• সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬
ads
সেবা দিতে অনীহা নার্স-চিকিৎসকদের

প্রতীকী ছবি

জাতীয়

সেবা দিতে অনীহা নার্স-চিকিৎসকদের

  • এমদাদুল হক খান
  • প্রকাশিত ২৪ মার্চ ২০২০

সামান্য জ্বর-সর্দিতে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে এলে সেবা দিচ্ছেন না চিকিৎসকরা। উল্টো নিরাপদ দূরত্বে যাচ্ছেন। চিকিৎসকদের ভীতি দেখে আরো দূরে যাচ্ছেন নার্সরাও। সাধারণ মানুষের অভিযোগ, হাসপাতালে গিয়েও চিকিৎসা পাচ্ছেন না তারা। জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (আইইডিসিআর) ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোন করেও পাত্তা পাচ্ছেন না।

চিকিৎসকদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) না থাকায় তারা চিকিৎসা দিতে পারছেন না। কারণ, করোনা ভাইরাসটি ছোঁয়াছে। এ ধরনের রোগীকে চিকিৎসা দিতে গেলে তারাও ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। সম্প্রতি মিরপুর টোলারবাগে নিহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে একজন চিকিৎসক ও দুই নার্স আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

এদিকে গতকাল সোমবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, এখনো পারসোনাল প্রোটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) অতটা দরকার নেই। তিনি বলেন, চীনে যখন করোনা ভাইরাস ধরা পড়েছিল, তখন তাদের কাছেও পিপিই ছিল না। 

তিনি দাবি করেন, ‘অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থা অনেক ভালো। আমরা যদি প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন যথাযথভাবে নিতে পারি তাহলে ভয়ের কিছু নেই, করোনা ছড়াবে না।’ তবে সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের স্বীকার করেছেন চিকিৎসা সরঞ্জামে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে।

এদিকে ঢালাওভাবে স্বাস্থ্য বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তারা বলেন, করোনা চিকিৎসায় ডেন্টিস্টের কাজ কি? সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালের ঠিক কত শতাংশ চাকরিজীবী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় সরাসরি কাজ করবে? সেখানে সবার ছুটি বাতিল করে আসলে সরকারিভাবে কী করতে চাইছে? তাহলে কি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করতে সক্ষম হচ্ছে না? এই প্রশ্নই ঘুরেফিরে আসছে চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে।

একজন সিনিয়র চিকিৎসক বলেন, সলিমুল্লাহ মেডিকেলের পরিচালক অফিশিয়াল চিঠি দিয়েছেন—নিজ উদ্যোগে মাস্ক সংগ্রহ করতে হবে। এটা একজন চিকিৎসক করলেও সুইপার কীভাবে করবে? এটা দেখে বোঝা যায়, পুরোটা ‘লেজেগোবরে’ অবস্থা। কারো সঙ্গে কারোর সমন্বয় নেই। এখনো এর ভয়াবহতা কেউ বুঝতে পারছে না। যখন এটা দৃশ্যমান হবে, তখন খুবই বিপজ্জনক হবে। গতকাল একজনকে পেলাম, তিনি মেডিসিনের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। দেশে ফিরেই রোগী দেখছেন। আর একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। তিনিও দেশে ফিরেই সব সরকারি প্রোগ্রামে যাচ্ছেন। এভাবে কে যে রোগ ছড়াচ্ছে, এটা বোঝা যাচ্ছে না।

এদিকে সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক তার সহকর্মীদের নিজ দায়িত্বে মাস্ক সরবরাহ করে ব্যবহার করতে বলেছেন। এ ক্ষেত্রে হাসপাতাল কিছু করতে পারবে না বলে তিনি জানান। বিষয়টি নিয়েও চিকিৎসকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা গেছে।

চিকিৎসক নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আড়াই মাস সময় পেয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তারা চিকিৎসকদের জন্য একটা মাস্কের ব্যবস্থা করেনি। তারা চিকিৎসা খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জন্য বড় কিছু করবে, এটা আমরা কীভাবে বিশ্বাস করব? তারা প্রশ্ন রাখেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি হাসপাতালে কর্মরতদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে পারেন?

আরেক চিকিৎসক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার এখন যা করছে সেটা গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো পরিকল্পনা নাই। কোনো প্ল্যান নাই। যা ইচ্ছে হচ্ছে তাই করছে। এভাবে করে আমরা ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছি। কিন্তু এটা নিয়ে কারো তেমন সতর্ক অবস্থা দেখা যাচ্ছে না।

সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সিইও অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ বলেন, আসলে স্বাস্থ্য খাতের সবাইকে সতর্ক রাখার জন্য সরকার সবার ছুটি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছে। সবাই তো করোনা রোগীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকবেন না! তবে, সবাই যেন সতর্ক থাকে, তাই এটি করা হয়েছে।

সিনিয়র চিকিৎসক চিন্ময় দাস বলেন, সরকার যেখানে কাজ নাই, সেখানে অফিস বন্ধ রাখবে—এটা হওয়া দরকার। কিন্তু এখনো সেটি করছে না। এটা যখন করবে, যখন মহামারী হয়ে যাবে তারপর। যা আমাদের সবার জন্য ক্ষতির কারণ হবে।

এ প্রসঙ্গে সিনিয়র সাংবাদিক আফসান চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, এই ভাইরাসটাকে বুঝতে এক মাস-দেড় মাস সময় লেগে গেছে। এটা বুঝতে তাদের যে সময় লেগেছে। এতে ক্ষতি হয়ে গেছে। এই ভাইরাসটা ভীষণ ছোঁয়াচে। এখন সরকারই জানে না আসলে কী করতে হবে? তাই যখন যেটা মনে হচ্ছে, সেটাই করছে। এখনই মনে হচ্ছে, স্বাস্থ্য খাতের ছুটি বন্ধ করে দাও, সেটাই করছে। সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নিতে কতটা ক্ষতি হবে আমি জানি না। সবাই আশঙ্কা করছে দক্ষিণ এশিয়ায় খুব খারাপ অবস্থা হবে? আগামী দুই সপ্তাহ পর আমরা বলতে পারব আসলে অবস্থাটা কত খারাপ!

ছুটি দিল কিনা এটা কোনো বিষয়ই নয়। কারণ, সরকার রিঅ্যাকটিভ। সমস্যা হচ্ছে, সরকার সমাধান করছে। সরকারের কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, বোঝা যাচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, সেটাও বোঝা যাচ্ছে না। সরকার আসলে মোটেই বিষয়টি নিয়ে প্রস্তুত না।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads