• শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৫
ads
প্রতিবাদে তোলপাড় দেশ

ছবি : সংগৃহীত

জাতীয়

ট্রাম্পের কাছে প্রিয়ার মিথ্যা নালিশ

প্রতিবাদে তোলপাড় দেশ

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ২১ জুলাই ২০১৯

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বড় উদাহরণ হতে পারে। সরকারি হিসাব এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, নিকট অতীতে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর বড় কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। ব্যক্তিগত ও পারিপারিক দ্বন্দ্ব থেকে সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হতে পারেন, তবে সেটি কোনোভাবেই সাম্প্রদায়িক সংঘাত নয়।

জানা গেছে, গত দশ বছরে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি জোরালো করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার মনে করছে, বিশ্বে বাংলাদেশকে সম্প্রীতির মডেল হিসেবে দাঁড় করাতে হলে শান্তি ও সৌহার্দ্যের বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে হবে।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে মিথ্যাভাবে উপস্থাপন করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করা হয়েছে বলে সাধারণ মানুষ মনে করছেন। অনেকে বলছেন, দেশে সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে উসকে দিতেই প্রিয়া সাহা এমন মন্তব্য করেছেন।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব বাংলাদেশের খবরকে বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়টি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তবে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অনেক ভালো। ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমারের থেকে আমাদের অবস্থান অনেক ওপরে। সামগ্রিকভাবে বিগত দিনগুলোতে বিভিন্ন ধর্মের লোক মিলেমিশেই বসবাস করে আসছি।

এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, ভারতের মতো দেশে ধর্মকে নির্বাচনী ইশতেহারে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে কখনো এমনটি হয়নি। ভারতে গো মাংস নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড দেখতে হয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে কিছু ঘটনা ঘটলেও তা বড় করে দেখার সুযোগ নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষকের মতে, বাংলাদেশ থেকে কিছু সংখ্যালঘু হয়তো চলে গেছে। তবে সেটি নির্যাতনের কারণে বলা যাবে না। অনেকের আত্মীয়স্বজন পার্শ্ববর্তী দেশে। তাই তারা সেখানে চলে যাচ্ছেন। আত্মীয়রাও তাদের ডেকে নিয়ে যাচ্ছেন। 

অপরদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বিদেশে গিয়ে কীভাবে এমন ডাহা মিথ্যা বলতে পারবেন একজন নাগরিক তা আমি বুঝতে পারছি না। এটি হয়তো তিনি খেই হারিয়ে বলছেন অথবা তাকে কেউ ইন্ধন দিয়েছেন। কিন্তু যেভাবে করে থাকুন, এটি মানা যায় না।

সরকারের সাবেক এই আমলা বলেন, কোনো ধরনের তথ্য উপাত্ত ছাড়া এ ধরনের কথা প্রিয়া সাহা কীভাবে বললেন। এর পেছনের ঘটনা খুঁজে বের করতে হবে। কোন সুস্থ নাগরিক এমনটি করতে পারেন না।

রাজনৈতিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে যেগুলো ভালোভাবে দেখভাল করা হয়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আবহমানকাল ধরে সব ধর্মের মানুষ বাংলাদেশে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে আসছেন। অনুষ্ঠান-উৎসব সব ধর্মের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশগ্রহণ করে থাকেন। বিশ্বে বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাবমতে, গত মে মাসে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে দুটি। অপরদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব বলছে, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সংঘাত দিন দিন কমছে। ২০১৭ সালে দেশে সংখ্যালঘু হামলার ঘটনা ঘটে ২০৭টি। কিন্তু ২০১৮ সালে এ ধরনের ঘটনা নেমে আসে ১৭০টির কাছাকাছি। 

বর্তমান সংঘাতময় বিশ্বে হিংসায় উন্মত্ত পাশবিক শক্তিকে যেখানে দমন করা যাচ্ছে না সেখানে বাংলাদেশ এই সূচকে অনেক উন্নতি করছে। 

পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বর্ণিল শোভাযাত্রাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সব সম্প্রদায়ের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রতি বছর বাংলাদেশে অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান উদযাপন করে থাকে। সরকারি ছুটিও ঘোষণা করা হয়। সরকারি-বেসরকারি ধর্মীয় ছুটি ভোগ করেন সবাই। এমনকি উৎসব বোনাসও দেওয়া হয়। বাংলাদেশের পরিচিতি মূলত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে। তবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তানসহ বহু দেশে সংখ্যালঘুরা যেভাবে নির্যাতন, নিপীড়ন ও হয়রানির শিকার হন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সে হিসেবে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত বটে।

সরকারি সূত্র বলছে, কেউ যদি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে চান, তাহলে তা প্রতিরোধে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সচেতন সব মানুষের এগিয়ে আসেন এই দেশে। এ দেশে সব ধর্মের মানুষ একে অপরের সুখে-দুঃখে এগিয়ে আসেন। একসঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন করে থাকেন। দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন।

প্রিয়া সাহার অভিযোগের ব্যাপারে বাংলা দৈনিক কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক তার ফেসবুকে লিখেছেন, প্রিয়া সাহার অভিযোগ উসকানিমূলক ও দেশবিরোধী। তার শাস্তি হওয়া উচিত। তার এই বক্তব্যের মতোই অনেকেই নিজের ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলকভাবে করা হয়েছে জানিয়েছেন। 

 অবশ্য সরকারের নীতিনির্ধারণী ফোরামেও বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। এই ঘটনাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মতো অপরাধ দাবি করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী ‘ধর্মীয় স্বাধীনতায় অগ্রগতি’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে যাওয়া প্রিয়া সাহা গত ১৭ জুলাই হোয়াইট হাউজে দেশটির প্রেসিডেন্ট  ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই বিতর্কিত অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা মৌলবাদীদের নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নিখোঁজ হয়েছেন।

ওই সম্মেলনে অংশ নেওয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, প্রিয়া সাহা যে অভিযোগ করেছেন, তা একেবারেই মিথ্যা। বিশেষ মতলবে এমন উদ্ভট কথা বলেছেন তিনি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে গতকাল বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যেই প্রিয়া সাহা এ ধরনের বানোয়াট ও কল্পিত অভিযোগ করেছেন। প্রিয়া সাহা ফিরলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

সরকার মনে করছে, দেশের কোনো বিবেকবান দেশপ্রেমিক হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সদস্য প্রিয়া সাহার বক্তব্যের সঙ্গে কোনোভাবেই একমত হবেন না।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads