• শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২০, ৩১ শ্রাবণ ১৪২৭
ads
দাফন নিয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট

প্রতীকী ছবি

জাতীয়

দাফন নিয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট

  • হাসান শান্তনু
  • প্রকাশিত ০১ এপ্রিল ২০২০

করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলে লাশ দাফনের পর কবর থেকে আশপাশে রোগটি ছড়ানোর ঝুঁকি আছে কি না-এ বিষয়ে বিজ্ঞাননির্ভর ও সচেতনতামূলক প্রচারণা দেশে খুব কম। রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত সুপারিশ মেনে কবরস্থ করার পর ভাইরাস ছড়ানোর যে কোনো ঝুঁকি থাকে না, সরকারি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে জনগণের কাছে এসব তথ্য তুলে ধরার আলাদা কোনো কর্মসূচি নেই। ফলে করোনায় আক্রান্ত বা এমনকি রোগটির উপসর্গ থাকা কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পরও দাফন নিয়ে ভয়াবহ সংকটের

মুখোমুখি হচ্ছেন মৃতের স্বজনরা ও পরিবার। দাফনে জটিলতার ভয়ে কোনো কোনো পরিবার মৃতের রোগের কথা গোপন করে ও আত্মীয়-স্বজনকে না জানিয়ে তড়িঘড়ি করে দাফন করছে। শুধু কোনো রোগ মহামারি আকারে ছড়ানোর পরিস্থিতিতেই নয়, জাতির ইতিহাসেও মৃতদেহ সৎকারে বাধা দেওয়ার মতো এমন পাশবিক ও অবৈজ্ঞানিক কাণ্ডের ঘটনা বিরল বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

‘মৃত ব্যক্তিকে দাফনের পর এলাকায় করোনা ছড়াতে পারে’, এমন অযথা ভয়, শঙ্কা ও গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে দল বেঁধে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। শুধু পারিবারিক কবরস্থানে নয়, এলাকার গণকবরস্থান, এমনকি ঢাকায় সরকার নির্ধারিত খিলগাঁও-তালতলাসহ কোনো কোনো কবরস্থানে করোনায় মৃতদের লাশ দাফনে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ব্যানার টাঙানো হয়। এলাকাবাসী জড়ো হয়ে দাফন না করার দাবিও জানান। অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে কেউ মারা গেলেও ‘করোনায় আক্রান্ত’ গুজব রটিয়ে দাফন নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি করছেন অসচেতন ও বিভ্রান্ত মানুষ।

ধর্মীয় রীতি ও সামাজিক বাস্তবতা অনুযায়ী মৃতের জানাজায় অংশ নিচ্ছেন না অনেকে। করোনাকালে ‘অতিরিক্ত সচেতনতার’ নামে চিরকালীন রীতি, মূল্যবোধ ও কখনো কখনো ধর্মীয় বিধানের তোয়াক্কা অনেকে করছেন না। মৃতের প্রতি এমন নির্দয় আচরণ কারো কাম্য না হলেও পরিস্থিতির পেছনে অপপ্রচার, অজ্ঞতা ও ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব অনেকাংশ দায়ী বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। প্রায় দেশজুড়ে এমন অমানবিক অবস্থার সৃষ্টি হলেও প্রশাসনের এ বিষয়ে যথাযথ ভূমিকা নেই বলেও তাদের অভিযোগ। অবশ্য দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনাগুলোতে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের হস্তক্ষেপেই লাশ কবরস্থ হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির লাশ দাফনে সম্ভাব্য কোনো ঝুঁকির কথা ডাব্লিউএইচওর সুপারিশমালায় উল্লেখ নেই। এ ধরনের রোগীর ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধি ও বৈশ্বিক ওই সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী সৎকারে করার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নেই। মৃতদেহ পোড়ালে দেহাবশেষ বা ছাই থেকেও রোগটি ছড়ায় না। বিশ্বজুড়ে ভয়াল দুর্যোগ হয়ে দেখা দেওয়া এ রোগে দেশের অনেকেই ভীত ও আতঙ্কিত। যে কোনো রোগের মহামারী দেখা দিলে আর ওই সময় সঠিক তথ্য জানা না থাকলে মানুষের আতঙ্ক বাড়ে। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত করোনা বিষয়ে গুজব রটছে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে ‘রক্ষার জন্য’ অনেকে মূল্যবোধ, মানবতা ও ধর্মীয় বিধানের পাশ কাটিয়েও কিছু করতে দ্বিধা করছেন না। তাদের মধ্যে সচেতনতা জাগাতে সরকারের পাশাপাশি মূলধারার গণমাধ্যম, সচেতন নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার ভূমিকা জরুরি। প্রশাসনকেও আরো বেশি ভূমিকা রাখতে হবে। না হলে লাশ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনা আরো ঘটতে পারে।

সরকারের ‘রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের’ (আইইডিসিআর) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত, বা পরীক্ষায় প্রমাণ হওয়ার আগে রোগটির উপসর্গ নিয়ে মৃত কারো দাফন হওয়ার পর লাশ থেকে ভাইরাস সংক্রমণের কোনো সুযোগ নেই। কবর হয়ে গেলে বৈজ্ঞানিকভাবেও সংক্রমণের কোনো ঝুঁকি থাকে না। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিকে কবর দেওয়ার আগে যে ঝুঁকি থাকে, কবর দেওয়ার পর তা আর থাকে না।’

তিনি বলেন, ‘কবরের আশপাশের মাটি বা পাশে কোনো জলাশয় থাকলেও ভাইরাসটির সংক্রমণ হওয়ার সুযোগ নেই। আইইডিসিআরের কর্মকর্তারা এরপরও বাড়তি সতর্কতা হিসেবে কবরের চারিদিকে ভালো করে জীবাণুনাশক ছিটিয়ে দেন। লাশ কীভাবে পরিবহন করা হচ্ছে, দাফন কাজ কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, সেসব নিয়ে মানুষ সচেতন হতে পারেন। মৃত কোনো ব্যক্তিকে কবর দিতে বাধা দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’

খোঁজ নিলে জানা যায়, গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনায় আক্রান্ত শনাক্ত হওয়ার পরপর রোগটিতে মৃত ব্যক্তির দাফন বা সৎকারসংক্রান্ত সরকারি নির্দেশনা দেওয়া হয়। ডাব্লিউএইচওর প্রটোকল অনুযায়ী নির্দেশনাটি তৈরি। মৃতদেহ থেকে অতিরিক্ত ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া রোধে তা তৈরি করা হয়েছে উল্লেখ করে এতে হাসপাতাল বা বাড়ি থেকে মৃতদেহ সংগ্রহ, পরিবহন ও দাফনের নিয়মসহ প্রতিটি পর্যায়ের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি বাস্তবায়ন করে আইইডিসিআর। প্রতিষ্ঠানটির প্রশিক্ষিতরা সতর্কতার সঙ্গে লাশের গোসল ও কাফনের কাপড়ে জড়িয়ে বিশেষভাবে প্যাকেট করেন। মৃতদেহ বহনকারী ব্যাগ কাউকে খুলতে দেওয়া হয় না। লাশ সিল করা বাক্স ও কফিনে করে নিয়ে যতো দ্রুত সম্ভব দাফন করেন তারা। করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত কারো লাশও একইভাবে সৎকার করে প্রতিষ্ঠানটি।

অন্যদিকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন (ইফা) এক বিবৃতিতে করোনায় কারো মৃত্যু হলে গোসল ও দাফন সম্পর্কে ধর্মীয় বিধানসংবলিত পরামর্শ অনুসরণ করতে বলে। জানাজা ও দাফনে ডাব্লিউএইচওর গাইডলাইন অনুযায়ী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা আইইডিসিআরের নির্দেশনা অনুসরণের কথা বলে প্রতিষ্ঠানটি। দাফনের বিষয়ে জনমনে বিভ্রান্তি, গুজব ও শঙ্কা যাতে না ছড়ায়, সে জন্য সচেতনতা সৃষ্টিতে ইফার বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মী, মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষকসহ সব মসজিদের ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনদের বিশেষভাবে অনুরোধও করে। এরপরও থামছে না গুজব আর দূর হচ্ছে অনেকের অচেতনতা। ইফার কেন্দ্রীয় নির্দেশনা বাস্তবায়নে দায়িত্বরতরা যথাযথ ভূমিকা পালন করছেন না বলে অভিযোগ আছে। একই সঙ্গে আইইডিসিআরের করোনায় আক্রান্ত ও রোগটির উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তির সৎকার কাজে সমন্বয়ের অভাবের অভিযোগও আছে।

অভিযোগ উঠেছে, কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীও লাশ দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় ইতোমধ্যে নেতৃত্ব দিয়েছেন বগুড়াসহ একাধিক এলাকায়। বিষয়টি নিয়ে মানবিক সংকটের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও দলের নেতাকর্মী ও অনুসারীদের সচেতন করার বিষয়ে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল চুপ। তবে রাজধানী ছাড়াও গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে করোনা প্রতিরোধে ও দাফনের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে তৃণমূল নেতাদের প্রতি নির্দেশনা পাঠিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। করোনা নিয়ে গুজব ও দাফন নিয়ে কেউ যাতে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি দলটিও নজরদারি করছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এ প্রসঙ্গে মুঠোফোনে বাংলাদেশের খবরকে গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, ‘করোনায় মৃত ব্যক্তির দাফন ও জানাজায় বাধা দেওয়া অমানবিক। বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তির মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়ায় না। দাফনে বাধা দেওয়া ইসলাম ধর্মও সমর্থন করে না। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ভাইরাসটি প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরি করতে সারাদেশে ব্যাপকভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।’

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (বাংলাদেশ ন্যাপ) চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি ও মহাসচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া গতকাল জাতীয় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেন, ‘করোনায় মৃত ব্যক্তির দাফন ও জানাজায় বাধা দেওয়া অমানবিক ও অসহিষ্ণুতা। একশ্রেণির রাজনৈতিক কর্মী এ কাণ্ডে লিপ্ত রয়েছেন। এ ধরনের কাজ সমাজকে অমানবিক সমাজের রুপান্তর করবে, যা থেকে সবাইকে বিরত থাকা উচিত।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads