• বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২০, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
ads
করোনায় ত্রাণকাজে মাঠে সেনাবাহিনীর ৩৭১ দল

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

করোনায় ত্রাণকাজে মাঠে সেনাবাহিনীর ৩৭১ দল

কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিতে প্রাধান্য

  • মো. রেজাউর রহিম
  • প্রকাশিত ০২ এপ্রিল ২০২০

দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও বিস্তার রোধে সামাজিক দূরত্ব ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা কার্যকর করতে বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা। রাজধানীসহ সারা দেশে পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত সশস্ত্র বাহিনী জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় মাঠে রয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে করোনা প্রতিরোধ কার্যক্রমে অংশ নিয়ে দুস্থদের মধ্যে ত্রাণ সহায়তাও বিতরণ  করছে সেনাবাহিনী।

দেশের বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, করোনা প্রতিরোধে রাস্তায় রাস্তায় টহলে রয়েছে সেনাবাহিনী। এছাড়া সেনাবাহিনীর সদস্যরা হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিদের বাসায় গিয়ে সর্বশেষ তথ্য সংগ্রহ করছেন। বিশেষ করে গত কয়েকদিনের মধ্যে যারা বিভিন্ন বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছেন তাদের ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। বিদেশ থেকে দেশে ফিরে কেউ বাইরে ঘোরাফেরা করছেন কি না কিংবা কোথাও জনসমাগম হচ্ছে কি না তা মাঠপর্যায়ে তদারকি করছে সেনাবাহিনী। আইএসপিআর সূত্রে জানা গেছে, দেশের ৬২টি জেলায় সেনাবাহিনীর ৩৭১টি দল করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে করোনা প্রতিরোধ ও বিস্তার কার্যক্রমে কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছে। প্রায় পাঁচ হাজার সেনাসদস্য কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছে। আর প্রয়োজনে এ সংখ্যা বাড়ানো হতে পারে।

এদিকে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ বলেছেন, সেনাবাহিনী প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কাজ করে যাচ্ছে। পরিস্থিতির আলোকে কতদিন সেনাবাহিনী কাজ করবে তা প্রধানমন্ত্রী বিবেচনা করবেন। তিনি বলেন, দেশে করোনা ভাইরাসের বিশেষ পরিস্থিতিতে যতদিন প্রয়োজন হবে, সেনাবাহিনী ততদিন মাঠে থাকবে। তিনি আরো বলেন, কতদিন সেনাবাহিনী মাঠে থাকবে এটা সরকার নির্ধারণ করবে। সরকার যেদিন বলবে সেদিনই আমরা চলে আসব।

গতকাল সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে সেনাপ্রধান এসব কথা বলেন। দেশের অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক ডেকেছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) বুধবারের তথ্যানুযায়ী, করোনা ভাইরাসে দেশে গতকাল পর্যন্ত আরো তিন আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন একজন। এ নিয়ে  দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪ জনে। ভাইরাসটি থেকে সুস্থ হয়েছেন আরো একজন। ফলে মোট সুস্থ হয়েছেন ২৬ জন। আর এতে মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের।

জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ও সংক্রমণ রোধে দেশের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংলগ্ন আশকোনা হজক্যাম্পের কোয়ারেন্টাইন সেন্টারের দায়িত্ব সেনাবাহিনীর হাতে দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাসের বাংলাদেশে সংক্রমণ ও বিস্তৃতি রোধে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তে এ দায়িত্ব সেনাবাহিনীর হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা আনা, করোনায় রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বাড়িতে অবস্থান করা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত করছে সেনাবাহিনী। জানা গেছে, প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন দল দেশের বিভিন্ন স্থানে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা ব্যক্তিদের খোঁজখবর নিচ্ছে। আর বিদেশফেরত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের লোকজন কোয়ারেন্টাইনে আছে কি না, বাইরে ঘুরছে তার খোঁজও নিচ্ছে সেনাবাহিনী। এছাড়া  দেশের বিভিন্ন জায়গায় সচেতনতামূলক কার্যক্রমেও অংশ নিচ্ছে তারা। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে সেনাসদস্যরা মাইকিংও করছেন। কুড়িগ্রাম, বরিশাল রাঙ্গামাটি, মাদারীপুরসহ দেশের ৬২ জেলায় সেনাবাহিনীর ৩৭১টি টিম করোনা প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করছে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জনগণকে সচেতন করার জন্য সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে। এছাড়া মাঠপর্যায়ে কোয়ারেন্টাইন ভঙ্গ করে করোনা ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি সৃষ্টি এবং করোনা নিয়ে মিথ্য ও ভুল তথ্য প্রদান করা হলে বেসামরিক প্রশাসনের মোবাইল কোর্টের (ভ্রাম্যমাণ আদালত) কার্যক্রমেও সহযোগিতা করছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়রুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোয় সামাজিক দূরত্ব এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থার জন্য বেসরকারি প্রশাসনকে সহায়তা দিতে সেনাবাহিনী নিয়োজিত থাকবে।

আইএসপিআর সত্রে জানা গেছে, করোনা প্রতিরোধ কার্যক্রমে সেনাবাহিনীর নির্ধারিত ব্রিগেড কমান্ডাররা বিভাগীয় কমিশনারদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধন করছেন। আর দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউনিট অধিনায়করা জেলা প্রশাসক, পুলিশ প্রশাসন ও সিভিল সার্জনদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন।  সেনাবাহিনীর টিমগুলে বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকদের সমন্বয়ে  বিভিন্ন জেলার করোনা পরিস্থিতির ওপর জেলা প্রশাসনের প্রস্তুতি, মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন স্থানে গত এক মাসে বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তিদের পরিসংখ্যান ও তথ্য নিয়েও কাজ করছে। এছাড়া জেলাগুলোতে সেলফ কোয়ারেন্টাইনের কর্মসূচি নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজনে সম্পৃক্ত করছে তারা।

উল্লেখ্য, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ও বিস্তার রোধে সরকার প্রথম দফায় গত ২৬ মার্চ থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত  দেশের সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে এবং পরবর্তী সময়ে গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এই ছুটি আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ করা হয়েছে সব ধরনের গণপরিবহনও। এছাড়া সংক্রমণ রোধে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষকে ঘর থেকেও বের হতে নিষেধ করা হচ্ছে।

এদিকে ইতোমধ্যে ‘সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮’-এর তিনটি ধারা (২৪, ২৫ ও ২৬ ধারা) ‘মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯’-এর তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে আদেশ জারি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সংক্রামক রোগ আইনের ক্ষমতাবলে করোনা ভাইরাসকে সংক্রামক ব্যাধির তালিকাভুক্ত করে গেজেট জারির পর এ আইনটি মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

জানা গেছে, গতকাল করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বাড়িতে অবস্থান এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমে কুড়িগ্রামে এক মতবিনিময় ও দুস্থদের মধ্যে ত্রাণ সহায়তা বিতরণ করেছে সেনাবাহিনী। বুধবার  দুপুরে কুড়িগ্রাম শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ও ত্রিমোহনী এলাকায় সেনাবাহিনী শতাধিক দুস্থ পরিবারের মধ্যে চাল, ডাল, আলু, লবণ ও তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য বিতরণ করে। রংপুর এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মো. নজরুল ইসলামের  নেতৃত্বে এ ত্রাণ সহায়তা বিতরণ করা হয়। এসময় কুড়িগ্রাামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম,  জেলার পুলিশ সুপার, সিভিল সার্জন উপস্থিত ছিলেন। এসময়  মেজর জেনারেল মো. নজরুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য মাঠপর্যায়ে কাজ করছে।

করোনা মোকাবিলায় এক দিনের বেতন দিয়েছে সশস্ত্রবাহিনী : এদিকে দেশে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ বেগবান করার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এই তহবিলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সকল পদবির সদস্যদের এক দিনের বেতনের পাশাপাশি সেনা কল্যাণ সংস্থা, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, বাংলাদেশ ডিজেল প্ল্যান্ট ও ট্রাস্ট ব্যাংকের পক্ষ থেকে সর্বমোট ২৫ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া নৌবাহিনী সদস্যদের এক দিনের বেতন ও নৌবাহিনী পরিচালিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বমোট ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং বিমান সেনাদের এক দিনের বেতন বাবদ ১ কোটি ২০ লাখ টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে প্রদান করা হয়েছে।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads