• শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
তাড়া করে ফেরে দুঃসহ স্মৃতি

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আহত জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সাবেক সংসদ সদস্য নাসিমা ফেরদৌসী

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

তাড়া করে ফেরে দুঃসহ স্মৃতি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২১ আগস্ট ২০১৯

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় গুরুতর আহতরা এখনো নরকযন্ত্রণা ভোগ করছেন। অনেকের শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিদ্ধ অসংখ্য গ্রেনেড স্প্লিন্টার শেষ পর্যন্ত রক্তে মিশে গেছে। সেদিনের হামলার দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন কয়েকশ মানুষ। আহতদের শরীরে রয়ে গেছে সেই বিভীষিকার চিহ্ন। কেউ চলৎশক্তিহীন, কেউ পঙ্গু, কেউবা দৃষ্টিশক্তিই হারিয়েছেন। সেদিনের ভয়াবহতার কথা মনে এলে এখনো আঁতকে ওঠেন তারা। চোখ বন্ধ করলে এখনো তাদের তাড়া করে ফেরে সেদিনের দুঃসহ স্মৃতি। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতায় এখনো অনেকের চিকিৎসা চলছে।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আহত জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সাবেক সংসদ সদস্য নাসিমা ফেরদৌসীর শরীরে এখনো গ্রেনেডের স্প্লিন্টার যন্ত্রণা দেয়। দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে তিনি এ যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন। দশম জাতীয় সংসদের সদস্য নাসিমা ফেরদৌসীর প্রত্যয়- নারীরা যাতে এভাবে আর নির্যাতিত না হয়, সেজন্য তিনি সবসময় নারীদের পাশে থাকবেন। তিনি বলেন, ‘২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশে সেই সময়ের মহিলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আইভী রহমানের পাশেই ছিলাম। সেখানে ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বিস্ফোরণের সময় মনে হচ্ছিল, যেন চারদিকে আগুনের ফুলকি উড়ছে। এরই মধ্যে টের পাই, শরীর জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছে। এক পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। চারদিকে তাকিয়ে দেখি, সবারই একই অবস্থা। এরপর জ্ঞান হারালাম।’ তিনি বলেন, ‘মৃত ভেবে তাকে তোলা হয়েছিল লাশের ট্রাকে। কিন্তু নড়েচড়ে ওঠায় পুলিশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যায়। দুই পা অচল হওয়ায় চার বছর শয্যাশায়ী ছিলাম। চার মাস সারা শরীরে স্পঞ্জ লাগানো ছিল। এরপর হুইল চেয়ার, স্ট্রেচার এবং ওয়াকারের মাধ্যমে হাঁটা শেখানো হয়। লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটতে হয়। এত যন্ত্রণা, এত কষ্ট, হাঁটতে কষ্ট, শুতে কষ্ট, এত অশান্তির মধ্যেও সান্ত্বনা খুঁজে পাই, মারা গেলে পৃথিবীর আলো-বাতাস আর দেখতে পেতাম না। মাঝেমধ্যে আহত অবস্থার ছবি দেখে অবাক হই ও অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি।’

মাহবুবা পারভীন তখন ঢাকা জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক। সেদিনের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় তিনিও গুরুতর আহত হন। তিনি সেদিনের দুঃসহ স্মৃতিচারণা করে বলেন, ‘সেদিন সমাবেশে বক্তব্য শেষে আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা জয় বাংলা বলার সঙ্গে সঙ্গে বিকট একটা শব্দ হয়ে এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। তখন কাউকে দেখা যাচ্ছিল না। শুধু চিৎকার আর চিৎকার, বাঁচাও বাঁচাও বলছেন মানুষ। আমি দাঁড়ানো অবস্থা থেকে মাটিতে পড়ে গেলাম, এরপর আমার আর কিছু মনে নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘শুনেছি, সেই গ্রেনেডের শব্দে আমি হার্ট অ্যাটাক করেছিলাম। সে সময় টিভি মিডিয়ায় আপনারা সবাই দেখেছেন আমাকে ব্যানারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, কারণ আমার এক সাইড (বাম সাইড) অবশ হয়ে গিয়েছিল। আমার দুইটা কানের পর্দা ফেটে রক্ত ঝরছিল। তখনকার আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রচার সম্পাদক আশিষ কুমার মজুমদার আমাকে সেখান থেকে হাসপাতালে নিয়ে যান। আমার কিছু মনে নেই। আমি ৭২ ঘণ্টা আইসিইউতে ছিলাম।’

মাহবুবা পারভীন অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, ‘আমার শরীরে ১৮শ স্প্লিন্টার  রয়েছে। এই ১৮শ স্প্লিন্টার যখন জ্বলে ওঠে, তখন সারা শরীরে আগুন জ্বলে ওঠে। প্রতি রাতেই এগুলো জ্বলে ওঠে, কামড় দিয়ে ওঠে। এর যে তীব্র যন্ত্রণা, তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ওই ঘটনার তিন বছর আমি রাত তিনটার সময় যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে আমার শরীরে ব্লেড দিয়ে স্প্লিন্টার বের করার চেষ্টা করেছিলাম। যার কারণে আমার পায়ে পচন ধরে গিয়েছিল।’

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায় নিয়ে তিনি বলেন, ‘ওই রায়ে আমি আরো একটু সন্তুষ্ট হতাম, মূলনায়ক তারেক রহমানের ফাঁসি হলে। নির্দেশদাতাদের প্রত্যেকের শাস্তি যেন হয়, আমি এটাই দেখে যেতে চাই। তারেক রহমানের ফাঁসি হলে এ ধরনের ঘটনা আর ঘটবে না।’

সেই গ্রেনেড হামলায় প্রায় পঙ্গু হয়ে যাওয়ার পর পরই ৬৯ নম্বর ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগের কর্মী সাবিহাকে হোটেল কর্মচারী স্বামী হেলাল উদ্দিন ত্যাগ করেন। সেই থেকে অন্যের বাড়িতে আশ্রিত সাবিহা। হামলায় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাওয়া ডান পা ও ডান হাত এখনো সেদিনের বিভীষিকার জ্বলন্ত সাক্ষী। শরীরে অসংখ্য স্প্লিন্টার ও দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে দিন কাটছে তার। সেই ভয়াল ঘটনার শিকার হয়ে পঙ্গুত্বের বোঝা নিয়ে এক রকম জীবন্মৃত হয়েই বেঁচে আছেন আরেক মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী রাশেদা আক্তার রুমা। তার দেহে ৮টি অপারেশন হলেও এখনো সর্বাঙ্গে বিঁধে রয়েছে শত শত স্প্লিন্টার। ডান পা সম্পূর্ণ অকেজো। বাম পায়ে লম্বা রড লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেটিও চলৎশক্তিহীন। যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে ওষুধ খেয়ে বিছানায় পড়ে থাকলেও ঘুম আসে না তার। ওষুধ কেনার সামর্থ্যও নেই। গ্রেনেড হামলার শিকার হওয়ার মাত্র কিছুদিন আগে তার স্বামীর অকালমৃত্যু হয়েছে। ছোট দুই মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ। কোনোভাবে জীবন সংগ্রামে বেঁচে আছেন তিনি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads