• সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭

জাতীয়

বঙ্গবন্ধু বস্ত্র-পাট জাদুঘর করবে সরকার

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশিত ২৫ অক্টোবর ২০২০

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবো এলাকায় বঙ্গবন্ধু বস্ত্র ও পাট জাদুঘর স্থাপন করবে সরকার। দেশের বস্ত্র ও পাটখাতের ইতিহাস ও সোনালি ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং তা সাধারণ জনগণের কাছে তুলে ধরাই এই জাদুঘরের লক্ষ্য। সেখানকার উৎপাদিত জামদানি পণ্যের বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং তাঁতশিল্পীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুবিধা নিশ্চিতে হবে প্রদর্শনী কাম বিক্রয় কেন্দ্র ও বস্ত্র প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র।

এছাড়া তাঁতিদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং পরিবর্তিত বাজারে ভোক্তার চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন নতুন ডিজাইন উদ্বোধন এবং দক্ষ ডিজাইনার ও মানবসম্পদ তৈরিতে হবে একটি ফ্যাশন ডিজাইন ইনস্টিটিউট। এজন্য ‘বঙ্গবন্ধু বস্ত্র ও পাট জাদুঘর, জামদানি শিল্পের উন্নয়নে প্রদর্শনী কাম বিক্রয় কেন্দ্র, বস্ত্র প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র এবং একটি ফ্যাশন ডিজাইন ইনস্টিটিউট স্থাপন’ নামে একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এতে ব্যয় হবে ২৮২ কোটি ১৫ লাখ টাকা। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের তারাবোতে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।

প্রস্তাবিত ‘বঙ্গবন্ধু বস্ত্র ও পাট জাদুঘর’ মুজিববর্ষে বাস্তবায়নের বিষয়ে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেই অনুযায়ী বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে (পরিকল্পনা) আহ্বায়ক করে গঠিত নয় সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবোতে একটি বঙ্গবন্ধু জাদুঘর স্থাপনের স্থান নির্ধারণ করে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য তুলে ধরে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মো. শাহ আলম বলেন, এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে দেশের বস্ত্র ও পাটখাতের গৌরবময় ইতিহাস ও সোনালি ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সাধারণ জনগণের কাছে তুলে ধরা। উৎপাদিত জামদানিপণ্যের বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা। তাঁতশিল্পীদের জন্য বয়নপূর্ব ও বয়নোত্তর বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করা। এছাড়া দেশের মধ্যম পর্যায়ের প্রযুক্তিবিদ তৈরি এবং তাঁতিদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রদান, পরিবর্তিত বাজারে ভোক্তার চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন নতুন ডিজাইন উদ্বোধন এবং দক্ষ ডিজাইনার ও মানবসম্পদ তৈরি করাও এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।

তাঁত বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, সর্বশেষ ২০১৮ সালের তাঁতশুমারি অনুযায়ী আড়াইহাজারে ২০০টি, সোনারগাঁয়ে দুই হাজার ৭৯৯টি, রূপগঞ্জে তিন হাজার ১৮৫টিসহ সারাদেশে ১০ হাজার ৫৩টি জামদানি তাঁত বিদ্যমান। সেই হিসাবে প্রায় ৩১ হাজার লোক জামদানি শিল্পের সঙ্গে জড়িত।

তিনি আরো জানান, বাংলাদেশের ঐতিহ্যের ধারক এ জামদানি শিল্পের উন্নয়নে ১৯৯২ সালে রূপগঞ্জের দক্ষিণ রূপসী গ্রামে জামদানি পল্লী প্রকল্পের কাজ হাতে নেয় সরকার। জামদানি শিল্প ও তাঁতিদের রক্ষা করাই ছিল এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনকে (বিসিক) প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে প্রকল্পের আওতায় ২০ একর জমি অধিগ্রহণ করে প্রতিটি এক হাজার ৫০০ বর্গফুট বিশিষ্ট ৪২০টি প্লট তাঁতিদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রতিটি প্লটের এককালীন মূল্য ধার্য করা হয় এক লাখ ৩৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে এককালীন পরিশোধ করা হয় ৫৮ হাজার টাকা এবং বাকি ৭৫ হাজার টাকা ১০ বছরে পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হয়।

জামদানি পল্লী প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৮ সালে প্রশাসনিক ভবন, বিপণন কেন্দ্র, হাট-বাজারের জন্য তিনটি সেড, পাম্প হাউস, অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ সম্পন্ন করা হয় এবং প্লটগুলোতে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হয়। বিসিক জামদানি তাঁতিদের ২০০০ সালে ৪০৭টি প্লট বরাদ্দ দেয়, কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র সাতটি প্লট রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান ওই কর্মকর্তা।

জামদানি তাঁতিদের কাছ থেকে জানা যায়, তারা বিসিকের কাছ থেকে প্লট ছাড়া কোনো সুযোগ-সুবিধা পাননি। বিসিক কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রকল্প ও নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় তারা জামদানি পল্লী নিয়ে চিন্তা করার সময় পান না। পানির লাইন, গ্যাস-বিদ্যুৎ, রাস্তাঘাট ইত্যাদি সমস্যার সমাধান তাঁতিদেরকেই করতে হয়।

বিসিক, নোয়াপাড়া জামদানি পল্লীর হাটে বৃষ্টির সময় পানি পড়ে, বাতাস ও বৃষ্টি হলে দোকান গুটিয়ে বসে থাকতে হয়। হাটে কোনো ওয়াশরুম, বিশ্রামাগার, ক্যান্টিন ইত্যাদির ব্যবস্থা নেই। ফলে মূলক্রেতা নারীরা, মধ্যম ও উচ্চশ্রেণির ক্রেতা এবং বিদেশি ক্রেতা এই হাটে কম আসেন। ক্রেতারা সরাসরি তাঁতিদের বাড়িতে গিয়ে তাঁতপণ্য কিনতে চান। কিন্তু জামদানি পল্লীর রাস্তাঘাট দীর্ঘদিন মেরামত করা হয় না।

তাঁত বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, তাঁতিদের বাড়িঘর ও তাঁতশেড অস্বাস্থ্যকর, আশপাশে নোঙরা পরিবেশ। অধিকাংশ তাঁতির বাড়িতে সেলস সেন্টার এবং মানসম্মত ওয়াশরুম নেই। এমনকী বসার ভালো ব্যবস্থাও নেই। ফলে জামদানি পল্লী প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই অর্জন হয়নি। জামদানি শিল্প হারাতে বসেছে তার গৌরবময় অতীত-ঐতিহ্য। এজন্যই নতুন প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে।

তাঁত বোর্ডের প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের তাঁতবস্ত্রের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের। এদেশের তাঁতে উৎপাদিত মসলিন ছিল বিশ্ববিখ্যাত। প্রায় ১৭ ধরনের মসলিন কাপড় বুনন হতো, যার মধ্যে অন্যতম হলো জামদানি। ঐতিহ্যবাহী জামদানি তাঁতবস্ত্রের বুননশৈলী অত্যন্ত শৈল্পিক, অসামান্য এবং অদ্বিতীয়। জামদানিশিল্পীরা ঐতিহ্যগতভাবেই তাদের মনের মাধুরী মিশিয়ে মানসম্পন্ন জামদানি শাড়ি তৈরি করে আসছেন। একসময় মসলিনের পরিপূরক হয়ে বাংলাদেশের ফ্যাশন ঐতিহ্যে স্থান করে নেয় জামদানি। ক্রমেই তা বাংলার তাঁতিদের আপন মমতায় আর সুনিপুণ দক্ষতায় হয়ে উঠে ঐতিহ্যের পাশাপাশি অভিজাত্যের পোশাক।

জামদানি কার্পাস তুলা দিয়ে প্রস্তুত একধরনের সূক্ষ্মবস্ত্র। প্রাচীনকালের মিহি মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি শাড়ি বাঙালি নারীর অতি পরিচিত। কাপড়ের ওপর নকশা করে জামদানি কাপড় তৈরি করা হয়। আবার সুতি সুতার সঙ্গে সিল্ক সুতার সমন্বয়েও তৈরি করা হয় জামদানি কাপড়; যা দেখতে অনেক উজ্জ্বল ও মনোমুগ্ধকর। জামদানি বলতে সাধারণত শাড়িকেই বোঝানো হয়। তবে জামদানি দিয়ে নকশী ওড়না, সালোয়ার, কামিজ, ফতুয়া, কুর্তা, পাগড়ি, রুমাল, পর্দা প্রভৃতি তৈরি করা হয় বলে জানান তারা।

তাঁত বোর্ড থেকে জানা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই শীতলক্ষ্যা নদীর পাড় বরাবর পুরোনো সোনারগাঁও-রূপগঞ্জ-আড়াইহাজার অঞ্চলটি ছিল এই ধরনের কাপড় তৈরির কেন্দ্র। বর্তমানে রূপগঞ্জে নোয়াপাড়া, রূপসী, স্লুইসগেট, গঙ্গানগর, বরাবো, পবনকুল, মৈকুলী, খাদুন ও পার্শ্ববর্তী সোনারগাঁ এবং সিদ্ধিরগঞ্জের কয়েকটি এলাকায় এই শিল্প বিদ্যমান। এছাড়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও জামদানি তাঁতশিল্প বিদ্যমান।

বাংলাদেশের জাতীয় কারুশিল্প পরিষদ ও বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁওকে ‘ওয়ার্ল্ড ক্রাফট সিটি’র মর্যাদালাভের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়। জামদানিকে ঘিরে উৎসব আয়োজনের মধ্যদিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁকে ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফট কাউন্সিলের পক্ষ থেকে ওয়ার্ল্ড ক্র্যাফট সিটির স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলে প্রথম বাংলাদেশের কোনো স্থান ওয়ার্ল্ড ক্রাফট সিটির মর্যাদা লাভ করে—জানায় তাঁত বোর্ড।

২০১৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক সামগ্রী হিসেবে স্বীকৃতি পায় জামদানি। এর আগে ২০১৩ সালে ইউনেস্কো জামদানি বয়নশিল্পকে ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজের মর্যাদা ও স্বীকৃতি দেয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads