• শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
শেখ হাসিনাই বেশি হত্যা ষড়ষন্ত্রের শিকার

ফাইল ছবি

জাতীয়

শেখ হাসিনাই বেশি হত্যা ষড়ষন্ত্রের শিকার

  • হাসান শান্তনু
  • প্রকাশিত ২১ আগস্ট ২০১৯

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা যতবার করা হয়েছে, বর্তমান বিশ্বের অন্য কোনো দেশের জীবিত রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে আর কাউকে এতবার হত্যাচেষ্টার নজির নেই। তিনিই বিশ্বের একমাত্র প্রধানমন্ত্রী, যাকে বারবার হত্যা ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কখনো নিজ বাসভবনে, কখনো জনসভায়, আবার কখনো তার গাড়িবহরে ভয়াবহ হামলা হয়েছে। সৌভাগ্য সহযাত্রী হওয়ায় প্রতিবারই বেঁচে গেছেন তিনি। নানা সময়ে তার উপস্থিতিতে বা অনুষ্ঠানস্থল ও আসা-যাওয়ার পথ লক্ষ্য করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব হামলা চালায় বিভিন্ন গোষ্ঠী। প্রতিটি হামলার টার্গেট ছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

তথ্যমতে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তার বাবা ও সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করার সেই কালরাতে বিদেশে থাকায় বোন শেখ রেহানাসহ বেঁচে যান শেখ হাসিনা। একপর্যায়ে দেশে ফেরার পর থেকে তাকে এ পর্যন্ত ২৩ বার তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাই নয়, আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে ১৯৮১ সালের মে মাসে দেশে ফেরার পর থেকেই তার ওপর একের পর এক হামলা হয়। নিষিদ্ধ সংগঠন হরকাতুল জিহাদ (হুজি) বারবার চেষ্টা চালায় শেখ হাসিনাকে হত্যার। তাকে হত্যাচেষ্টাগুলোর মধ্যে ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। ওই হামলায় তিনি অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন।

অনুসন্ধান মতে, প্রতিবার শেখ হাসিনা বেঁচে গেলেও জীবন দিতে হয়েছে আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীকে। এর মধ্যে ১৪টি ঘটনায় মামলার তথ্য পাওয়া যায়। সব ঘটনায় মামলাও হয়নি। এমনকি হামলার পর উল্টো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার নজিরও আছে। প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই বলে মনে করে আওয়ামী লীগ। দলের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এ প্রসঙ্গে গত শনিবার বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র এখনো চলছে। এখনো বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ আছে। রক্তের গন্ধ আমরা পেয়েছি বারবার।’

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে বারবার হত্যার চেষ্টা ও ষড়যন্ত্র করে আসছে অপশক্তি। একাত্তরের পরাজিত শক্তি, পঁচাত্তরের ঘাতক ও দেশি-বিদেশি মৌলবাদী গোষ্ঠী তাকে হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চিরতরে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। তাকে সরিয়ে দিতে পারলেই দেশে তাদের পছন্দের ধারার সরকারব্যবস্থা কায়েম সম্ভব-এ অপধারণা থেকেই অপশক্তিগুলো বারবার হত্যার ভয়ংকর ষড়যন্ত্র করে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসীন হয়ে পিতার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করছেন বলেও তাকে হত্যা করে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও মেজর জেনারেল (অব.) আব্দুর রশিদ মনে করেন, ‘শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য জঙ্গিদের ব্যবহার করে আওয়ামীবিরোধী শক্তি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার পরিকল্পনা করে। বিরোধী শক্তির সঙ্গে জঙ্গিদের পর্দার অন্তরালে যোগাযোগ আছে। তাদের রাজনীতিকে প্রসারিত করার জন্যই এ শক্তিকে ব্যবহার করা হয়। ২১ আগস্ট শেখ হাসিনা যে হামলার শিকার হন, সেখানে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রযন্ত্র, রাজনীতি ও জঙ্গি-সবাই একত্র হয়ে হামলা করে।’

জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য বঙ্গবন্ধুর ঘাতকরা এখনো সক্রিয়। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও বিদেশে পলাতক আসামি শরিফুল হক ডালিম ও সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ১৬ জন ও কর্মরত সদস্য প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার জন্য সামরিক অভ্যুত্থানের চক্রান্ত করেন। যা উইকিলিকসের সৌদি আরবের এক গোপন বার্তায় প্রকাশ পায়। হংকংয়ে বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ইসরাক আহমেদ এ পরিকল্পনায় অর্থায়ন করেন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সাধারণ নির্বাচনের সময়ও বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ফারুক, রশিদ, ডালিম ও শাহরিয়ার প্রমুখ ঢাকায় সেনাবাহিনীর ভেতরে ও বাইরে ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন। তাদের চক্রান্তের সংবাদ পেয়ে তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়।

শেখ হাসিনা ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াল গ্রেনেড হামলার মূল টার্গেট ছিলেন। সেদিন ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেলেও তার কান ও চোখ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি প্রথম হামলার শিকার হন ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে। লালদীঘি ময়দানের আটদলীয় জোটের মিছিলে তাকে হত্যায় পুলিশ ও বিডিআর গুলি করে। ১৯৮৯ সালের ১১ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধুর খুনি ফারুক-রশিদের ফ্রিডম পার্টির একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধুর ঢাকার ধানমন্ডিস্থ ৩২ নম্বরের বাসভবনে গুলি করে ও গ্রেনেড হামলা চালায়।

১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উপনির্বাচনে ঢাকার গ্রিন রোডের এক কেন্দ্রে ভোটের পরিস্থিতি দেখতে শেখ হাসিনা গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই গুলিবর্ষণ ও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরদী ও নাটোর রেলস্টেশনে প্রবেশের মুখে তাকে বহনকারী রেলগাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয়। ১৯৯৫ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকায় শেখ রাসেল স্কয়ারের কাছে সমাবেশে ভাষণ দানরত অবস্থায় তাকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ হয়। ১৯৯৬ সালের ৭ মার্চ সন্ধ্যায় ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে দলীয় সমাবেশে শেখ হাসিনার বক্তৃতার পর হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস থেকে সভামঞ্চ লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও বোমা নিক্ষেপ করা হয়।

১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পুত্র-কন্যাসহ ৩১ জনকে হত্যার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে ই-মেইল করে ইন্টার এশিয়া টিভির মালিক শোয়েব চৌধুরী। ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় শেখ হাসিনার জনসভাস্থলের কাছে ও হ্যালিপ্যাডের কাছে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখে। ২০০১ সালের ২৯ মে তার খুলনার রূপসা সেতুর কাজ উদ্বোধন করতে যাওয়ার আগে জঙ্গিরা সেখানে বোমা পুঁতে রাখে।

২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার সিলেটের জনসভাস্থলের কাছে বোমা বিস্ফোরিত হলে ঘটনাস্থলে দুজনের মৃত্যু হয়। ২০০২ সালের ৪ মার্চ নওগাঁঁয় বিএমসি সরকারি মহিলা কলেজের সামনে তার গাড়িবহরে হামলা চালানো হয়। ২০০২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা সাতক্ষীরার কলারোয়ার রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে তার ওপর হামলা চালায়। ২০০২ সালের ৩০ আগস্ট তিনি ধর্ষণের শিকার এক মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রীকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে দেখে ফেরার পথে তার গাড়িবহরে হামলা হয়। ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল গৌরনদীতে তার গাড়িবহরে গুলিবর্ষণ হয়।

২০০৯ সালের ২৭ জুন তখনকার সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী অভিযোগ করেন, ‘এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের পর খাবারে ক্রমাগত পয়জন দিয়ে তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। কারাগারের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নারী কারারক্ষীদের কাছ থেকে বিষ প্রয়োগে হত্যার চেষ্টার বিষয়টি তিনি অবগত হন। বিষয়টি শেখ হাসিনাকে জানান। এরপর শেখ হাসিনা কারাগারে চিড়া, মুড়ি ও কলা খেয়ে থাকতেন।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১১ সালে শ্রীলঙ্কার একটি সন্ত্রাসবাদী গ্রুপের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্র সুইসাইড স্কোয়াড গঠন করে শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য চুক্তি করে, যা পরে ফাঁস হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করতে সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টার পরিকল্পনা হয়, যা পরে ব্যর্থ হয়। ২০১৪ সালের শেষদিকে তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র ও অভ্যুত্থানের পরিকল্পনার কথা স্বীকার করেন পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেপ্তার জঙ্গি শাহানুর আলম ওরফে ডাক্তার। ২০১৫ সালের ৭ মার্চ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাওয়ার সময়ে কারওয়ান বাজারে তার গাড়িবহরে বোমা হামলা চালানোর চেষ্টা চালায় জেএমবি।

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads