• মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads

জাতীয়

নয়াদিল্লির কাছে গ্রে এরিয়ার সার্বভৌমত্ব চায় ঢাকা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৪ অক্টোবর ২০১৯

২০১৪ সালে হেগের স্থায়ী আদালতে বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি হয়। আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে বঙ্গোপসাগরের ৫০ বর্গ কিলোমিটারের একটি গ্রে এরিয়া উল্লেখ করা হয়। নয়াদিল্লির কাছে এই গ্রে এরিয়ার পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চেয়েছে ঢাকা।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, নয়াদিল্লি সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ অক্টোবর হায়দরাবাদ হাউজে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে গ্রে এরিয়ার সার্বভৌমত্ব বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত দেন। এর আগে ২০১১ সালে গ্রে এরিয়াসহ সমুদ্রের মহীসোপান সংক্রান্ত বিষয়ে জাতিসংঘের সমুদ্রসীমাবিষয়ক কার্যালয়ে (ওশেনস অ্যান্ড ল্যান্ড অব দ্য সি, ইউনাইটেড নেশনস) ভারতের বিপক্ষে আপত্তি দাখিল করে বাংলাদেশ।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো আরো জানায়, ২০১১ সালে গ্রে এরিয়াসহ সমুদ্রের মহীসোপান সংক্রান্ত বিষয়ে জাতিসংঘের সমুদ্রসীমাবিষয়ক কার্যালয়ে ভারতের বিপক্ষে আপত্তি দাখিল করে বাংলাদেশ। নয়াদিল্লি এখন চাইছে দুই দেশ আলাপ করে সেই আপত্তি মিটিয়ে ফেলবে। এজন্য জাতিসংঘ থেকে সেই আপত্তি প্রত্যাহার করে নিতে নয়াদিল্লি ঢাকাকে প্রস্তাব দিয়েছে। ঢাকাও এই প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। তবে জাতিসংঘ থেকে আপত্তি প্রত্যাহারের আগে ঢাকা চায় গ্রে এরিয়া সংক্রান্ত সার্বভৌমত্ব আগে নিশ্চিত করুক নয়াদিল্লি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো আরো জানাচ্ছে, সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত চলমান আপত্তি দুই দেশ নিজেরাই মিটিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। তবে এই সমস্যার সমাধান সহসা হবে না। কেননা এতে দুদেশের স্বার্থই জড়িত।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ার পর বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটারের বেশি টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সবধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।

বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির রায় পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বঙ্গোপসাগরের ৫০ বর্গ কিলোমিটারের একটি গ্রে এরিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত নির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। আদালত রায়ে বলেছেন, এ বিষয়টি দুই পক্ষ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে ঠিক করে নেবে।

আন্তর্জাতিক আদালত সমতার ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা ঠিক করায় এই গ্রে এরিয়ার সৃষ্টি হয়। আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায় অনুযায়ী, বাংলাদেশের সীমানার ৫০ বর্গ কিলোমিটার এরিয়া ভারতের মধ্যে ঢুকে গেছে বা ওভার ল্যাপিং হয়েছে। গ্রে এলাকার সমুদ্রের তলদেশের সম্পদের একক মালিকানা বাংলাদেশের। আর সমুদ্রের উপরিভাগের সম্পদের মালিকানা উভয় দেশের।

ভারত সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘ঢাকা-নয়াদিল্লি আন্তরিক পরিবেশে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সমুদ্রের গ্রে এরিয়া নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কিছু সমস্যা আছে। তবে আলোচনা করে সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে ভারত প্রস্তাব দিয়েছে। ভারতের প্রস্তাবে আমরা সম্মত হয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘গ্রে এরিয়া সমস্যাটি খুব বেশিকিছু নয়। ওই এরিয়ার ওপরের অংশের মালিকানা ভারতের আর নিচের অংশের বাংলাদেশের। কিন্তু আমরা উভয় অংশের পূর্ণ অধিকার চাই।’

এর আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকা সফর করেন। পরে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সমুদ্রসীমা বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে থাকা আপত্তি নিজেরাই আলোচনা করে মিটিয়ে ফেলতে চাই। এ বিষয়ে দুই দেশই একমত প্রকাশ করেছি।’

প্রসঙ্গত, ভারত এবং মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ ছিল। ২০১২ সালে জার্মানির হামবুর্গে অবস্থিত সমুদ্র আইনবিষয়ক আন্তর্জাতিক আদালতের (ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল অন ল্যান্ড অব সি বা ইটলস) এক রায়ের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়। অন্যদিকে, ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা বিরোধসংক্রান্ত হেগের স্থায়ী আদালতে বাংলাদেশ-ভারত সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি ঘটে।

সমুদ্রসীমার ৯০ ভাগই নাগালের বাইরে : নিশীথ সূর্যের দেশ নরওয়ে তার গভীর সমুদ্রসীমায় মৎস্যসম্পদ আহরণের জন্য বাংলাদেশ থেকে ২০০০ (+) টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক মানের ট্রলার তৈরি করে নিচ্ছে। কিন্তু যে দেশটি এই জাহাজ তৈরি করে দিচ্ছে, তার নিজেরই সেই মানের জাহাজ নেই।

যেখানে উন্নত বিশ্বে মাছ ধরার কাজে ২ হাজার টন বা তারও বেশি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ফিশিং ভেসেল ব্যবহার করা হয়, সেখানে বাংলাদেশের ফিশিং ভেসেলের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ৩০০ টন। এত ছোট ভেসেল দিয়ে গভীর সমুদ্রের সম্পদ আহরণ সম্ভব নয়। বড় ভেসেল না থাকায় বাংলাদেশের অর্জিত সমুদ্রসীমার শতকরা ১০ ভাগ ব্যবহার করা যাচ্ছে। অর্থাৎ বাকি ৯০ ভাগ ব্যবহার করতে পারছে না বাংলাদেশ।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য এটি। সম্প্রতি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো শিল্প মন্ত্রণালয়ের জাহাজ নির্মাণ খসড়া নীতিমালার ভূমিকায় বলা হয়েছে, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ৬৬৪ কিমি। এর মধ্যে ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ৬০ কিমি এলাকা। কারণ সাগরের বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা এবং কন্টিনেন্টাল সেলফ এলাকায় মাছ শিকার কিংবা অর্থনৈতিক ব্যবহারের সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে দেশে নৌযান তৈরিতে ২০টি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও ১০০টি স্থানীয় মানের শিপইয়ার্ড ও ডকইয়ার্ড রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিপইয়ার্ডগুলো বছরে ১০০টি জাহাজ তৈরি করতে পারে। দেশে বর্তমানে ১০ হাজার টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক মানের জাহাজও তৈরি হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো সমুদ্রে পড়ে আছে ৩০০ টনের ভেসেল নিয়েই, যা দিয়ে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০ কিমি গভীর সমুদ্র পর্যন্ত মৎস্যসম্পদ আহরণ করা যায়। ফলে দেশের মূল্যবান মৎস্যসম্পদ নিয়ে যাচ্ছে বিদেশিরা।

বিভিন্ন মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগর এলাকায় প্রতি বছর ৮০ কোটি টন মাছ ধরা পড়ছে। এর মধ্যে মাত্র দশমিক ৭ লাখ টন মাছ ধরে থাকেন বাংলাদেশের জেলেরা। অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরের বিশাল মৎস্যসম্পদের ১ শতাংশও বাংলাদেশের জেলেরা ধরতে পারছেন না শুধু উন্নত ধরনের জাহাজ ও প্রযুক্তির অভাবে। আর এ সুযোগটি নিচ্ছেন বিদেশিরা।

উপকূলীয় জেলেদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, মিয়ানমার, ভারত ও থাইল্যান্ডের অনুমোদনহীন অত্যাধুনিক জাহাজগুলো প্রায়ই বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে পড়ে। অনেক ছোট ছোট মাছধরার ট্রলারও জলসীমায় প্রবেশ করে জেলেদের মাছ ও মালপত্র লুটে নিয়ে যায়। এসব বিদেশি জাহাজ দেশীয় মাছধরার ট্রলারের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাগরে মূলত দুই ধরনের সম্পদ রয়েছে। এগুলো হলো প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদ। প্রাণিজ সম্পদের মধ্যে মৎস্য ও সামুদ্রিক নানা প্রাণী, লতাগুল্ম প্রভৃতি। এর বাইরে রয়েছে বিপুল পরিমাণে অপ্রাণিজ ও বিভিন্ন মূল্যবান খনিজসম্পদ। অপ্রাণিজ সম্পদের মধ্যে রয়েছে তেল, গ্যাস, চুনাপাথর এবং খনিজের মধ্যে আরও রয়েছে ১৭ ধরনের খনিজ বালু, যা সোনার চেয়েও দামি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যবান এসব সম্পদ আহরণের জন্য বঙ্গোপসাগরে অর্জিত জলসীমার কোথায়, কী পরিমাণ সম্পদ আছে সে নিয়ে জরিপ ও গবেষণা প্রয়োজন। এমন আশঙ্কাও রয়েছে, বঙ্গোপসাগরের সম্পদ আহরণে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নিলে মৎস্যসম্পদের মতো সমুদ্রসীমার খনিজসম্পদও লুট করে নিয়ে যাবে বিদেশিরা।

বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্স অ্যান্ড ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. শফিকুর রহমান বলেন, ‘গভীর সমুদ্র থেকে সম্পদ আহরণের জন্য আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর যে ধরনের সক্ষমতা ও প্রযুক্তি থাকা প্রয়োজন সেটি নেই। সে কারণে এ বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ জরিপ বা গবেষণা করা এখনো সম্ভব হচ্ছে না। আমরা নৌবাহিনীর বোট নিয়ে প্রাথমিকভাবে উপকূলের কাছাকাছি কিছু এলাকা নিয়ে কাজ করছি। গভীর সমুদ্রে এখনো পৌঁছাতে পারিনি।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads