• বুধবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
রংপুরে দাফন চায় বিভাগীয় জাপা, আজ সিদ্ধান্ত

ছবি : সংগৃহীত

জাতীয়

সংসদ থেকে চিরবিদায় এরশাদের

রংপুরে দাফন চায় বিভাগীয় জাপা, আজ সিদ্ধান্ত

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৬ জুলাই ২০১৯

দ্বিতীয় দিনেও অশ্রুভেজা শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের ঢল নেমেছিল তাকে একনজর দেখার জন্য। মানুষের আহাজারিতে জাতীয় সংসদ আর তার দলীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। দিনভর মানুষের মুখে মুখে ছিল এরশাদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা। আজ মঙ্গলবার সকালে এরশাদের লাশ নেওয়া হবে তার পৈতৃক বসতি রংপুরে। বাদ জোহর সেখানে জানাজা শেষে লাশ ঢাকায় আনা হবে। সেনা কবরস্থানেই দাফন করা হবে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তাকে।  

গতকাল সোমবার দ্বিতীয় নামাজে জানাজা জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, চিফ হুইপ নূর ই আলম চৌধুরী লিটন, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-সংসদ সদস্যসহ নানাস্তরের মানুষ এতে অংশ নেন। জানাজা শেষে মরহুমের মরদেহে শ্র্রদ্ধা নিবেদন করেন তারা।

সকাল সাড়ে ৯টায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মরদেহ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) হিমঘর থেকে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নেওয়া হয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে দক্ষিণ প্লাজার টানেলের নিচে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৯০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। প্রথমদিন তার নামাজে জানাজা বাদ জোহর ঢাকা সেনানিবাস কেন্দ্রীয় মসজিদে সম্পন্ন হয়।

সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা শেষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ প্রথমে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কফিনে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার সামরিক সচিব, জাতীয় সংসদের স্পিকারের পক্ষে সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস, ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দলের সিনিয়র নেতারা, জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কফিনে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি জাতীয় মহিলা পার্টির সভানেত্রী হিসেবে এ সময় মহিলা পার্টির পক্ষে এরশাদের কফিনে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।

জানাজার আগে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন তার স্ত্রী ও বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ এবং আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত পাঠ করেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা। পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন তার ছোট ভাই ও জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের।

রওশন এরশাদ কান্নাজড়িত কণ্ঠে স্বামীর পক্ষে দেশবাসীর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করার পাশাপাশি দোয়াও কামনা করেন।

তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘এরশাদ সাহেব একজন ভদ্র, মার্জিত মানুষ ছিলেন। মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন।’ তিনি তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।

জানাজায় অংশ নিতে সকাল থেকেই জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দলে দলে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আসতে থাকেন। জানাজাকে ঘিরে পুরো সংসদ ভবন এলাকায় তিনস্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা হয়।

ঠিক ৫ মাস ৫ দিন আগে ১০ ফেব্রুয়ারি এই সংসদেই এসেছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে। সেদিন হুইল চেয়ারে করে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন তিনি। সোমবার শেষ বিদায় নিতে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আসে সাবেক রাষ্ট্রপতির লাশের কফিন।

জানাজায় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, মাহবুব উল আলম হানিফ, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, শামসুল হক টুকু, এবি তাজুল ইসলাম, কর্নেল (অব.) ফারুক খান, এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, সাবের হোসেন চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া, মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার, আবদুস সোবহান গোলাপ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা, প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কাজী ফিরোজ রশীদ, সৈয়দ আবু হাসান বাবলাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিরা শরিক হন।

এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় রাজধানীর কাকরাইলে, তার প্রতিষ্ঠিত দল জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। সেখানে তাকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানান দলের নেতাকর্মীরা। পরে সেখান থেকে এরশাদের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে। সেখানে তার তৃতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে আবারো সিএমএইচের হিমঘরে রাখা হয় সাবেক এই রাষ্ট্রপতির মরদেহ। আজ মঙ্গলবার হেলিকপ্টারে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে তার নিজের এলাকা রংপুরে। সেখানকার জিলা স্কুল মাঠে এরশাদের চতুর্থ জানাজা হবে। এরপর সেখান থেকে মরদেহ ঢাকায় এনে দাফন করার কথা রয়েছে। তবে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা বলেছেন, সিদ্ধান্ত পরিবর্তনও হতে পারে। এরশাদের দাফন বিষয়ে আজ মঙ্গলবার সকালে সিদ্ধান্ত হবে।

 

শেষবারের মতো দলীয় কার্যালয়ে এরশাদ

এদিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় দ্বিতীয় দফা জানাজা শেষে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মরদেহ আনা হয় রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। দুপুর ১২টার দিকে যখন লাশবাহী গাড়িটি পৌঁছায়, চারদিকে তখন নেতাকর্মীদের কান্নার শব্দ। তারপর থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও শেষ হতে চাইছে না মানুষের দীর্ঘ লাইন। সাবেক এই রাষ্ট্রপতিকে একবার হলেও দেখেছেন তারা। পার্টি অফিসের মূল ফটকের সামনে লাশবাহী শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িটি রাখা হয়। মরদেহের মাথার কাছে গাড়ির দরজা খুলে দেওয়া হয়। আর গ্লাসের ওপর দিয়ে শেষ দর্শন করছেন নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ। পশ্চিম দিকে লম্বা লাইন ধরে এগিয়ে এসে কেউ ফুল দিয়ে, কেউবা চোখের জল রেখে চলে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ হাউমাউ করে কেঁদে আর্তনাদ করেছেন। এদের অনেকেই দলের কোনো নেতা বা কর্মী নন। অনেক সাধারণ মানুষকেও দেখা গেছে নীরবে চোখ মুছে এক পলক দর্শন করতে।

জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় নেতারা, ঢাকা মহানগর উত্তর এবং দক্ষিণ ছাড়াও বিভিন্ন জেলা থেকে আগত দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন এরশাদের কফিনে। এ ছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জেএসডি, বাংলাদেশ পিপলস পার্টি, জনদলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে এরশাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা, ডিপিডিসি শ্রমিক ইউনিয়নসহ বেশকিছু পেশাজীবী সংগঠনের নেতারাও ফুল দিয়ে শেষ বিদায় জানান সাবেক এই রাষ্ট্রপ্রধানকে। আকাশে কখনো ভারী বৃষ্টি, কখনো মেঘলা, কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, সব উপেক্ষা করেই চলে জনতার শ্রদ্ধা নিবেদন।

জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের, মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা, প্রেসিডিয়ামের সদস্য মীর আবদুস সবুর আসুদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, সাঈদুর রহমান টেপা, আলমগীর শিকদার লোটন, সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা, ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু, আরিফ খান, জহিরুল আলম রুবেল, গোলাম মোহাম্মদ রাজু, সাংগঠনিক সম্পাদক ইসাহাক ভুইয়া, দফতর সম্পাদক সুলতান মাহমুদসহ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এরশাদকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে খুলনা থেকে আসেন মো. সবুর মিয়া। তিনি বলেন, ‘এরশাদকে অনেকে স্বৈরশাসক বলেন, তার বিভিন্ন সমালোচনা করেন। কিন্তু আমি বলি দেশের জন্য এরশাদ যা করেছেন, তা আর কেউ করেননি। তিনি স্বৈরশাসক হোক আর যা-ই হোক, দেশের উন্নয়নের জন্য এমন নেতাই দরকার।’ তিনি বলেন, আজ আমরা শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি কাটাচ্ছি। এটা এরশাদেরই অবদান। বিশ্বের অন্যান্য দেশে রোববার, সোমবার সাপ্তাহিক ছুটি। এরশাদ স্যার, অনেক লড়াই করে শুক্রবার আমাদের সাপ্তাহিক ছুটির রীতি চালু করেছেন। বায়তুল মোকাররম মসজিদকে জাতীয় মসজিদও করেছেন এই এরশাদ। তার পুরো কাজই ছিল দেশের ভালোর জন্য।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা কাজী আলম বলেন, এরশাদ দেশের জন্য যে উন্নয়ন করেছেন তা আর কোনো সরকার করেনি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শত শত সেতু, রাস্তা করে দিয়েছেন তিনি। এমন নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ছুটে এসেছি।

পুরান ঢাকা থেকে আসা ফারুক বলেন, ‘স্যারের মৃত্যুসংবাদ শুনে গতকাল দুপুরে বনানীর কার্যালয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে স্যারের লাশ নেওয়া হয়নি। পরে জানতে পারি আজ এখানে নিয়ে আসা হবে। স্যারকে শ্রদ্ধা জানাতে দুপুর ১২টার আগেই এখানে ছুটে আসি। কাফনের কাপড়ে মোড়ানো স্যারের নিথর দেহটি দেখে হূদয়টা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল।’

বিকাল সোয়া ৪টার দিকে এরশাদের লাশ নেওয়া হয় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে। সেখানে অনুষ্ঠিত হয় তার তৃতীয় দফা এবং ঢাকার শেষ জানাজা। জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ এতে অংশ নেন। এরপর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের মরচুয়ারিতে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads