• শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২০, ১৬ কার্তিক ১৪২৭

পর্যবেক্ষণ

‘পরিবর্তন’ মোকাবেলায় সামাজিক প্রস্তুতি নেই

  • আজাদ হোসেন সুমন
  • প্রকাশিত ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

মূল্যবোধের অবক্ষয় মোকাবেলায় সামাজিক প্রস্তুতি নেই। নেই পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। যে কারণে মানুষের পার্থিব উন্নতি লক্ষণীয় হলেও মানবিক মূল্যবোধ যাচ্ছে রসাতলে। মানুষ করছে পশুর কাজ! মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ে আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে হতাশ দেশের সচেতন মানুষ। 

বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহারে মানবমনে বৈকল্য, প্রযুক্তির সঙ্গে মিশে একাকী থাকায় মমত্ব সঙ্কটে মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে। মানুষ আগে যেভাবে নিজের ক্ষোভকে অবদমন করতে পারত এখন তা পারছে না। তাই ক্ষোভ বা প্রতিশোধ থেকে বেড়ে যাচ্ছে নিষ্ঠুরতার মাত্রা। প্রযুক্তির আকাশছোঁয়া উন্নতির কারণে পরিবর্তনের এই পালাবদলে মানুষের সবকিছুতেই হচ্ছে লক্ষণীয় পরিবর্তন। তবে পরিবর্তনের এই সময় মোকাবেলার জন্য সমাজে যুগোপযোগী প্রস্তুতি নেই। তাই সবক্ষেত্রে বেড়ে চলেছে অপরাধের প্রবণতা।

মা হত্যা করছে সন্তানকে, সন্তান হত্যা করছে মা কিংবা বাবাকে। ভাই-ভাইকে, বন্ধু-বন্ধুকে, প্রেমিক-প্রেমিককে। আবার অপরাধে নতুন মাত্রা এসেছে যৌনতায়। বিকৃত যৌন রুচি চরিতার্থ করতে ধর্ষণ তারপর ধর্ষিতাকে হত্যা, শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যা। এ ছাড়া অপরাধের মাত্রায় আরো যুক্ত হয়েছে সাইবার ক্রাইম। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই সমাজে ঘটে চলেছে নানামুখী অপরাধ। হাতের মুঠোয় প্রযুক্তির সেরা ব্যবহারে সম্মান সম্ভ্রমের ভয়ে জিম্মি হয়ে যাচ্ছে অনেক নিরীহ নারী বা যুবতী। আবার  প্রযুক্তির কল্যাণে ধরাও পড়ছে অনেক অপরাধী। এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে অনেক নারীও জিম্মি করছে পুরুষকে। এসব অপরাধের সঙ্গে বৈশ্বিক সংস্কৃতির যোগসূত্রও খুঁজে পাওয়া যায়। অনেক পরিবারে ভিন্ন সংস্কৃতি চর্চা করতে গিয়ে দ্বন্দ্ব সংঘাত থেকে ঘটে যাচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। সমাজ থেকে রাষ্ট্র, সবক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহারে একদিকে যেমন কল্যাণ হচ্ছে অন্যদিকে নানামুখী অপরাধের মাত্রাও বেড়ে চলেছে। নতুন নতুন এসব অপরাধ প্রতিরোধে যেভাবে সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল তা নেই।

সময়ের পরিবর্তনে অপরাধের ধরন ও মাত্রা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জিয়া রহমান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘ক্ষয়িষ্ণু এই সামাজিক অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। সামাজিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি দিনে দিনে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।’ ‘প্রশ্ন হচ্ছে— সমাজ কী প্রতিদিন পেছনের দিকে যাচ্ছে? এ থেকে রক্ষা পেতে হলে এখনই এদের ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’ ‘আইনের শাসন নিশ্চিত করতে না পারলে সমাজকে নিরাপদ করা যাবে না। অপরাধীচক্রকে চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।’ ‘আমরা মনে করি, সত্যিকার শিক্ষা, জনসচেতনতা ও সর্বোপরি মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত করতে না পারলে অস্বাভাবিক মৃত্যু হিংস্র মনোভাব কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব হবে না’। তিনি আরো বলেন, ‘উন্নত বিশ্বের দেশগুলো সাইবার ক্রাইম নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশেও সাইবার অপরাধীরা সক্রিয় সেহেতু সরকার ও সরকারের প্রশাসনযন্ত্রে এ মুহূর্তে করণীয় হচ্ছে সাইবার সক্ষমতা বাড়ানো।’

এদিকে অপরাধ জগৎ সম্পর্কে পুলিশের সাইবার ক্রাইম জানায়, সাইবার অপরাধ মোকাবেলায় স্বতন্ত্র একটি ‘সাইবার ইউনিট’ গঠন হয়েছে। অপরাধীরা এখন তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে ভিন্ন কৌশলে তাদের অপচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ডিজিটাল জালিয়াতির মূলোৎপাটনে সম্প্রতি সিআইডি পুলিশও সক্ষম হয়েছে। এর আগে হেন কোনো পরীক্ষা নেই যে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে তথ্য চুরি হচ্ছে। অ্যাকাউন্ট হোল্ডারকে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও কম নয়।

এ বিষয়ে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডিআইজি প্রশাসন মাহবুবুর রহমান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘মানুষ যেন ক্রমেই আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। সুকুমারবৃত্তিগুলো কমে যাচ্ছে। মানুষ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে প্রযুক্তি ও বিত্তবৈভব মানুষের আবেগ ও মূল্যবোধে ব্যাপক পরিবর্তন আনছে। এখন মানুষ যান্ত্রিক জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ কারণে আপন মানুষটিকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করছে না।’ ‘অপরাধের পেছনে মানসিক বৈকল্য, বিষণ্নতাও কম দায়ী নয়। পারিবারিক হত্যাকাণ্ড আইনশৃঙ্খলার জন্য অশনি সঙ্কেত হয়ে দেখা দিচ্ছে, তেমনি অবক্ষয়ের চরম পর্যায়ে যাওয়ার মতো দুঃসংবাদের বার্তা দিচ্ছে।’ ‘এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার বিকল্প নেই। এটা সত্য, আমরা একটা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এই অস্থির সামাজিক পরিবর্তনে মানুষের জীবনধারা বদলে যাচ্ছে।’ ‘অপরাধের ধরনের মধ্যেও বৈচিত্র্য আসছে। ইদানীং অপরাধ কর্মকাণ্ডে বেশি মাত্রায় প্রযুক্তির ব্যবহার করা হচ্ছে। সময় এসেছে প্রযুক্তির মাধ্যমেই এসব প্রতিরোধ করার। অবশ্য পুলিশ বাহিনী ইতোমধ্যে এ প্রক্রিয়া শুরু করেছে।’

এদিকে পুলিশের অপরাধ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, গত এক বছরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায় ২শ’ সাইবার অপরাধীকে গ্রেফতার করেছে। এখন যারা তৎপর আছে পুলিশ এদের শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে। এসব সাইবার অপরাধীকে মোকাবেলায় সরকার ই-পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার করছে। প্রায় দেড়শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে ই-পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পুলিশ সদর দফতর, পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও সিআইডি পুলিশের একটি ইউনিট সাইবার অপরাধীদের মোকাবেলায় সাইবার পেট্রলিং করছে। প্রায় ৪শ’ জনবলের এ ইউনিটটি ইতোমধ্যে সরকারের অনুমোদন লাভ করেছে।

অপরদিকে সাইবার অপরাধ দমনে পুলিশের বিশেষ ইউনিট সৃষ্টি হলেও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে মানুষের নৈতিক উন্নতিতে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে উল্লেখ করার মতো কোনো উদ্যোগ নেই।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads