• বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৫
ads

জাতীয়

আজ বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস

ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে বস্তির ২৩ শতাংশ শিশু

  • জাহিদুল ইসলাম
  • প্রকাশিত ১২ জুন ২০১৯

২০১৬ সালেই বাংলাদেশ থেকে শিশুশ্রম নির্মূলে সরকারের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্ব থেকে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নিরসন এবং ২০২৫ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম নির্মূল করার লক্ষ্য রয়েছে জাতিসংঘের। বৈশ্বিক এ সংস্থাটির লক্ষ্য পূরণ করাও বাংলাদেশের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দেশের নগর অঞ্চলে এখনো সাড়ে ১২ শতাংশ শিশু কাজে নিয়োজিত আছে। নগরের বস্তি এলাকার ২৩ শতাংশের বেশি শিশু জীবিকার তাগিদে কোনো না কোনো কাজ করছে। সব মিলে দেশে এখনো সাড়ে ৩৪ লাখ শিশু কাজে নিয়োজিত আছে বলে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আজ বুধবার বাংলাদেশেও পালন করা হচ্ছে আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস।

শিশুশ্রম নয়, শিশুর জীবন হোক স্বপ্নময়’ এই স্লোগানে এবার দিবসটি পালন করা হচ্ছে। দিবসটির গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বাণী দিয়েছেন। এছাড়া শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, আইএলও ঢাকা অফিস, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম বিশেষ নিবন্ধ প্রকাশ ও বিশেষ প্রকাশনা, আলোচনা অনুষ্ঠান, পোস্টার, লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। পরিসংখ্যান ব্যুরো সূত্র জানিয়েছে, সরকার ও জাতিসংঘের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে আগামী কয়েক বছরে সাড়ে ৩৪ লাখ শিশুকে পুনর্বাসন করতে হবে। বিশাল এ লক্ষ্য পূরণে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় সুনির্দিষ্টি প্রকল্প নেই। ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের পুনর্বাসনে নেওয়া প্রকল্পের পরিধিও পর্যাপ্ত নয়। শ্রম  ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত প্রায় ২ লাখ শিশুকে পুনর্বাসন করতে চায়। এ লক্ষ্য পূরণ হলেও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে থাকবে আরো প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার শিশু।

জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) সহায়তায় গত বছর নগর অঞ্চলের শিশুদের সার্বিক কল্যাণ পরিস্থিতি নিয়ে জরিপ করেছে বিবিএস। এতে বলা হয়েছে, দেশের শহর অঞ্চলের ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৮ দশমিক ১ শতাংশ শিশু জীবিকার তাগিদে কাজে যুক্ত রয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকার বস্তিতে এর হার ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ। সিটি করপোরেশনে বস্তির বাইরে থাকা সাত শতাংশ শিশু কর্মে নিয়োজিত। সিটির বাইরে অন্যান্য শহরে ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত ৮ দশমিক ২ শতাংশ শিশু কাজ করছে।

অন্যদিকে দেশের শহর অঞ্চলের ১ থেকে ১৭ বছর বয়সী সাড়ে ১২ শতাংশ শিশু জীবিকার তাগিদে কাজে যুক্ত রয়েছে। সিটি করপোরেশন এলাকার বস্তিতে এর হার ২৩ দশমিক ১ শতাংশ। সিটি করপোরেশনে বস্তির বাইরে থাকা ১২ শতাংশ শিশু কর্মে নিয়োজিত। সিটির বাইরে অন্যান্য শহরে ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত ১২ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু কাজ করছে।

শিশুশ্রম নিয়ে সর্বশেষ ২০১৩ সালে জরিপ করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় সাড়ে ৩৪ লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত আছে। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত ১২ লাখ ৮০ হাজার। আর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে আছে ২ লাখ ৬০ হাজার শিশু। ২০০৩ সালে দেশে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪২ লাখ। ওই সময় ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩ লাখ। সে হিসেবে এক দশকের বেশি সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমিকের সংখ্যা মাত্র ২০ হাজার কমেছে।

অবশ্য ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ৯০ হাজার শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে বের করে আনা হয়েছে বলে দাবি করছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এ সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্যায়ে ১০ হাজার, দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩০ হাজার এবং ৩য় পর্যায়ে ৫০ হাজার শিশুকে পুনর্বাসনের লক্ষ্য ছিল তাদের। তিনবারে ৯০ হাজার শিশু পুনর্বাসনের কথা থাকলেও ঠিক কতটুকু কাজ হয়েছে এবং কত শিশু এ থেকে সুফল পেয়েছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ে নেই। এ অবস্থায় আরো ২ লাখ শিশুকে পুনর্বাসনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে ২৮৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয় ধরে প্রকল্পটির চতুর্থ পর্যায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের শিশু বাজেটে বলা হয়েছে, গত তিন বছরে শিশু সুরক্ষায় নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইএলও আইপেক প্রোগ্রামের আওতায় ৯১টি অ্যাকশন প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকা প্রণয়ন করে তিন বছরে ৫০ হাজার শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম থেকে সরানো হয়েছে। আগামীতে এক লাখ শিশুকে উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় আনা হবে। আরো এক লাখ শিশুকে দেওয়া হবে কারিগরি প্রশিক্ষণ। প্রকল্পের আওতায় আসা শিশুরা প্রতি মাসে এক হাজার টাকা করে বৃত্তি পাবে।

বিবিএস সূত্র জানায়, কর্মক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত ধমক, অপমান, প্রহার বা শারীরিক আঘাত এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে শিশুরা। কর্মে নিয়োজিতদের মধ্যে গড়ে ১৭ দশমিক এক শতাংশ শিশু ধমকের শিকার হচ্ছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় এরকম নির্যাতনের শিকার ২৬ শতাংশ শিশু। গ্রামে ১৬ দশমিক তিন শতাংশ শিশুশ্রমিক নিয়োগকর্তার ধমকের শিকার হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে প্রহার বা শারীরিক আঘাতের শিকার হচ্ছে এক দশমিক দুই শতাংশ শিশুশ্রমিক। যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে মোট দুই দশমিক পাঁচ শতাংশ শিশুশ্রমিক। এর মধ্যে ছেলে শূন্য দশমিক চার শতাংশ এবং মেয়ে শিশু পাঁচ দশমিক ছয় শতাংশ। এক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন এলাকায় যৌন নির্যাতনের হার সবচেয়ে বেশি। সিটি করপোরেশনে যৌন নির্যাতনের শিকার হয় নয় দশমিক সাত শতাংশ এবং গ্রামে এক দশমিক তিন শতাংশ শিশু।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ১২ থেকে ১৩ বছর বয়সের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ধমক বা অপমানের শিকার হয়। এছাড়া প্রহার বা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয় সবচেয়ে বেশি ছয় থেকে ১১ বছরের শিশুরা। অন্যদিকে ১৪ থেকে ১৭ বছরের শিশুরা সবচেয়ে বেশি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়।

শিশুরা কোন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত আছে তার একটি চিত্রও উঠে এসেছে পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে। এতে বলা হয়েছে, ধুলা, ময়লা, ধোয়া এবং কাঁপুনি যুক্ত স্থানে কাজ করে ১৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ শিশুশ্রমিক। আগুন, গ্যাস ও স্ফুলিঙ্গময় স্থানে কাজ করে তিন দশমিক ১৬ শতাংশ শিশুশ্রমিক। অতি ঠান্ডা বা অতিমাত্রায় গরম পরিবেশে কাজ করে তিন দশমিক ৭২ শতাংশ শিশুশ্রমিক। বিপজ্জনক যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করে আট দশমিক ৫৮ শতাংশ শিশুশ্রমিক। খুবই নিচু বা উঁচু স্থানে কাজ করে এক দশমিক ৫৫ শতাংশ শিশুশ্রমিক। পানি বা পুকুর বা নদীতে কাজ করে এক দশমিক এক শতাংশ শিশু। অন্ধকার বা সীমাবদ্ধ পরিবেশে কাজ করে এক দশমিক ৬৬ শতাংশ শিশু, রাসায়নিক বা বিস্ফোরক দ্রব্য আছে এমন পরিবেশে কাজ করে এক দশমিক ৪৮ শতাংশ এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করে থাকে শূন্য দশমিক  ৬৪ শতাংশ শিশু।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads