• বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
ads
ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে চাপে পড়বে মানুষ

ছবি : সংগৃহীত

জাতীয়

ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে চাপে পড়বে মানুষ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৩ জুন ২০১৯

সাধারণ বাস থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস, আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁসহ ট্যারিফ হারে ভ্যাট আরোপ হওয়াতে সাধারণ মানুষের ওপর খরচের চাপ বাড়বে। প্রতিটি ক্ষেত্রে গুনতে হবে অতিরিক্ত টাকা। সাধারণ ভোক্তার কাছ থেকে ভ্যাটের ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা আদায় হবে। এতে সব ধরনের ব্যয় বাড়বে। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

নতুন ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) আইন সংসদে পাস হয় ২০১২ সালে। এরপর আইনটি ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। কিন্তু বাস্তবায়ন শুরুর মাত্র দুই দিন আগে তা দুই বছর পিছিয়ে দেওয়া হয়। দুই বছর স্থগিত থাকার পর আগামী অর্থবছর (২০১৯-২০) অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করা হবে বলে বর্তমান সরকারের নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেন, আগামী জুলাই মাস থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হবে।

এদিকে এনবিআর সূত্র জানায়, এবার বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভ্যাট থেকে আদায় করা হবে ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা। যা ভোক্তাদের দিতে হবে। এতে সাধারণ মানুষের বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে। যদিও এনবিআর বলছে সবদিক বিচার-বিশ্লেষণ করেই ভ্যাটের হার নির্ধারণ করা হয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, ৩০ জুন বাজেট পাস হবে। আর ১ জুলাই থেকে তা কার্যকর হবে। ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুড শপ, মিষ্টান্ন ভান্ডার, আসবাবপত্রের বিক্রয়কেন্দ্র, পোশাক বিক্রির কেন্দ্র ও বুটিক শপ, বিউটি পার্লার, ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রিক্যাল গৃহস্থালি সামগ্রীর বিক্রয় কেন্দ্র, কমিউনিটি সেন্টার, অভিজাত শপিং সেন্টারের অন্তর্ভুক্ত সব ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, জেনারেল স্টোর ও সুপার শপ, বড় ও মাঝারি ব্যবসায়ী (পাইকারি ও খুচরা) প্রতিষ্ঠানে। এতে যেকোনো পণ্য ক্রয়ের সঙ্গে একজন ভোক্তাকে ভ্যাট পরিশোধ করতে হবে। ফলে বাড়বে জীবনযাত্রার ব্যয়।

এদিকে সংশ্লিষ্ট অনেকে বলছেন, ভ্যাট আইন কার্যকর করাই বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকরের পর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে বিভিন্ন সময় অর্থনীতিবিদরা বিভিন্ন ধরনের কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিষয়টি নিয়ে একটি বিশ্লেষণ তৈরি করা হয়েছে। কিছুদিন আগে তা অর্থ মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছে।

অবশ্য অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এবারের বাজেটের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর করা। কারণ, ব্যবসায়ীদের খুশি রাখতে হবে। তবে ভোক্তা বা জনগণকে চাপে ফেলা যাবে না। এদিকে আবার বাড়তি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য অর্জন করতেই হবে। এই ত্রিমুখী চাপ সামাল দিয়ে আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ এই আইনটি বাস্তবায়ন করতে হবে অর্থমন্ত্রীকে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং দাতাদের চাপ তো আছেই। ফলে সবাইকে খুশি রেখে খুব সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হবে অর্থমন্ত্রীকে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক কর্মকর্তা ও গবেষণা সংস্থা পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, নতুন আইনে যেসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে, তা কার্যকর হলে এবং সর্বক্ষেত্রে রেয়াতের সুযোগ না রাখলে করের বোঝা বাড়বে। এতে করে পণ্যদ্রব্যের দাম বাড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশীয় শিল্প খাত। চাপে পড়বে সাধারণ মানুষ।

যদিও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া দাবি করছেন, নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হলে জনগণের ওপর করের চাপ বাড়বে না।

নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে যেসব খাতে প্রভাব পড়তে পারে তা হচ্ছে, নির্মাণসামগ্রীর অন্যতম উপকরণ রড, ইট; সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ওষুধ, ভোজ্য তেল, আবাসন খাতের সিআইশিট, এমএস প্রোডাক্ট, লেখার কাগজ ও নিউজপ্রিন্ট, বিভিন্ন জাতের মশলাসহ এ রকম প্রায় ১০০টি দেশীয় পণ্য আছে। জনস্বার্থে এসব পণ্যে বিশেষ ছাড় দিয়ে ট্যারিফ মূল্য ভিত্তিতে কম হারে ভ্যাট আদায় করা হয় বর্তমানে। নতুন আইনে ট্যারিফ ভ্যালু বাতিলের কথা বলা হচ্ছে। এর পরিবর্তে বাজার মূল্যে প্রযোজ্য হারে ওই সব পণ্য থেকে ভ্যাট আদায় করা হবে। কোনো ধরনের রেয়াত থাকছে না। এতে করে ওই সব পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়বে এবং জনজীবনে চাপ আসবে। এ ছাড়া বর্তমানে সেবা খাতের হোটেল, রেস্টুরেন্ট, নির্মাণ সংস্থা, আসবাব, স্বর্ণালংকার, তথ্যপ্রযুক্তিসহ ১৬টি খাত রয়েছে, যেখানে মূল্য সংযোজনের ওপর বা আংশিক মূল্যের ওপর ভ্যাট আহরণ করা হয়। নতুন আইনে এই নিয়ম বাতিল করে প্রকৃত লেনদেনের ওপর ভ্যাট আরোপের কথা বলা হচ্ছে। এ নিয়ম কার্যকর হলে ওই সব সেবা খাতের খরচ বাড়বে এবং জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

ভ্যাট বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে কথা হয় বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ভ্যাট বাস্তবায়নের বিষয়টি পুরোপুরি ক্লিয়ার করা প্রয়োজন। আর কীভাবে ভ্যাট আদায় করা হবে-তা-ও ব্যবসায়ীদের স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এদিকে গত মঙ্গলবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বাজেট বিষয়ে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। তার মধ্যে অন্যতম ছিল-কৃষি খাতে গুরুত্বের বিষয়টি। কিন্তু ভ্যাট বাস্তবায়নে এদের ওপরও প্রভাব পড়বে। কারণ একজন কৃষকও একজন ভোক্তা।

এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারের সঙ্গে ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সরকার ভ্যাট আরোপের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখবে। তবে ভ্যাট আইন বাস্তবায়নে এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয় এনবিআর। কয়েক বছর ধরে ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিলেও অদ্যাবধি ইফডি মেশিনের বিষয়ে কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। এখনো ইফডি মেশিন আমদানির বিষয়টি অস্পষ্ট। আমদানির বিষয়ে টেন্ডার করলে এখনো ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভ্যাট আদায় করার মেশিন পৌঁছায়নি।

এনবিআর কর্মকর্তারা বলছেন, ভ্যাট বাস্তবায়নে প্রস্তুত এনবিআর। আর সব ধরনের বিচার-বিশ্লেষণ করে এনবিআর ভ্যাটের হার চূড়ান্ত করেছে। তবে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকর হলে মধ্যবিত্তের ওপর কিছুটা চাপ বাড়বে বলে জানান তারা।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads