• শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২০, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭
ads

জাতীয়

মশার উৎপাতে ফের ডেঙ্গুর শঙ্কা

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

শীত বিদায়ের পর বসন্তের ছোঁয়ায় রাজধানীবাসী; কিন্তু কমেনি মশার উপদ্রব। এদিকে আবারো নগরবাসী ডেঙ্গু আতঙ্কে। এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু যে সারা বছরের সমস্যা হতে যাচ্ছে তা আগেই জানিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা।

আগে ডিসেম্বর-জানুয়ারি সময়ে ডেঙ্গু হওয়ার ঘটনা ছিল কম। এবার জানুয়ারি মাসে নগরীতে এডিস মশার উপস্থিতি যেমন বেশি পাওয়া গেছে, ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন গতবারের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি রোগী।

ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই শীতের প্রকোপ কমতে শুরু করেছে এবার। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মশাও বাড়ছে। নগরবাসী বলছে, দিনের বেলা কোনোমতে পার হলেও সন্ধ্যার আগে থেকে শুরু হয় মশার উপদ্রব। সিটি করপোরেশন মশক নিয়ন্ত্রণে নানা কার্যক্রম চালানোর কথা বললেও নগরবাসীর অভিযোগ, মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম অপ্রতুল।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ‘ডেঙ্গু সার্ভিলেন্স অ্যান্ড প্রেডিকশন প্রোজেক্ট’-এর আওতায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মশার উপস্থিতি নিয়ে গবেষণা করছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা শাখা। সেজন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাকে ছয়টি অঞ্চলে ভাগ করে জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে মশার উপস্থিতি দেখা হচ্ছে। এ জরিপ চলবে আগামী দুই বছর। এই জরিপ জানাচ্ছে, জানুয়ারি মাসেও রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার উপস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, জানুয়ারিতে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরীবাগ ও শাহবাগ এলাকায় মশার ব্রুটো ইনডেক্স ছিল সবচেয়ে বেশি- ২৬ দশমিক ৬৭। এ ছাড়া লালমাটিয়া-মোহাম্মদপুরে ১০, গুলশান বনানীতে শূন্য, বাসাবো-খিলগাঁওয়ে ১৩ দশমিক ৩৩, শাঁখারীবাজার ও পাটুয়াটুলীতে ১৩ দশমিক ৩৩ ছিল। ফেব্রুয়ারিতে এখন পর্যন্ত গুলশান-বনানী এবং লালমাটিয়া-মোহাম্মদপুর এ দুটি অঞ্চলের তথ্য নেওয়া হয়েছে। তাতে দেখা যায়, গুলশানে ব্রুটো ইনডেক্স বেড়ে ২০ হয়েছে। লালমাটিয়ায় কমে হয়েছে ৬ দশমিক ৬৭। মশার লার্ভার উপস্থিতি হিসাব করা হয় ব্রুটো ইনডেক্সের মাধ্যমে। জরিপে প্রতি একশ প্রজনন উৎসের মধ্যে ২০টি বা তার বেশিতে যদি এডিস মশার লার্ভা বা পিউপা পাওয়া যায়, তাহলে সেটাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ উপস্থিতি’ বলা যায়। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ৩৮ জন। আর এ বছর জানুয়ারিতে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৯৭ জন। আর ফেব্রুয়ারির প্রথম ১২ দিনে মোট ২২৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

দেশের ইতিহাসে ২০১৯ সালে ডেঙ্গু এসেছে নানা রেকর্ড নিয়ে। ওই বছর সবচেয়ে বেশি ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আইইডিসিআর ২৬৩টি মৃত্যুর তথ্য পাওয়ার পর তার মধ্যে ১৬৪ জনের মৃত্যু ডেঙ্গুর কারণে হয়েছে বলে নিশ্চিত করে।

বাসাবোর সবুজবাগ এলাকার গৃহিণী সেলিনা আহমেদ বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে এত লেখালেখির পর গত বছর ওষুধ ছিটিয়েছিল। কিছুদিন মশা আসলেই কম ছিল। এরপর আর কোনো ওষুধ দিতে দেখি নাই। এখন আবার মশার উৎপাত বাড়ছে। সন্ধ্যার পর মশার উৎপাতে টেকা যায় না। একই অভিযোগ করেন ওই এলাকার মুদি দোকানি মিজানুর রহমান, ‘আগে মশার ওষুধ ছিটিয়েছিল। এখন আর ছিটায় না। সপ্তাহ দুই মশার উৎপাত বাড়ছে খুব। সন্ধ্যার পর আমার দোকানে খাড়াইতে পারবেন না।

উত্তরার সেক্টরগুলোতে মশার উপদ্রব কিছুটা কম হলেও ভোগান্তিতে আছেন পাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ। আজমপুর কাঁচাবাজারের বাসিন্দা হাসান আলী বলেন, বিকেলে কোথাও দাঁড়ালে মাথার ওপর মশা কিলবিল করে। হাঁটতে গেলে মশা আপনেরে জাইত্তা ধরব। ৫০ নম্বর ওয়ার্ড পড়ছে। এইখানে মশার ওষুধ ছিটাইতে দেখি নাই।

বিমানবন্দর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পুরোনো পত্রিকা পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি করছিলেন বাস কাউন্টারের টিকেট বিক্রেতা দুই তরুণ। শাহ আলম নামে একজন বললেন, মশার হাত থেকে বাঁচতেই এই ধোঁয়ার ব্যবস্থা। তিনি বলেন, ‘ভাই কী পরিমাণ মশা সেটা বলে বোঝানো যাবে না। এইখানে জীবন্ত একজনরে এক ঘণ্টা রাখেন, দেখবেন মশা কামড়াইয়া তারে মাইরা ফেলব।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, জানুয়ারিতে মশার এতটা উপস্থিতি ভালো কথা নয়। জানুয়ারিতে ব্রুটো ইনডেক্স পাঁচের নিচে থাকার কথা। এ সময় এটা হলে সামনের পরিস্থিতি অনুমেয়। গত বছর জানুয়ারির চেয়ে এ বছর জানুয়ারিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যাও বেশি। তার মানে এ বছর ডেঙ্গুর প্রকোপও বেশি হতে পারে।

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা.  মমিনুর রহমান মামুন বলেন, কিউলেক্স মশার অন্যতম প্রজননস্থল সরু নর্দমাগুলোতে মশার ওষুধ ছিটানো যায় না। সেখানে কীভাবে কাজ করব সেটা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন সংস্থার জলাধারে কচুরিপানা আছে, যেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি।

আর এডিস মশার উপস্থিতিও যে আশঙ্কা জাগানোর মতো, তা স্বীকার করে মমিনুর রহমান মামুন বলেন, ব্রুটো ইনডেক্স ১০-এর বেশি হলেই বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছি। গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় এডিস মশা বেশি হচ্ছে। কারণ এসব এলাকার বাসায় প্রচুর পরিমাণ ফুলের টব ও অন্যান্য জিনিস রয়েছে, সেখানে এডিস মশা জন্মাতে পারে। এ ছাড়া নির্মাণকাজও চলছে প্রচুর। গতবারও আমরা এসব এলাকায় এডিসের উপস্থিতি বেশি দেখেছি। আমাদের কার্যক্রম চলছে, তবে পাশাপাশি বাসিন্দারাদের সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। তারা যদি সচেতন না হয় তাহলে এডিসের প্রকোপ আমরা কমাতে পারব না।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads