেকে পাচার হয়েছিল ৮৯৭ কোটি ডলার। এই হিসাবে ২০১৪ সালের চেয়ে ২০১৫ সালে পাচারের পরিমাণ কমেছে।

সংস্থাটি বলছে, উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ২০ ভাগই পাচার হয়েছে নানা কৌশলে। আর পাচারকৃত টাকার বড় অংশই গেছে আমদানি-রফতানির সময়ে পণ্যের প্রকৃত দাম গোপন করার মাধ্যমে।

জানা যায়, বিগত সময়ে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ বা সম্পদ ফিরিয়ে আনতে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো সংস্থাই তেমন সফল হয়নি। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার ২০১১ সালে সংশ্লিষ্ট টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করে। ওই বছরের ২০ জানুয়ারি দ্বিতীয় দফায় পুনর্গঠিত টাস্কফোর্স গঠন করা হয় তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানের নেতৃত্বে। নয় সদস্যের ওই কমিটিতে সরকারের অন্য সংস্থার প্রতিনিধিরা ছিলেন।

টাস্কফোর্সের দুটি কার্য পরিধি নির্ধারণ করা হয়। এর একটি হলো, বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০০৯-এর বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে ফেরত আনার উদ্যোগ গ্রহণ। অন্যটি হলো, পাচারকৃত অর্থ বা সম্পদ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিদেশি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা ও তথ্য আহরণ। এর পাশাপাশি পাচারকৃত সম্পদ দেশে এনে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে টাস্কফোর্সকে।

বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রথমবারের মতো বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য ২০০৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। সেই টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ।

বাংলাদেশের ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, আমলাসহ বিভিন্ন শ্রেণির প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তবে বর্তমানে অর্থপাচার হয় হুন্ডির মাধ্যমে। আর সেটি হচ্ছে বাণিজ্যনির্ভর কর্মকাণ্ডে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, শক্ত ও সমসাময়িক পদক্ষেপ ছাড়া অভিনব এই অর্থ পাচার কৌশল ঠেকানো যাবে না।  অর্থ পাচারের একটি উপায় হচ্ছে, পণ্য আমদানির সময় কাগজপত্রে বেশি দাম উল্লেখ করে টাকা পাচার, আরেকটি হচ্ছে, পণ্য রফতানি করার সময় কাগজপত্রে দাম কম দেখানো।

রফতানির সময় কম দাম দেখানোর ফলে বিদেশি ক্রেতারা যে অর্থ পরিশোধ করছেন, তার একটি অংশ বিদেশেই থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশে আসছে শুধুমাত্র সেই পরিমাণ অর্থ, যে পরিমাণ অর্থের কথা দেখানো হচ্ছে। বাকিটা রফতানিকারকের বিদেশে কোনো ব্যাংক হিসাবে জমা হচ্ছে।

জিএফআইয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, টাকার অঙ্কের দিক দিয়ে ২০১৫ সালে অর্থ পাচারে শীর্ষ ৩০ দেশের একটি বাংলাদেশ। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। টাকা পাচারের এ প্রবণতা টেকসই উন্নয়নের বড় বাধা। অর্থ পাচার অব্যাহত থাকায় দেশে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা বিরাজ করছে। ধারণা করা হচ্ছে, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে টাকা বের করে নিয়েও অসাধু একটি চক্র বিদেশে পাচার করছে।

জানা গেছে, চলতি সপ্তাহের বৈঠকে পাচারকৃত অর্থ ফেরতে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম হাতে নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ বিভাগ, বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন ও নীতি বিভাগের প্রতিনিধিদের থাকতে বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads