• সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২০, ২৬ শ্রাবণ ১৪২৭
ads
মানবিক ঐক্য জরুরি

সংগৃহীত ছবি

জাতীয়

মহাবিপর্যয় ঠেকাতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

মানবিক ঐক্য জরুরি

  • আফজাল বারী
  • প্রকাশিত ০৪ এপ্রিল ২০২০

মানবিক বিপর্যয়ের ধাক্কায় দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে পৃথিবী। হুমকিতে মানবসভ্যতা। প্রাণঘাতী ভাইরাস করোনা থেকে বাঁচতে বিশ্বে এতদিন পর্যন্ত আবিষ্কৃত জ্ঞান-বিজ্ঞানের সর্বশক্তি প্রয়োগ করা হচ্ছে। কিন্তু এখনো কোথাও কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। এর দায়ও স্বীকার করেছেন বিশ্বনেতারা। এই তো কয়েকদিন আগেও করোনায় বিশ্বকে মৃতের লাশ গ্রহণ করতে হতো ঘণ্টার ব্যবধানে, এখন তা মিনিট থেকে সেকেন্ডে। এ অবস্থায় হাল ছেড়ে দিয়ে শেষ ভরসা সৃষ্টিকর্তা। কবলিত দেশকে সাহায্যকারী দাতাগোষ্ঠীর সদস্যরা হাতগুটিয়ে নিজ দেশ নিয়ে ব্যস্ত আছেন। ফলে একের পর এক সহযোগিতার দরজা বন্ধ হচ্ছে। এভাবে সব পথ বন্ধ হয়ে গেলে ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষের পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা করছেন দেশের বিশিষ্টজনদের অনেকেই।

এদিকে শেষ পর্যন্ত প্রস্তুতি আর শৈথিল্যতার কথা উল্লেখ করে আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক সতর্ক বার্তা দিয়েছেন ‘আর দেরি করা সাজে না’।

এছাড়া বিদ্যমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই মুহূর্তে অন্তত তিন মাসের জন্য এক কোটি পরিবারকে বিনামূল্যে খাদ্যবস্তুসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন দেশের ৫৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক।

বিপর্যয় ঠেকাতে স্ব স্ব অবস্থান থেকে মানবিক সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়াতে সরকারের তরফ থেকেও আহ্বান জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোও ঐক্যের কথা বলছেন। কিন্তু সমন্বিত বা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার কোনো উদ্যোগ দেখছেন না দেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। সবার উদ্দেশে তারা বলছেন, মানবিক বিপর্যয় চলছে। আপাতত রাজনীতি নয়, একে অপরের দিকে অভিযোগের আঙুল তোলার সময় এখন নেই। দেশের মানুষ বাঁচাতে মানবিক ঐক্য জরুরি। তবে সে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারপ্রধানকেই। একই সঙ্গে ধর্মান্ধতা থেকে বেরিয়ে আসাসহ প্রকোপ থেকে বাঁচতে নাগরিকদের আরো সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

চীনের উহান থেকে শুরু হওয়া প্রাণঘাতী ভাইরাসের থাবা এখন বিশ্বের দুই শতাধিক দেশে। অপ্রতিরোধ্য এই ভাইরাসের আক্রমণ রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে প্রজাপর্যন্ত। আক্রান্তের সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। আর মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে অর্ধ লাখ। শুধু মানবসমাজ বিনাশই নয়, ধ্বংস করছে মানবতা, থামিয়ে দিয়েছে অর্থনীতির চাকা। বিচ্ছিন্ন হতে বাধ্য করেছে দেশ থেকে দেশ, সমাজ থেকে সমাজ এমনকি মানুষ থেকে মানুষকে।

চীনের মতো উন্নত দেশগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা থাকলেও আমাদের বেলায় শুধুই অন্ধকার দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। আর অর্থনীতির চাকা থমকে গেলে তার প্রভাব পড়বে জীবন চলার সব স্তরেই। ইতোমধ্যে বিদেশীরা ক্রয় আদেশ বাতিল করেছে, বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও আসতে পারে একই সঙ্কেত। এখনই প্রান্তিক পর্যায়ে হাহাকার শুরু হয়েছে। সামনের দিনে আরো ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে। চুয়াত্তর সালের দুর্ভিক্ষের পুনরাবৃত্তির শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. আকবর আলি খান।

করোনা ভাইরাস নিয়ে পরাশক্তি আমেরিকা ও চীনের মধ্যে যেমন পরস্পরকে দোষারোপ করা হচ্ছে, তেমনি প্রস্তুতি আর গুজব নিয়ে দেশের শাসক দল ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও চলছে দোষারোপের রাজনীতি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ অভিযোগ করেছেন, বিএনপিসহ তার মিত্ররা করোনা নিয়ে রাজনীতি করছে। বিএনপির তরফ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে সরকার তথ্য গোপন করছে। পরস্পরের প্রতি দোষারোপ রেখে মানবসভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখতে দ্রুত জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ঐক্য গড়ে তোলার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। 

 

ড. আকবর আলি খান

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খানের মতে, সরাসরি বললে বলতে হবে দেশে ঢিলেঢালা লকডাউন চলছে। ধনী-দরিদ্র সবাই ঘরে আটকা। করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কায় এখন সবাই ভীতসন্ত্রস্ত। সবাই যখন ভীত, তাই সবাইকে এক হয়ে এই দুর্যোগের মোকাবিলা করতে হবে। শুধু করোনা ভাইরাস ঠেকালেই হবে না। ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শেষ হতে পারে কিন্তু তারপর যে দুর্যোগ শুরু হবে সেটা অনেক গুণ বড় হবে নিশ্চিতভাবে। আমরা চীন, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের মানবতা ও অর্থনীতির ধসের চিত্র দেখছি। সে মতে আমাদের দেশের জনসংখ্যা এবং অর্থনীতির অবস্থা বিবেচনা করলে সামনে অনেক বড় ধাক্কা আসছে।

এ অবস্থায় এই অর্থনীতিবিদের পরামর্শ— দেশের বিত্তবান, রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, সুশীলসমাজের প্রতিনিধিদের এককাতারে আনতে হবে। এখন থেকেই সব স্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সমন্বয়ের উদ্যোগটা সরকারকেই নিতে হবে বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

 

ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বিশ্ব পরিস্থিতির বাস্তবতায় এখন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ঐক্য জরুরি। আজ উন্নত, অনুন্নতসহ সারা পৃথিবী আক্রান্ত। তিনি বলেন, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইন, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি এবং মানবাধিকার বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য। কিন্তু সংঘের স্থায়ী ৫ সদস্য একমত হতে পারেনি। অনেক সিদ্ধান্ত তাদের ভেটো পাওয়ারের অপপ্রয়োগের কারণে চূড়ান্ত রূপ পায়নি। পৃথিবীজুড়ে মানবিক বিপর্যয় চলছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ৫ সদস্যকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিক ঐক্যের একটি প্লাটফর্ম হিসাবে কাজে লাগবে। পরস্পরের প্রতি দোষারোপ রেখে মানব সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে দ্রুত আন্তর্জাতিক ঐক্য গড়ে তোলার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন এই শিক্ষাবিদ।

 

 

ড. সুলতানা কামাল

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষে মানুষে ঐক্য করতে হবে। আমাদের দেশে কিছু অমানুষ আছে, যারা দুর্যোগ, দুঃসময়ে সুবিধা নেয়। জিনিসপত্রের দাম বাড়ায়, মজুত করে। খেটে খাওয়া মানুষ অভুক্ত থাকে। তাদের জন্য হাল ছেড়ে বসে থাকার সময় নেই। এখনই ‘মানুষ মানুষের জন্য’ ব্রত নিয়ে ঐক্য গড়তে হবে। সরকার তার রাষ্ট্রীয় কোষাগার যেমন খুলে দেবে, তেমনি বিত্তবানদের মনটাও খোলা রাখতে হবে। সহায়তার হাত প্রসারিত করতে হবে অসহায়দের জন্য।

তার মতে, সব মানুষের সমন্বয় ঘটাতে সরকারপ্রধানকেই উদ্যোগ নিয়ে সামনে এগুতে হবে, মানুষ বাঁচাতে হবে, আর সে জন্য অর্থনীতিকে বাঁচাতে হবে। এখন রাজনীতি করার সময় না। শত্রু-মিত্রের মেলবন্ধন তৈরি করতে হবে।

 

ড. রাশেদা কে. চৌধূরী

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরী বলেন, এখনো করোনা আমাদের দেশে মহামারী রূপ ধারণ করেনি। তবে শঙ্কা তো আছে, প্রস্তুতিটাও সেভাবেই নিতে হবে। চীন, ইতালিকে দেখে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্টদের উচিত হবে করোনায় আক্রান্ত বা মৃতদের সঠিক তথ্য সঠিক সময়ে প্রকাশ করা। নইলে গুজব বাড়বে, তথ্যের গ্রহণযোগ্যতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এতে ঘাটতি দেখা দেবে জনসচেতনতায়। সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলো, লোকজন ঘরে ঢুকে গেল; কিন্তু পরদিনই সরকারি তথ্য হলো দেশের কোথাও কেউ করোনায় আক্রান্ত হয়নি। এটা শুনে ফের রাস্তায় নেমে এলো মানুষ। 

এই শিক্ষাবিদের মন্তব্য, সরকার তার সাধ্যমতো চেষ্টা করছে; কিন্তু রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমরা কতটুকু সচেতন সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তিনি বলেন, এখনো জনসমাগম এড়িয়ে চলছে না মানুষ, মসজিদগুলোতে মুসল্লিদের ভিড় কমছে না। দেশ, সমাজ এমনকি পরিবারের সদস্যদের বিপদে ফেলার অধিকার কারো নেই। তিরমিজি শরীফের বরাত দিয়ে শিক্ষা অধিকার আন্দোলনের এই কর্মী বলেন, ১৪শ বছর আগেই তো রাসুল (সা.) কোয়ারেন্টাইনের নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে শহরে প্লেগ হবে তোমরা সে শহর থেকে বের হবে না, ওই শহরে যাবেও না। ইবাদত তো ঘরে বসেই হয়।’

 

সৈয়দ আবুল মকসুদ   

লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, রোগ থেকে বাঁচতে, মহামারীতে অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে উদ্ধার পেতে মানুষের ঐক্যের বিকল্প নেই। যদিও এ সময়ে জাতীয় ঐক্যের ডাকের প্রয়োজন পড়ে না। নিজ নিজ অবস্থান থেকেই, বিবেকবোধ থেকেই কাজ করা দরকার। তারপরও যেহেতু দেশের সরকার জনগণের অভিভাবক, তাই তাদের উচিত দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে জাতীয়ভাবে কাজ করা।

তিনি বলেন, করোনার ভয়াবহ সংকট মোকাবিলায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সঙ্গে জনগণের সহযোগিতা, সচেতনতা এবং সতর্কতার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্যের এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। এটা দেশবাসীকে আশাবাদী করে তুলছে। এ ধরনের ঐক্য সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বড় ধরনের রক্ষাকবচ হবে— এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।

এদিকে, এই মুহূর্তে অন্তত তিন মাসের জন্য এক কোটি পরিবারকে বিনামূল্যে খাদ্যবস্তু জোগান দিতে সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন দেশের ৫৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক। একই সঙ্গে তারা ওইসব পরিবারকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads