• শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
ডেঙ্গুর বিস্তার থামবে কবে 

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

ডেঙ্গুর বিস্তার থামবে কবে 

  • রায়হান উল্লাহ
  • প্রকাশিত ২১ আগস্ট ২০১৯

গত কয়েকদিন রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা কমেছে। এতে অনেকেই আশান্বিত হলেও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সময় এখনো বিদ্যমান। তাদের যুক্তির সঙ্গে পরিসংখ্যানও সায় দেয়। এতে দেখা যায়, চলতি বছর জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া ডেঙ্গুর প্রকোপ আগস্টের শেষে কমা তো দূরের কথা বরং বেড়েই চলেছে। এর মাঝে বিশেষজ্ঞদের মত, বর্তমানে যে ধরনের আবহাওয়া বিরাজ করছে, তা মশা প্রজনন উপযোগী।  

যদিও রোগটির প্রকোপ কমানোর নিয়ামক হিসেবে আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি, ডেঙ্গুর জীবাণুবাহক এডিস মশা নিধনে সফলতা, মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির কথা বলছেন অনেকে; কিন্তু পুরোপুরি ডেঙ্গুর প্রকোপ থামবে কখন তার সদুত্তর দিতে পারেননি তারা। 

এসবের মাঝেই বিশেষজ্ঞরা শঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তাদের মতে, ঈদের ছুটি শেষে মানুষ ঢাকায় ফেরার পর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়বে। ঈদুল আজহার ছুটি থাকায় গত কয়েক দিনে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির হার একটু কম বলে মত তাদের। তাদের শঙ্কা, ১০-১৫ দিন পর সারা দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়বে। 

২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ পর্যবেক্ষণ করে আসা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও এমন কথা বলছেন। তাদের মতে, জুনে ডেঙ্গুর মৌসুম শুরু হয়, যা ব্যাপকতা পায় সেপ্টেম্বরে। আর অক্টোবরে তা কমতে থাকে। সে হিসাবে ডেঙ্গুর ‘পিক টাইম’ এখনো শুরু হয়নি। 

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য বলছে, জুনে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এক হাজার ৮৮৪ জন। জুলাই মাসে তা বেড়ে ১৬ হাজার ২৫৩ জনে দাঁড়ায়। আর ১৯ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশের হাসপাতালগুলোয় ৩৬ হাজার ৩৩৬ জন ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। এটাই এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার রেকর্ড। 

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত ৪০ জনের মৃত্যুর তথ্য থাকলেও ১৯ আগস্ট পর্যন্ত ১৭১ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায় বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে। এর আগে ২০০০ সালে সারা দেশে সবচেয়ে বেশি ৯৩ জন ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিলেন। 

ডেঙ্গু নিয়ে চলমান শঙ্কা বহুমাত্রায় বাড়িয়ে দেয় ২০০৮ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত আইইডিসিআরের নানা পরিসংখ্যান। এতে দেখা যায়, প্রতিবছর জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগী বেশি থাকে। এর মধ্যে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বেশি আক্রান্ত হয়। অক্টোবরের দিকে রোগীর সংখ্যা কমে। আইইডিসিআরের পরিসংখ্যান আরো বলছে, ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর এই দুই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ওঠানামা করে। তবে ২০১৪ সালের পর প্রতিবছর আগস্টের চেয়ে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেশি ছিল। ২০১৫ সালের আগস্টে ৭৬৫, সেপ্টেম্বরে ৯৬৫, ২০১৬ সালের আগস্টে ১৪৫১, সেপ্টেম্বরে ১৫৪৪, ২০১৭ সালের আগস্টে ৩৪৬, সেপ্টেম্বরে ৪৩০ এবং ২০১৮ সালের আগস্টে ১৭৯৬, সেপ্টেম্বরে ৩০৮৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিহ্নিত হয়েছিল। 

ভয়জাগানিয়া এমন সব তথ্য-উপাত্ত ও পরিসংখ্যানের মাঝে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাও হতাশার কথা শোনান। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়া-কমা দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। একটি হলো আবহাওয়া, আরেকটা মশা নিয়ন্ত্রণে সফলতা। তিনি বলেন, ‘একটা ফ্যাক্টর হচ্ছে আবহাওয়া কেমন থাকে। বৃষ্টিপাতের সঙ্গে এডিস মশার হ্রাস-বৃদ্ধির একটা সম্পর্ক আছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে আমরা কীভাবে মশক নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম। মশক নিয়ন্ত্রণে সফলতার ওপর নির্ভর করছে যে ট্রেন্ডটা কী হবে। সেব্রিনা বলেন, ‘এখন পর্যন্ত মনে হয় ভালোই কন্ট্রোল হচ্ছে। যদিও এখনো অনেক এরিয়া আছে যেখানে আমাদের কাজ করতে হবে। তবে কার্যক্রম আগের তুলনায় জোরদার হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।’ 

ভারী বৃষ্টিপাত এডিস মশার লার্ভা নিধনে ভূমিকা রাখে জানিয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আবদুল মান্নান শোনান শঙ্কার কথা। তিনি জানান, এবার সেপ্টেম্বরেও এমন বৃষ্টির তেমন সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, ‘এবার বৃষ্টিপাতের প্যাটার্নটা একটু ভিন্ন। সাধারণত জুন-জুলাইয়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম থাকে। কিন্তু এবার জুন-জুলাইয়েও ভারী বৃষ্টিপাত হয়নি। এ বছর এখন পর্যন্ত ঢাকায় ভারী বৃষ্টি হয়নি। সামনে সে রকম কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। এ ধরনের আবহাওয়া মশা প্রজননের উপযোগী।’ 

বর্তমানে যে ধরনের আবহাওয়া বিরাজ করছে তা মশার প্রজননের জন্য খুবই উপযোগী বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারও। তিনি বলেন, সম্ভবত ডেঙ্গুর প্রকোপ ‘স্ট্যাবল’ থাকবে। এটা এডিস মশার জন্য বেশ ভালো পরিবেশ। কিন্তু যেহেতু ডেঙ্গু প্রতিরোধে নানা ধরনের কার্যক্রম চলছে, সরকারি সংস্থাগুলো কাজ করছে, জনগণও সচেতন হচ্ছে এ কারণে হয়তো ডেঙ্গুর প্রকোপ খুব বাড়বে না। 

সামনের দিনগুলোয় ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়বে না কমবে তা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা মুশকিল বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা। তিনি বলেন, ‘এবার ডেঙ্গু সিজনটা যেহেতু আর্লি রেইজ হয়েছে আর আগস্টেই এটা অনেক ছড়িয়েছে, এটাকেই আমরা পিক মনে করছি। এবার আস্তে আস্তে কমে যাবে বলে আশা করছি।’ 

শঙ্কার কথা জানান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক ডিন ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘মানুষ ঢাকায় ফিরতে শুরু করেছে। অনেক মানুষ চলে গিয়েছিল বলেই ঢাকার ভেতরে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কম ছিল। তখন কিন্তু ঢাকার বাইরে রোগী বেড়ে গিয়েছিল। আবার গত কয়েক দিন থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। তাতে করেই ঝুঁকি বাড়ছে। আর গ্রাম থেকে মানুষ আক্রান্ত হয়ে এলে ঢাকায় ফেরার পর হয়তো ধরা পড়বে। তাতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার শঙ্কাই বেশি।’ 

একই শঙ্কার কথা জানান শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান। তিনি বলেন, ঈদের ছুটির জন্য গত কয়েক দিন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির হার একটু কম। তবে ১০-১৫ দিন পর সারা দেশে আবার ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাবে। কারণ ঢাকা থেকে অনেক ডেঙ্গু রোগী গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে গিয়েছেন। তাদের অনেকের রক্তেই ডেঙ্গু ভাইরাস ছিল। গ্রামে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে অনেককেই এডিস মশা কামড় দিয়েছে। ডেঙ্গু তাদের শরীর থেকে মশার শরীরে প্রবেশ করেছে। এখন ৮-১০ দিন সময় লাগবে সেই মশার শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস বংশবৃদ্ধি করতে। তখন এই ডেঙ্গু ভাইরাসবাহী এডিস মশা কোনো সুস্থ মানুষকে কামড় দিলে তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবেন। তিনি আরো বলেন, গত বছর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগে যত রোগী রক্ত পরীক্ষা করিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়েছিল নভেম্বরে। সুতরাং এডিস মশা বেড়ে যাওয়ার সময় পার হয়ে গিয়েছে, এমনটি ভাবার কোনো সুযোগ নেই। 

এসবের মাঝে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন মনে করেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রাঙ্গণ পরিচ্ছন্ন এবং ডেঙ্গুর লার্ভা ধ্বংসের লক্ষ্যে আয়োজিত অভিযানের উদ্বোধনকালে মেয়র বলেন, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহকে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। মশার উৎসস্থল ধ্বংসে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম চালানোর ফলে এডিস মশার প্রাদুর্ভাব ও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত নতুন রোগীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। বর্তমানে এ অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সরকারি সকল সংস্থা ইতোমধ্যে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একযোগে কাজ করছে। আশা করা যায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads