• সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬
ads
ঈদ আনন্দ নেই কৃষকের

ছবি : সংগৃহীত

জাতীয়

ঈদ আনন্দ নেই কৃষকের

  • রায়হান উল্লাহ
  • প্রকাশিত ২৬ মে ২০১৯

ঈদ খুশির বিষয়। মনঃপ্রাণ খুলে আনন্দ করার সময়। কিন্তু এবারের ঈদুল ফিতরে তা করতে পারছেন না কৃষক। বোরো ধানের বাম্পার ফলনে অবশ্য এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। কৃষকদের ঈদের সময়ে সত্যিকারের ঈদ পালন করার কথা। কিন্তু ধান উৎপাদনে খরচ, কাটার মজুরি ও বাকি সব খরচ দিয়ে আর লাভ থাকছে না। এর মাঝে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে কম দামে। সরকারের নির্ধারিত মূল্যেও কৃষকদের পোষাচ্ছে না। যদিও ধান ঘরে তোলা পর্যন্ত সব খরচ যে কোনো মূল্যে মেটাতে হবে তাদের। আর এর জন্য ধান বেচতে হবে। সব মিলিয়ে সারা দেশের কৃষকরা জানাচ্ছেন তাদের এবার সব খরচ মিটিয়ে লাভ হবে না। স্বভাবতই ঈদ আনন্দ নেই তাদের। এর স্থলে যুক্ত হয়েছে উদ্বেগ। তাই নির্ভার আনন্দ পাচ্ছেন না কৃষক।

আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর—

কুড়িগ্রামে আনন্দ নেই, আছে উদ্বেগ : কুড়িগ্রামে এক মণ ধান বিক্রি করে এক কেজি মাংস কিনতে পারছেন না কৃষক। পরিবার-পরিজনদের ঈদ কেনাকাটা নিয়েও দুশ্চিন্তায় চাষিরা। ধানের দাম না থাকায় অনেকেই ঋণ করে ধান চাষ করলেও ঋণ পরিশোধ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। ফলে ঈদ আনন্দ নয় বরং উদ্বিগ্ন সময় পার করছেন চাষিরা।

বর্তমানে ৪৩০ থেকে ৫০০ টাকায় প্রতি মণ ধান বিক্রি হলেও বাজারে এক কেজি গরুর মাংস ৫০০ টাকা, খাসির মাংস ৭০০ টাকাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের কেজি ৪০০ টাকার ঊর্ধ্বে। আবার ঈদ উপলক্ষে পোশাকও বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। ফলে দরিদ্র চাষিরা কয়েক মণ ধান বিক্রি করেও কিনতে পারছেন না এসব সামগ্রী।

এবার চাষিরা বিঘাপ্রতি ১০-১২ হাজার টাকা খরচ করে ফলন পেয়েছেন ২০-২৩ মণ ধান। বাজারে ধানের দাম না থাকায় কৃষকদের বিঘাপ্রতি লোকসান গুনতে হচ্ছে দুই-আড়াই হাজার টাকা। ধান বিক্রি করে সার, তেল, কীটনাশকসহ শ্রমিক মজুরির দাম ওঠাতেই হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা। প্রতি বছরের মতো এবারো অনেকেই ধারদেনা করে চাষ করলেও সেই ঋণ পরিশোধ করতে বিপাকে পড়ছেন।

চিলমারী উপজেলার মাচাবান্দা গ্রামের কৃষক মকবুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হামার কি কেউ খবর নিবে হামার ক্ষতি হইলেই কি আর লাভ হইলেই বা কি?

রাজারহাট উপজেলার টগরাইহাটের কৃষক নজির মিয়া জানান, এক বিঘা জমির বোরো ধান চাষ করতে এবার খরচ গেছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। ফলন পেয়েছেন প্রায় ২১ মণ। বর্তমান ধানের দাম হিসেবে ২১ মণ ধান বিক্রি করলে হয় সাড়ে ৯ হাজার টাকা।

ধানের বাম্পার ফলন হওয়ায় পুরুষ শ্রমিকরা চুক্তিভিত্তিক আর নারী শ্রমিকরা ৩০০ টাকায় দিনমজুর হিসেবে ধান কাটছেন। শ্রমিক ইয়াকুব, মজিবর বলেন, আমরা ১২ জনের একটি দল আছি। চুক্তিভিত্তিক বিঘায় ধানকাটা-মাড়াইসহ ২ হাজার ৮০০ টাকা নিচ্ছি। এতে করে সংসারে মোটামুটি সচ্ছলতা এসেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান প্রধান বলেন, বোরো মৌসুমে বাম্পার ফলন হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে। তবে ধানের মূল্য না থাকায় কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

লোকসান শঙ্কায় মেহেরপুরের কৃষকরা : আমনের পর বোরো ধানেও মার খেয়ে হতাশ মেহেরপুরের কৃষকরা। ঈদের আগ মুহূর্তে এ ধরনের ক্ষতি তাদের কষ্ট আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। উৎপাদন খরচ না ওঠায় তারা হতাশ।

তবে জেলার ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রক বলছেন, সরকার তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা শুরু করেছে।

এদিকে কৃষকরা বলছেন, কৃষক বাঁচানোর কথা বলে খাদ্য মন্ত্রণালয় এবার বোরো সংগ্রহ অভিযানের তারিখ এগিয়ে আনলেও বাস্তবে এর সুফল তারা পাচ্ছেন না।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর প্রতি কেজি বোরো ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে সাড়ে ২৪ টাকা। আর প্রতি কেজি চালের উৎপাদন খরচ পড়েছে ৩৬ টাকা। এই হিসাবে প্রতি মণ ধানের উৎপাদন খরচ হয়েছে ৯০০ টাকা। অথচ বাজারে প্রতি মণ বোরো ধান বিক্রি হচ্ছে ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি মণ ধানে কৃষকের লোকসান হচ্ছে ৪০০ টাকা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. আক্তারুজ্জামান জানান, এবার তিন উপজেলায় একুশ হাজার ৫২৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে, যা থেকে ধান উৎপাদন হয়েছে ৮৭ হাজার ৬০০ টন।

সদর উপজেলার তেরঘরিয়া গ্রামের আবদুর রহিম বলেন, ‘এবার সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে ৮ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছি। ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারে ধানের যে দাম, তাতে উৎপাদন খরচই উঠবে না। সব মিলিয়ে প্রতি মণ ধানের পেছনে আমাদের প্রায় ৯০০ টাকা খরচ হয়েছে। বাজারে প্রতি মণ ধানের দাম ৪৫০-৫০০ টাকা। আমরা এই ক্ষতি কীভাবে পোষাব?’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ড. আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘এই সময় ধানের বাজার কিছুটা কম। কৃষক এখন যদি ধান সংরক্ষণ করে রাখতে পারে তবে কয়েকদিন পরেই বেশি দাম পাবে। তিনি বলেন, জেলার আট হাজার কৃষকের তালিকা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের অফিসে পাঠানো হয়েছে।

জেলার ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রক আবদুল হামিদ বলেন, ‘স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে সরবরাহ করা সদর, মুজিবনগর ও গাংনী উপজেলার আট হাজার তালিকাভুক্ত কৃষকের কাছ থেকে মানসম্পন্ন ৬৩২ টন ধান এবং খাদ্য অফিসের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ২৫ জন মিলারের কাছ থেকে এক হাজার ৫২৯ টন সেদ্ধ চাল সংগ্রহ করা হবে।

মাশরাফির নির্দেশে নড়াইলে সরকারিভাবে ধান ক্রয় : গত রোববার রাতে নড়াইল জেলা প্রশাসক আনজুমান আরাকে ফোন করেন বাংলাদেশের ক্রিকেট সেনসেশন মাশরাফি বিন মুর্তজা। তাকে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয়ের নির্দেশ দেন তিনি। সরকারিভাবে ধান কেনার ক্ষেত্রে কৃষকরা যেন বঞ্চিত ও হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য দরকারি ব্যবস্থা গ্রহণেরও পরামর্শ দেন নড়াইলের এই সংসদ সদস্য।

এরপরই নড়াইলের কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনছে সরকার। ন্যায্যমূল্য পেয়ে খুশি তারা। স্বাভাবিকভাবেই শুকরিয়া আদায় করছেন কৃষকরা। তারা বলছেন, প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে ধান বিক্রি করতে পারছি। এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads