• বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৮ কার্তিক ১৪২৬
ads

জাতীয়

নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে ধীরগতি

পরিপূর্ণভাবে কার্যকরে আরো সময় প্রয়োজন

  • মো. রেজাউর রহিম
  • প্রকাশিত ০৩ নভেম্বর ২০১৯

নতুন সড়ক পরিবহন আইন চালু হয়েছে গত ১ নভেম্বর। তবে নতুন এ আইনটি পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ কার্যকর করতে আরো সময় প্রয়োজন। মূলত আইনটি সম্পর্কে জনসচেতনতার ঘাটতি, বাস্তবায়নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও যন্ত্রপাতির অভাব এবং প্রয়োজনের তুলনায় গণপরিবহনের ঘাটতির পাশাপাশি পথচারীদের রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জেব্রা ক্রসিংয়ের অভাব নতুন এ আইনটি বাস্তবায়নে ধীরগতির অন্যতম কারণ। এ ছাড়া বিধিমালা চূড়ান্ত না হওয়ার ফলে আইনটি পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে আরো সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে।

সূত্রগুলো জানায়, প্রায় এক বছর আগে ছাত্রদের আন্দোলনের ফলে আইনটি পাস করে সরকার। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ আইনের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণের কারণে আইনটি বাস্তবায়নে সময় নেওয়া হয়।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) একটি সূত্রে জানা গেছে, এ আইন কার্যকরে প্রথমদিন থেকেই তৎপর থাকলেও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে মামলা ও জরিমানাসহ কিছু বিষয় কার্যকর করতে আরো কয়েকদিন সময় লাগবে। এ জন্য সফটওয়্যার ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি হালনাগাদ করাসহ কিছু কাজ বাকি রয়েছে। এ ছাড়া সড়ক পরিবহন আইনের মামলার ক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ জরিমানার বিষয়টি নমনীয়তার সঙ্গে নির্ধারণ করেছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে নতুন এ আইনে রাস্তা পারাপারে পথচারীদেরও সচেতন থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, পথচারীদের রাস্তা পার হওয়ার ক্ষেত্রে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হতে হবে। তা না হলে পথচারীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। বিশ্লেকদের মতে, এটি একটি বিরাট অঙ্ক। এজন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। এ ছাড়া রাস্তার অনেক জায়গায় প্রয়োজনীয় জেব্রা ক্রসিংও নেই। এ বিষয়টিও  আইনটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

এদিকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং প্রাণহানি এড়াতে ১ নভেম্বর থেকে নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করা হয়েছে। আইনটি নিয়ে এখন সারা দেশে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রথম সাতদিন (৭ নভেম্বর পর্যন্ত) এই প্রচারণা চলবে। এ সময় কোনো পরিবহনের বিরুদ্ধে নতুন আইনে মামলা না করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি। নতুন আইন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে দুর্ঘটনা কমে যাওয়াসহ সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। গতকাল শনিবার নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় নতুন সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যক্রম পরিদর্শনে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি।

এদিকে গত ১ নভেম্বর থেকে চালু হওয়া সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর বিধিমালা চূড়ান্ত করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি ও সংসদ সদস্য মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ পাস হওয়ার পর আমরা কয়েকটি ধারা সংশোধনের জন্য প্রস্তাব করেছিলাম। তিনি বলেন, এ আইনে মালিক শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অনেকগুলো ধারা রয়েছে। এ আইনের বিধিমালা এখনো প্রণয়ন করা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিধিমালা প্রণয়ন ছাড়া আইন স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। নতুন এ আইনকে স্বাগত জানিয়ে মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, এজন্য খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিধিমালা চূড়ান্ত করতে হবে। তা না হলে আইন প্রয়োগ করা যাবে না। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার জন্য কাউকে দায়ী না করে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করতে হবে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে তাই করা হয়। তবে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসের জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে। রাঙ্গা বলেন, এই আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মালিক-শ্রমিকরা যেন হয়রানির শিকার না হন এবং আইনের অপপ্রয়োাগ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। দুর্ঘটনা মামলা যাতে ৩০৪ (খ) ধারার পরিবর্তে ৩০২ ধারায় দায়ের না হয়। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় ড্রাইভার কাউকে হত্যা করেছে সে ক্ষেত্রে ৩০২ ধারায় স্থানান্তরে আমাদের আপত্তি নেই।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব এনায়েতুল্লাহ খান বলেন, আইন সংসদে পাস হওয়ার পর সংশোধনের কোনো সুযোগ ছিল না। আইন বাস্তবায়নে যাতে কোনো হয়রানি বিশৃঙ্খলা ও জটিলতা সৃষ্টি না হয় সেজন্য আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। ওনারা আমাদের প্রস্তাবে সম্মত হয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের ৯৫ শতাংশ যাত্রী ও পরিবহন গাড়ি বেসরকারি খাতের মাধ্যমে পরিচালিত। আর সরকারিভাবে মাত্র ৫ শতাংশ। গাড়িকে বড় অঙ্কের জরিমানা এ সেবাকে বাধাগ্রস্ত করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন চালক দুর্ঘটনার পর অজামিনযোগ্য আইনে কারাগারে গেলে স্বাভাবিকভাবে গাড়ি চালনার ক্ষেত্রে চালক সংকট তৈরি হবে।

গতকাল রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন মালিক সমিতির নেতারা।  

এদিকে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সড়ক আইন কার্যকরে এরই মধ্যে দেশের সব ট্রাফিক ইউনিটগুলোতে এবং সার্জেন্টদের কাছে ইতোমধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের মামলা পস মেশিনে করা হয়, সেজন্য মেশিনটিতে জরিমানার টাকাসহ আরো কিছু বিষয় নির্ধারিত থাকে। সেই বিষয়গুলো আপডেট করে তারপর ট্রাফিক পুলিশ নতুন আইনে জরিমানা করবে, এটি না হওয়া পর্যন্ত আগের নিয়মেই সব চলছে। আর নতুন এ আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ যে জরিমানা ও শাস্তির কথা বলা হয়েছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ সেটা কমিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে জরিমানার পরিমাণ ধার্য করেছে। নতুন এ আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরযান ও গণপরিবহন চালানোর ক্ষেত্রে ছয় মাস কারাদণ্ড ও ২৫ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ প্রথমবার ৫ হাজার টাকা ও পরেরবার একই অপরাধে ১০ হাজার টাকা জরিমানার কথা উল্লেখ করে ট্রাফিক সার্জেন্টদের ইতোমধ্যে চিঠি দিয়েছে। একই সঙ্গে রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরযান চালানোর ক্ষেত্রে আইনে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ডিএমপি প্রথমবার ১০ হাজার ও দ্বিতীয় দফায় ২০ হাজার টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর  মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে তিন মাস কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলা হলেও ডিএমপি এটি কমিয়ে প্রথমবার এক হাজার ও পরেরবার দুই হাজার টাকা জরিমানার কথা বলেছে। সড়ক আইন কার্যকরে মামলা ও জরিমানার বিষয়ে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, সড়ক আইন কার্যকরে পুলিশ সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে মামলা ও জরিমানার ক্ষেত্রে কিছু কাজ বাকি আছে। সেগুলো সম্পন্ন করে মানুষকে জানিয়ে তারপর নতুন জরিমানা ও মামলা কার্যকর করা হবে। এজন্য আরো  কয়েকদিন সময় লাগতে পারে।

উল্লেখ্য, সড়ক পরিবহনে নতুন ও কার্যকর একটি আইনের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। দেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশে অনেক আন্দোলনও হয়েছে। কিন্তু প্রতিটি সরকারের প্রভাবশালী একটি অংশ এবং কিছুসংখ্যক পরিবহন মালিকের চাপে বিষয়টি নিয়ে এর আগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। ফলে ব্রিটিশ আমলে প্রণীত এ সংক্রান্ত আইনটি সামান্য সংস্কার করে ১৯৮৩ সালে মোটরযান অধ্যাদেশ নামে যে আইন ছিল সেটি দিয়েই চলছিল দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা। এর আগে ১৯৯৬-২০০১ সালে ক্ষমতায় থাকাকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এ বিষয়ে একটি রূপরেখা তৈরি করলেও তার বাস্তবায়ন হয়নি। তবে গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর প্রাণহানির ঘটনায় সারা দেশের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলে। সারা দেশে এ আন্দোলনের ব্যাপকতায় সরকার বাধ্য হয়ে আইনটি করার উদ্যোগ নেয়। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে মন্ত্রিসভায় ও পরে ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ পাস করা হয়। এরপর ওই বছরেরই ২২ অক্টোবর গেজেট প্রকাশ করে সরকার। আইন পাসের এক বছর দুই মাস পর এটি কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads