• শনিবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads
রণক্ষেত্র বোরহানউদ্দিন

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

রণক্ষেত্র বোরহানউদ্দিন

নিহত ৪, আহত দেড় শতাধিক, বিজিবি মোতায়েন

  • ভোলা প্রতিনিধি
  • প্রকাশিত ২১ অক্টোবর ২০১৯

ভোলার বোরহানউদ্দিনে ফেসবুকে ‘অবমাননাকর’ পোস্ট দেওয়ার প্রতিবাদে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে ডাকা এক বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই কর্মসূচিকে ঘিরে সৃষ্ট সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে চারজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ১০ পুলিশ সদস্যসহ দেড় শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে ৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল রোববার বোরহানউদ্দিন উপজেলা সদরে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

নিহত চারজন হলেন বোরহানউদ্দিন উপজেলার  মহিউদ্দিন পাটওয়ারীর মাদরাসা পড়ুয়া ছেলে মাহবুব (১৪), উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের দেলওয়ার হোসেনের কলেজপড়ুয়া ছেলে শাহিন (২৩), বোরহানউদ্দিন পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাহফুজ (৪৫), মনপুরা হাজিরহাট এলাকার বাসিন্দা মিজান (৪০)।

আহত ব্যক্তিদের মধ্যে শতাধিক ব্যক্তিকে বোরহানউদ্দিন হাসপাতালে, ৪০ জনকে ভোলা সদর হাসপাতালে এবং পাঁচজনকে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক মোহাম্মদ শাহীন জানান, গুলিতে নিহত দুজনের মৃতদেহ তার হাসপাতালে রয়েছে। আরো দুজনকে মৃত অবস্থায় ভোলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলে জেলার সিভিল সার্জন রথীন্দ্রনাথ রায় জানান। সংঘর্ষে হতাহতের খবর পাওয়ার পর হেলিকপ্টারে করে বিজিবি সদস্যদের ভোলায় পাঠানো হয়েছে বলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম জানান।

বোরহানউদ্দিনের উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম জানান, ফেসবুকে ‘আল্লাহ ও নবীর অবমাননার’ অভিযোগে স্থানীয় এক যুবকের বিচার দাবিতে রোববার সকালে উপজেলা সদরে একটি সমাবেশ হয় ‘মুসলিম তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে। বেলা পৌনে ১১টায় সেখানে পৌঁছে তিনি দেখতে পান, সমাবেশে উপস্থিত এলাকাবাসী পুলিশের দিকে ঢিল ছুড়ছে। তিনি বলেন, সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা ছিল বেলা ১১টায়। কিন্তু আয়োজকরা সাড়ে ১০টার মধ্যে সমাবেশ শেষ করে দিলে অংশ নিতে আসা জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। আমি যখন পৌঁছাই, তখনো বড় বড় মিছিল নিয়ে অনেকে সমাবেশে অংশ নিতে আসছিল।

পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন সূত্রে জানা গেছে, ফেসবুকে আল্লাহ ও হজরত মুহম্মদকে (সা.) নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের এক ব্যক্তির বিচার দাবিতে গতকাল ঈদগাহ মাঠে বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে তৌহিদী জনতা। এ সমাবেশের জন্য পুলিশ অনুমতি দেওয়ার আগেই তারা মাইকিং করে। পরে সমাবেশের জন্য পুলিশ অনুমতি না দিলেও সকাল ৯টা থেকে লোকজন মাঠে জড়ো হতে থাকে। মিছিল করতে না পেরে সেখানেই অবস্থান শুরু করে তারা। পরে পুলিশ ‘বাটামারা পীর সাহেব’ মাওলানা মহিবুল্লাহকে সেখান থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করে এবং তাকে ঈদগাহ জামে মসজিদের দোতলায় নিয়ে যায়। ওই সময় গুঞ্জন ওঠে, মাওলানা মহিবুল্লাহকে পুলিশ আটক করেছে। এ গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পুলিশ গুলি ছুড়লে চারজন নিহত হয়।

পুলিশের দাবি, উত্তেজিত লোকজন পুলিশের ওপর হামলা করলে তারা গুলি করতে বাধ্য হয়।

অভিযোগ উঠেছে, গত শুক্রবার বিকালে বিপ্লব চন্দ্র শুভর নিজের ছবিসংবলিত ফেসবুক আইডি থেকে আল্লাহ ও হজরত মুহম্মদকে (সা.) গালাগাল ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে কয়েকজন ফেসবুক বন্ধুর কাছে মেসেজ পাঠানো হয়। যাদের মেসেজ পাঠানো হয়, তারা এর স্ক্রিনশট নিয়ে ফেসবুকে দিলে লোকজন প্রতিবাদ জানানো শুরু করে। বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। এ নিয়ে বিভিন্ন মসজিদ থেকে কয়েক দফায় বিক্ষোভ প্রদর্শন হয়। গত শুক্রবার সন্ধ্যার পর বিপ্লব চন্দ্র বোরহানউদ্দিন থানায় তার আইডি হ্যাক হয়েছে মর্মে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে আসেন। এ সময় পুলিশ বিষয়টি তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিপ্লব চন্দ্রকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে তার কথা ধরে পটুয়াখালী থেকে আরেকজনকে গত শনিবার আটক করে।

বিপ্লব চন্দ্রের বিচার দাবিতে গত শনিবার সকাল, দুপুর ও বিকালে বোরহানউদ্দিন উপজেলা শহরে, কুঞ্জেরহাট বাজারে ‘সর্বস্তরের মুসলিম তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। একই দাবিতে গতকাল সকাল ৯টায় বিক্ষোভের ডাক দেয় তৌহিদী জনতা।

আয়োজকেরা জানান, তারা শনিবার রাতে মাইকিং করার পরে বোরহানউদ্দিন থানার পুলিশের কাছে অনুমতি চাইতে যান। কিন্তু থানা অনুমতি দেয়নি।

গতকাল সকালের দিকে তৌহিদী জনতার ব্যানারে বিক্ষোভ মিছিল হয়। এ বিক্ষোভ মিছিলটি না করার জন্য বোরহানউদ্দিন ঈদগাহ মসজিদের ইমাম মাওলানা জালাল উদ্দিন, বাজার মসজিদের ইমাম মাওলানা মিজানকে পুলিশ অনুরোধ জানায় এবং সাধারণ মানুষ আসার আগে বিক্ষোভটি বন্ধ ঘোষণা করতে বলে। তাদের অনুরোধে এ দুই ইমাম সকাল ১০টার দিকেই যেসব লোক এসেছিল, তাদের নিয়ে দোয়া-মোনাজাতের মাধ্যমে বিক্ষোভ মিছিল সমাপ্ত করেন। কিন্তু ততক্ষণে বোরহানউদ্দিনের বিভিন্ন গ্রাম থেকে হাজারো লোক এসে ঈদগাহে জড়ো হয়। একপর্যায়ে তারা ওই দুই ইমামের ওপর ক্ষিপ্ত হয় এবং সেখানে থাকা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে মসজিদের ইমামের কক্ষে আশ্রয় নেয়। উত্তেজিত জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পরে পুলিশ গুলি ছোড়ে।

সর্বশেষ এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো জেলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বোরহানউদ্দিনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সর্বশেষ বিজিবি মোতায়েন করা হয়।

ভোলার পুলিশ সুপার সরকার মোহাম্মদ কায়ছার বলেন, বোরহানউদ্দিন উপজেলার বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামের এক যুবকের ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছে। আমরা হ্যাকিংয়ের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের আটক করেছি। আমরা এ নিয়ে গত রাতে স্থানীয় আলেমদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলছে, আজকের (রোববার) প্রোগ্রাম হবে না। কিন্তু সকাল থেকে আমাদের কাছে খবর আসে, সেখানে মাইকিং হচ্ছে এবং স্টেজ বানানো হচ্ছে। সেখানে গিয়ে আমরা উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি নিজে সেখানে বক্তব্য দিয়েছি। তারা সবাই আমার বক্তব্য শুনেছে। যখন আমি স্টেজ থেকে নেমে আসি, তখন একদল উত্তেজিত জনতা আমাদের ওপর হামলা চালায়। আমরা আত্মরক্ষার্থে একটি রুমে গিয়ে আশ্রয় নিই। তিনি আরো বলেন, যখন তারা আমাদের রুমের জানালা ভেঙে ফেলে, তখন আমরা প্রথমে শটগানের ফাঁকা গুলি ছুড়ি। এতে কাজ না হওয়ায় ওপরের দিকে গুলি চালানো হয়। আমার জানামতে, একজন পুলিশ সদস্য বুকে গুলি লেগে গুরুতর আহত হয়েছেন। আমরা আহত অবস্থায় যাদের হাসপাতালে পাঠিয়েছি, তাদের মধ্যে তিনজন নিহত হয়েছেন। তবে আরো নিহত থাকতে পারে, সেটা আমাদের কাছে তথ্য নেই।

বোরহানউদ্দিন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মু. এনামুল হক জানান, শুক্রবার রাতে বিপ্লব চন্দ্র নিজের ইচ্ছায় থানায় আসেন। তিনি এখন পুলিশের হেফাজতে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনা সত্য প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় আরেকজনকে আটক করা হয়েছে।

আজ ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশ : সংঘর্ষের ঘটনায় আজ সোমবার বেলা ১১টায় ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছে সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদ। গতকাল বিকালে ভোলা প্রেস ক্লাবের সামনে সংগঠনের নেতারা প্রতিবাদ সভা ঘোষণার পাশাপাশি ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো-বিপ্লব চন্দ্র শুভর ফাসি কার্যকর, নিহতেদের লাশ বিনা পোস্টমর্টেমে পরিবারের কাছে হস্তান্তর, আহতদের সরকারি খরচে চিকিৎসা, ভোলার পুলিশ সুপার ও বোরহানউদ্দিনের ওসিকে প্রত্যাহার, নিহতদের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও গ্রেপ্তারদের বিনা শর্তে মুক্তি প্রদান।

সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদের ব্যানারে মাওলানা বশির উদ্দিনের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেন মাওলানা তরিকুল ইসলাম, আতাউর রহমান, তাজউদ্দিন ফারুকী ও মিজানুর রহমান প্রমুখ।

ফেসবুকে ধর্ম অবমাননা করার গুজব ছড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার নজির রয়েছে। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলায় হামলা চালিয়ে লুটপাটসহ ১২টি বৌদ্ধমন্দির ও ৩০টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে একদল লোক। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে রসরাজ নামে এক মৎস্যজীবীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ এনে লোকজনকে খেপিয়ে তুলে ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলা চালানো হয়।

সুষ্ঠু তদন্ত চায় ইসলামী ঐক্যজোট

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহানবী (সা.)-কে কটূক্তি করা নিয়ে ভোলায় পুলিশ-জনতা সংঘর্ষে নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে ইসলামী ঐক্যজোট। এ ঘটনায় তীব্র নিন্দার পাশাপাশি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে দলটি। গতকাল রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দলটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মাওলানা আবদুর রকিব ও মহাসচিব অধ্যাপক আবদুল করিম খান এ দাবি জানান। 

বিবৃতিতে বলা হয়, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, আখেরি নবী রাসূলুল্লাহ (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করা মানে মানুষকে বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করা। ৯০ ভাগ মুসলমানের এই দেশে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুসলমানদের নয়নের মণি রাসূল (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি এদেশের মানুষ সহ্য করবে না। অতএব ভবিষ্যতে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সেজন্য মহানবীকে নিয়ে কটূক্তিকারীদের পাশাপাশি সংঘর্ষের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি জানান তারা।

উল্লেখ্য, গতকাল ফেসবুকে মহানবী (সা.)-কে কটূক্তি করা নিয়ে ভোলার বোরহানউদ্দিনে সাধারণ মুসল্লিদের সমাবেশকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে চারজন নিহত হয়েছেন।  এ ঘটনায় পুলিশসহ শতাধিক মুসল্লি আহত হয়েছেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads