• শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৫
ads
বানভাসিদের হাহাকার

ছবি : সংগৃহীত

প্রাকৃতিক দুর্যোগ

বানভাসিদের হাহাকার

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • প্রকাশিত ২২ জুলাই ২০১৯

দেশের বন্যাকবলিত অঞ্চলের কিছু কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করলেও বেশ কয়েকটি জেলায় এখনো বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। টানা বন্যায় সুপেয় পানি ও খাদ্য সংকটে হাহাকার শুরু হয়েছে বানভাসি মানুষের। পানিবন্দি মানুষ মাটির দেখা না পাওয়ায় যাদের খাদ্য মজুত আছে তারাও রান্না করে খেতে পারছেন না। এদিকে বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে বানভাসি এলাকায়। গতকাল রোববার বাংলাদেশের খবর প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদে এসব তথ্য জানা গেছে।

বগুড়া প্রতিনিধি জানান, বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে যমুনার পানি কমলেও বাঙালি নদীর পানি বাড়ছে ব্যাপক হারে। বাঙালি নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পৌর এলাকা সারিয়াকান্দি সদর, নারচী, ফুলবাড়ী, কুতুবপুর ও ভেলাবাড়ী ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ফলে নতুন করে ফসলের মাঠ তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সংখ্যা আরো বেড়েছে। বানভাসি মানুষের দুর্ভোগের পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ভেলাবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান রুবেল উদ্দিন জানান, বাঙালি নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে তার ইউনিয়নের ৬টি গ্রামের সব কটি গ্রামের ফসলের মাঠ তলিয়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, বন্যাকবলিত এলাকায় ১ লাখ ২৫ হাজার গরু, মহিষ, লক্ষাধিক ছাগল, ১০ হাজার ভেড়া পানিবন্দি রয়েছে।

স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি কমে রোববার বিকেল ৩টায় বিপদসীমার ৭৯ সেন্টিমিটার এবং বাঙালি নদীর পানি ৪০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৫৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

জেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, বগুড়ার যমুনা ও বাঙালি নদী বেষ্টিত সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় ২০টি ইউনিয়নের ১৩৮টি গ্রামের ১ লাখ ২৮ হাজার ৯৭০ জন পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, করতোয়া ও বাঙালি নদীর পানি বেড়ে প্রবল চাপে গাইবান্ধায় বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের তিনটি পয়েন্ট ধসে গেছে। এতে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে গোবিন্দগঞ্জ পৌর এলাকাসহ অন্তত ৪০ গ্রাম। দুর্ভোগে পড়েছে সাড়ে পাঁচ লাখ বানভাসি মানুষ। এদিকে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘট নদীর পানি ধীরগতিতে কমতে থাকলেও গাইবান্ধায় সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।

জানা গেছে, গত তিনদিন (শুক্র, শনি ও রোববার) পর্যন্ত গোবিন্দগঞ্জের চরবালুয়া, পশ্চিম কাজিপাড়াসহ তিনটি পয়েন্টে বাঁধের কিছু অংশ ধসে যায়। এর ফলে পানি ঢুকে প্লাবিত হয় মহিমাগঞ্জ, কোচাশহর, শালমারা, তালুককানুপুর, নাকাইহাট, রাখালবুরুজ ও ফুলবাড়িসহ ৯টি ইউনিয়নে বিস্তীর্ণ জনপদ। ঘরবাড়ি তলিয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ।

এছাড়া পৌর এলাকার বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডের বাসাবাড়ি, অলিতে-গলিতে এখন হাঁটুপানি। তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকার আখসহ বিভিন্ন ফসলের জমি। ভেসে গেছে শতাধিক পুকুর ও খামারের মাছ। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে কয়েকটি সড়কের যোগাযোগ ব্যবস্থাও।

গতকাল রোববার সকালে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘সকাল ৮টা পর্যন্ত ফুলছড়ির তিস্তামুখ ঘাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ১১ সে.মি. কমে বিপদসীমার ১৩২ সে.মি, ঘাঘট নদীর পানি ১৩ সে.মি. কমে শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে বিপদসীমার ৮৪ সে. মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া করতোয়া ও বাঙালি নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে করতোয়া নদীর পানি বিপদসীমার ৭ সে.মি. ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি কমে বিপদসীমার ৫০ সে.মি. নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর দুদিন পরেই সব নদ-নদীর পানি বিপদসীমার নিচে নেমে আসবে।’

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জামালপুরে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি কিছুটা কমলেও জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। যমুনার পানি এখনো বিপদসীমার ১১৪ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্রের পানি ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি ছড়িয়ে পড়ছে সদর উপজেলার কেন্দুয়া, তুলশীরচর, লক্ষ্মীরচর ইউনিয়ন ও পৌরসভার কয়েকটি ওয়ার্ডে। পানিবন্দি রয়েছেন প্রায় ১৩ লাখ মানুষ।

এদিকে ১০ দিন ধরে যমুনার পানি বিপদসীমার ওপরে থাকায় দুর্গত এলাকায় ত্রাণের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে পানিবাহিত রোগ। বাড়িঘর ছেড়ে অনেকেই বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন।

শরীয়তপুর প্রতিনিধি জানায়, উত্তরাঞ্চলের বন্যার পানি নেমে আসায় শরীয়তপুর জেলার নদ-নদীর পানি অব্যাহত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে পদ্মা নদীর পানি সুরেশ্বর পয়েন্টে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জাজিরা ও নড়িয়া উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে নড়িয়া-জাজিরা, বিলাসপুর-রাজনগর, বিলাসপুর-কাজিয়ারচর রাস্তার কিছু অংশ ডুবে গেছে। এতে করে জাজিরা নড়িয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা হুমকির মুখে।

ইতোমধ্যে বন্যার পানিতে নড়িয়া উপজেলার কেদারপুর, মোক্তারেরচর ও রাজনগর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জাজিরা উপজেলার পূর্বনাওডোবা ইউনিয়নের পাইনপাড়া এলাকায় চরাঞ্চলের বাড়ির আঙ্গিনা পানিতে তলিয়ে গেছে।

চরভদ্রাসন (ফরিদপুর) প্রতিনিধি জানান, ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও সেই সঙ্গে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চরাঞ্চল ও উপজেলা সদরে প্রায় আট হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে গত কয়েকদিন ধরে পানিবন্দি হয়ে থাকলেও এখনো পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে মিলছে না কোনো ত্রাণসামগ্রী। এতে গবাদিপশু, বৃদ্ধ ও শিশুদের নিয়ে দুর্বিষহ মানবেতর জীবনযাপন করে চলেছে উপজেলার পানিবন্দি হাজার হাজার পরিবার। এতে পরিবারের লোকজনকে নিয়ে একটু নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে আশ্রয়কেন্দ্রসহ আশপাশের বিভিন্ন উঁচু স্থানে আশ্রয়ের জন্য ছুটে চলেছে।

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণের ফলে নেত্রকোনার ৬ উপজেলার ৩৫ ইউনিয়নে কয়েক শতাধিক গ্রাম প্ল­াবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েন লক্ষাধিক মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক, তলিয়ে যায় আমনের বীজতলা। ভেসে গেছে সাড়ে তিন হাজার পুকুরের মাছ। 

তবে গত কয়েকদিন ধরে আবহাওয়া ভালো হওয়ায় পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে দেখা দিয়েছে গো-খদ্যের তীব্র সংকট। সেই সঙ্গে রয়েছে বিশুদ্ধ পানি সংকট। গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি হয়ে থাকলেও বন্যাকবলিত মানুষ পায়নি তেমন কোনো ত্রাণ সহায়তা, অভিযোগ স্থানীয়দের।

ফুলপুর প্রতিনিধি জানান, ময়মনসিংহের ফুলপুরে বন্যার পানি দেখতে গিয়ে পা পিছলে ডুবে সোনিয়া খাতুন (১৩) নামে এক মাদরাসা ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবার দুপুরে উপজেলার সদর ইউনিয়নের বনগাঁও গ্রামের একটি খালে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সোনিয়া খাতুন উপজেলার নগুয়া গ্রামের রবিউল ইসলামের মেয়ে ও বনগাঁও রওজাতুল জান্নাত মহিলা মাদরাসার মীযান জামাতের ছাত্রী।

ফুলপুর ফায়ার ব্রিগেড সূত্রে জানা যায়, সোনিয়া তার বান্ধবী রুমা ও খুশিসহ কয়েকজনের সঙ্গে বন্যার পানি দেখতে বনগাঁও গ্রামে যায়। ডুবন্ত রাস্তার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় পানির স্রোতে সোনিয়ার পা পিছলে খালে পড়ে নিখোঁজ হয়।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads