• শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২০, ১০ মাঘ ১৪২৬
বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা বাতিলের আশঙ্কা

ছবি : সংগৃহীত

জাতীয়

সুন্দরবন ঘিরে উন্নয়ন

বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা বাতিলের আশঙ্কা

ফের ইউনেস্কোর প্রশ্নবাণ

  • সাইদ আরমান
  • প্রকাশিত ১৪ জানুয়ারি ২০২০

সুন্দরবনের আশপাশে উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আবারো প্রশ্ন তুলেছে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কো। সংস্থাটির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করে গেছে মধ্য ডিসেম্বরে। এ সময় সরকারের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে একগুচ্ছ প্রশ্ন তুলেছেন। তবে সরকারপক্ষ ইউনেস্কোকে সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আমাদের জবাবে সংস্থাটির প্রতিনিধিদল সন্তুষ্ট। তারা চূড়ান্ত রিপোর্ট করার আগে বিষয়গুলো নিয়ে আবারো আলোচনা করে ঢাকার সঙ্গে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পরিবশে, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন কথা বলতে চাননি। তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। অপরদিকে মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ইউনেস্কোর দল ঢাকা সফর করেছে। আমাদের কাছে তারা অনেক বিষয়ে জানতে চায়। আমরা এর আগেও তাদের তথ্য উপাত্ত দিয়েছি। সেগুলোর আলোকে নতুন কিছু প্রশ্ন উঠেছে সংস্থাটির পক্ষ থেকে। বাংলাদেশের পক্ষে তাদের সব জানানো হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন করার আগে তারা আমাদের জানাবে কি না সেটা তাদের অভিমত। 

ইউনেস্কোর দল সুন্দরবনের ওই সাইটটা ঘুরে দেখে গেছে। একই সঙ্গে সরকারের সঙ্গে কথা বলেছে। তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশে যায়, দেখে হেরিটেজের কী অবস্থা। আজারবাইজনের বাকুতে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৩তম অধিবেশনের জন্য প্রস্তাবিত এজেন্ডায় সুন্দরবনকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্য’-এর তালিকাভুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে। সুন্দরবন ও এর আশপাশের সংরক্ষিত অঞ্চলে রামপাল বিদ্যুতকেন্দ্রসহ চলমান সব প্রকল্প স্থগিত করে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সুপারিশ আমলে নিয়ে কৌশলগত পরিবেশগত সমীক্ষা ও সময়াবদ্ধ অন্যন্য কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের আহ্বান জানায় টিআইবি (বেসরকারি সংস্থাটি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ)।

রামপালসহ অন্যান্য প্রকল্পের কারণে সুন্দরবন ঝুঁকিতে আছে’ এমনটি দীর্ঘদিন বলে আসছিল টিআইবি। রামপাল, তালতলি ও কলাপাড়ায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সমস্ত কার্যক্রম স্থগিত করতে দাবি এবং ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়নে আশু পদক্ষেপ নিতে হবে বলে আসছে সংস্থাটি। 

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ১১ স্মরণ করে বিবৃতি টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়নে বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষা ও সুরক্ষায় সরকারি প্রচেষ্টা শক্তিশালী করার কথা ছিল। কিন্তু কৌশলগত পরিবেশগত সমীক্ষা ও যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করেই সুন্দরবনের মতো বিশ্ব ঐতিহ্য ঝুঁকিতে রেখে রামপালসহ বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে সরকারের অঙ্গীকারের পরিপন্থী। ইউনেস্কোর এ প্রস্তাবের পর আর নির্বিকার থাকার সুযোগ নেই। অবিলম্বে সুন্দরবন সুরক্ষায় সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে।’ 

জানা গেছে, সুন্দরবন ঘিরে সরকারের ভেতরে দুই মত রয়েছে। একটি অংশ চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পক্ষে থাকলেও আরেকটি অংশ বিশ্ব ঐতিহ্যের এই নিদর্শন রক্ষার পক্ষেই। আর এটি রক্ষায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয় কি পদক্ষেপ নিয়েছে তা জানতে চেয়েছে।

সম্প্রতি একাদশ জাতীয় সংসদের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি’র ১০ম বৈঠক কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী এর সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সদস্য ও উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার, নাজিম উদ্দিন আহমেদ, জাফর আলম, মো. রেজাউল করিম বাবলু এবং খোদেজা নাসরিন ও আক্তার হোসেন বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।

ওই বৈঠকে সুন্দরবনের বিষয়ে ইউনেস্কোর প্রদত্ত শর্তাবলির বিষয়ে মন্ত্রণালয় কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তার অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ২০১৬ সালের মার্চে ইউনেস্কোর তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল প্রকল্প এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন। পরে তাদের প্রতিবেদনে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রকে সুন্দরবনের জন্য ‘মারাত্মক হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রকল্পটি অন্য স্থানে সরিয়ে নিতে বলা হয়। তা না হলে সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা বাতিল করে একে ‘বিপন্ন’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে পোল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির অধিবেশনে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয়।

এরপর মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে গিয়ে বাংলাদেশ সরকারের যুক্তিগুলো তুলে ধরেন এবং প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে ইউনেস্কোর সমর্থন প্রত্যাশা করেন।

শেষ পর্যন্ত এ বছর জুলাই মাসে আজারবাইজানের বাকুতে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৩তম সভায়  ‘বিপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের’ তালিকায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের অন্তর্ভুক্তি আপাতত এড়াতে পারে বাংলাদেশ।

২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকার সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাটের রামপালে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ভারতের সঙ্গে চুক্তি করে। চুক্তির পর থেকেই তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটিসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত কয়লাভিত্তিক এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। তাদের ভাষ্য, এই প্রকল্প সুন্দরবন ও সেখানে থাকা বণ্যপ্রাণীদের জন্য ‘ভয়াবহ হুমকি’র কারণ হয়ে উঠবে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর সুপার ক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ও উন্নতমানের আমদানি করা কয়লা ব্যবহার করা হবে। এতে সালফার, ফ্লাই অ্যাশ ও অন্যান্য উপাদানজনিত বায়ুদূষণের পরিমাণ ‘ন্যূনতম পর্যায়ে’ থাকবে, যার ফলে পরিবেশের ওপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না।

ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটির কাছে সুন্দরবনের কাছে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের যুক্তি তুলে ধরে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে সমর্থন চেয়েছে বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads