• বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
ads
ডলফিন থাকে যদি ভালো থাকবে নদ-নদী

ফাইল ছবি

জাতীয়

ডলফিন থাকে যদি ভালো থাকবে নদ-নদী

  • এস এম মুকুল
  • প্রকাশিত ৩১ অক্টোবর ২০১৯

নদীতে দূষণের পরিমাণ কেমন, তা ডলফিনের অবস্থা ও সংখ্যা দেখে খুব সহজেই অনুমান করা যায়। ‘শুশুক ডলফিন থাকে যদি ভালো থাকবে মোদের নদী’-এ স্লোগানে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, ইউএনডিপি এবং বাংলাদেশ বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে ডলফিন রক্ষায় বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এ উপলক্ষে গতকাল বুধবার চ্যানেল আই ভবনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বিপন্ন ডলফিন রক্ষায় জনসাধারণদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। বক্তারা বলেন, জলজ জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে ডলফিন বা শুশুক। এরা জলজ পরিবেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। যে নদীতে ডলফিন থাকে সেই নদীতে মাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং নদীর পরিবেশ সুস্থ থাকে। এদের উপস্থিতি পানির গুণগত মান বা অবস্থা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। পরিবেশগত প্রভাব বোঝার নির্দেশক এই শুশুকগুলো বর্তমানে ভালো নেই। বাংলাদেশে এরা বিপন্ন প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত।

প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, ‘ডলফিন খুব বুদ্ধিমান প্রাণী। এরা অনেকটা মানুষের মতোই। এরা মানুষের মতোই শ্বাস নেয়, একে-অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, বর্তমানে ডলফিনের সংকট থাকলেও একসময় দেশের নদীগুলোতে প্রচুর ডলফিন দেখা যেত। তবে দেশ থেকে যেভাবে ডলফিন কমে যাচ্ছে, তাতে কিন্তু একসময় ডলফিন দেশ থেকে হারিয়ে যাবে। যা হবে আমাদের জন্য চরম উদ্বেগের বিষয়। তাই ডলফিন রক্ষায় আজ থেকেই সবাইকে জেগে উঠতে হবে। যে নদীতে ডলফিন থাকে, সে নদীর পানি ভালো থাকে।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু, ইউএনডিপির প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট আরিফ মোহাম্মদ ফয়সাল, বাংলাদেশ বন বিভাগের বন সংরক্ষক মো. জাহিদুল কবির এবং চিত্রনায়ক ফেরদৌস প্রমুখ।

ডলফিনকে বলা হয় উপকূলীয় প্রতিবেশের প্রহরী। শুশুক বা ডলফিন অত্যন্ত উপকারী ও নিরীহ একটা প্রাণী। জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এই জলজ প্রাণীটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। পৃথিবীজুড়ে এদের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। অপরিকল্পিত বাঁধ তৈরি, মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, নির্বিচারে হত্যা, মাছ ধরার জালে আটকে পড়ে মৃত্যু—এদের সংখ্যা হ্রাসের অন্যতম কারণ। সংবাদ সম্মেলনে আরো জানানো হয়, নদীর নাব্য হ্রাস, পাশাপাশি কলকারখানার তরল বর্জ্যতে পানিদূষণ—এদের বিপন্নতার অন্যতম কারণ। ডলফিন তেলের উপকারিতা নিয়ে লোকজ কুসংস্কারের কারণেও এরা মানুষের হাতে মারা পড়ছে। মিঠাপানির ডলফিন বাঁচলে সুস্থ থাকবে জলের আঁধার; রক্ষা পাবে অন্যান্য জলজ প্রাণী, সেই সঙ্গে নিশ্চিত হবে টেকসই জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থাপনা।

জানা যায়, গাঙ্গেয় ডলফিন বাংলাদেশের মিঠাপানির নদীর প্রধান ডলফিন। সুন্দরবনের নদ-নদীতে ইরাবতী ও গাঙ্গেয় ডলফিন সহজেই দেখা যায়। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা সুন্দরবনে এসে ইরাবতী ও গাঙ্গেয় ডলফিনের ডিগবাজি দেখে মুগ্ধ হন। কিন্তু এই দুই প্রজাতির ডলফিনই বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে বিপন্ন অবস্থায় রয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে বাংলাদেশে ডলফিন ও তিমি শিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০১২ সালের প্রণীত আইন অনুযায়ী ডলফিন অথবা তিমি শিকার করা হলে তিন বছরের কারাদণ্ড, ৩ লাখ টাকা জরিমানাসহ উভয় দণ্ড দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা ৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া হচ্ছে। সুন্দরবন-সংশ্লিষ্ট নদ-নদীর আরো ২২ কিলোমিটার এলাকায় ডলফিনের অভয়াশ্রম করা হলে তাতে বিলুপ্তির হাত থেকে জলজ প্রাণী যেমন রক্ষা পাবে তেমন পর্যটকদের কাছে সুন্দরবনের আকর্ষণ বৃদ্ধি পাবে। তবে ডলফিনের অভয়াশ্রম করার পরিকল্পনা যাতে যথার্থভাবে বাস্তবায়ন হয়, সে ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের তীক্ষ নজর রাখা দরকার। ভারত থেকে আসা নদ-নদীর পানির প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় সুন্দরবন এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, জলজ প্রতিবেশের অন্যতম প্রাণী ডলফিন। এরা শুশুক, শিশু ও শিশুমাছ  নামেও পরিচিত। দেশের অভ্যন্তরীণ বড় বড় নদী, মোহনা ও সুন্দরবনের নদীগুলোতে এদের দেখা যায়। নদীর মাঝারি গভীরতায় থাকতে এরা পছন্দ করে। ধূসর রঙের এই প্রাণীটির মাথা ছোট ও শরীর বেশ নরম। এদের লক্ষনীয় বৈশিষ্ট্য হলো লম্বা ঠোঁট। ছোট ছোট চোখ দুটি ঠোঁটের ওপর অবস্থিত হলেও এরা এটা দিয়ে খুব ভালো দেখতে পায় না। এরা একাকী, জোড়ায় জোড়ায় থাকে এবং মাঝে মাঝে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য পানির ওপর উঠতে দেখা যায়। মিঠা পানির ডলফিনসহ অনেক জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব এমনিতেই বিপন্ন হয়ে উঠেছে। আমরা আশা করব, অভয়াশ্রম ডলফিনসহ বিভিন্ন বিপন্ন প্রাণীর জীবন রক্ষায় অবদান রাখবে। সুন্দরবন হয়ে উঠবে ডলফিনের সবচেয়ে নিরাপদ বিচরণস্থল।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্বে প্রায় ৪৩ প্রজাতির ডলফিন রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে ৭ প্রজাতির ডলফিনের দেখা মেলে। গাঙ্গেয় ডলফিন বা শুশুক বাংলাদেশের মিঠা পানির নদীর প্রধানতম ডলফিন প্রজাতি। সুন্দরবনের নদীতে গাঙ্গেয় শুশুক এবং ইরাবতী ডলফিন দেখা যায়। এই দুই প্রজাতির ডলফিনই বর্তমানে সারা বিশ্বে বিপন্ন অবস্থায় আছে। সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা জানান, দেশের বর্তমানে ৪০০ গাঙ্গীয় ডলফিন রয়েছে। আস্তে আস্তে এদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তবে পরিবেশগত প্রভাব বোঝার নির্দেশক এই শুশুকগুলো বর্তমানে ভালো নেই। বাংলাদেশে এরা বিপন্ন প্রাণী হিসেবে চিহ্নিত। পৃথিবীজুড়েও এদের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। ডলফিন কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তারা বলেন, অপরিকল্পিত বাঁধ তৈরি, মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, নির্বিচারে হত্যা, মাছ ধরার জালে আটকে পড়ে মৃত্যুর কারণে ডলফিনের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আবার ডলফিন তেলের উপকারিতা নিয়ে লোকজ কুসংস্কারের কারণেও এরা মানুষের হাতে মারা পড়ছে।

উল্লেখ্য, ওয়াইল্ড লাইফ কনজারভেশন সোসাইটি (ডব্লিউসিএস) ২০০২ সালে সুন্দরবনের পূর্ব ভাগের প্রায় ৩০ কিলোমিটার এলাকাকে মিঠাপানির ২ প্রজাতির ডলফিনের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করে। যেখানে সুন্দরবনের মোট ডলফিনের প্রায় অর্ধেকের আনাগোনা আর ইরাবতী ডলফিনের এক-চতুর্থাংশের বসতি। গাঙ্গেয় শুশুক বা ডলফিন সুন্দরবনের উজানের দিকে বিচরণ করে। অন্যদিকে, ইরাবতী ডলফিন বিচরণ করে সুন্দরবনের দক্ষিণাঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি।

 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads