• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads

মতামত

বেপরোয়া বাস যেন মূর্তিমান আতঙ্ক

  • প্রকাশিত ২৭ এপ্রিল ২০১৮

প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা এবং তাতে মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। তারপরও প্রয়োজনের তাগিদে মানুষকে ঘর থেকে বের হতে হয়। কবিতার নন্দলাল হয়ে ঘরে বসে থাকলে তো আর জীবন চলে না। উপায় কী? জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও প্রতিটি মানুষ প্রতিদিন ছুটছে দেশের এ-প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। এদের কাউকে না কাউকে লাশ হয়ে ঘরে ফিরতে হয়। এর কি কোনো প্রতিকার নেই? এমন জিজ্ঞাসা এখন দেশের প্রত্যেক মানুষের। এরপরও বাসচালকদের চৈতন্য ফেরে না। ওরা যে বেপরোয়া, ওদের থামাবে কে? বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়েচড়ে বসে। হুংকার ছাড়ে, বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু কই, এত মৃত্যুর পরেও কোনো চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা হলপ করে কেউ বলতে পারবেন না।

প্রতিটি মৃত্যু মানুষকে কাঁদায়। দূরপাল্লার যানবাহনে দুর্ঘটনা ঘটছে সমানে। যখন এ নিবন্ধ লেখা হচ্ছে, তখন বিবিসির খবরে শুনলাম নওগাঁয় একই দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নয়জনের প্রানহানি ঘটেছে। শুধু নওগাঁ কেন, প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে। এর মূলে অনেক বিষয়কে দায়ী করা হলেও একটি বিষয় এখন স্পষ্ট, চালক চলন্ত অবস্থায় মিনিটের পর মিনিট ধরে মোবাইলে কথা বলায় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটছে। কোনো যাত্রী আপত্তি তুললে ওরা আরো বেপরোয়া হয়ে যায়। কোনো কথাতেই কাজ হয় না। আপত্তির মুখে তারা শান্ত হয়েছে, এমন নজিরও নেই। উল্টো আরো বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালায়। ভাবখানা এমন- তারাই পথের রাজা।

সম্প্রতি রাজধানীর রাজপথে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে লোকাল বাসগুলো। ছোট যানবাহন, যাত্রী কিংবা পথচারী কেউই নিরাপদ নয় এসব বাসের কাছে। জনবহুল রাজপথে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসা বাসগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়, এতে ঘটছে অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা। যে দুর্ঘটনার বলি হয়ে কেউ চলে যাচ্ছেন না ফেরার দেশে। আবার কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করে নিচ্ছেন বাধ্য হয়ে। কিছুদিন আগের কথা, বাসের যাত্রী হয়ে কুড়িগ্রাম থেকে চিলমারী যাচ্ছি। পথে দুর্গাপুর নামক স্থানে জরাজীর্ণ একটি সেতুতে এক কিশোর সাইকেল চালিয়ে পার হচ্ছে। জানালা দিয়ে দেখলাম, বাসটি ছেলেটির গা ঘেঁষেই সেতুটি পাড়ি দিল। বিনয়ের সঙ্গে চালককে বললাম, ভাই বাসটি তো আপনি ডান দিকে সরিয়ে নিতে পারতেন। জবাবে তিনি বললেন, আমি তো চেয়েছিলাম ছেলেটিকে চাপা দিয়েই যাব। কিন্তু কেন? জবাব সহজ-সরল, ও কেন সাইকেল নিয়ে সেতুতে উঠল? কী অদ্ভুত মানসিকতা! মনে হয় তাদের ঘরে কোনো কিশোর সন্তান নেই। তা না হলে কেউ কি এভাবে বলতে পারেন? চালক আমার পরিচিত। এ ঘটনার ক’মাস পর ওই চালককে দেখলাম, উদ্ভ্রান্তের মতো উলিপুরে ছোটাছুটি করছেন। জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার? জবাবে বললেন, ছেলেকে খুঁজে পাচ্ছেন না। কী আশ্চর্য! অন্যের সন্তানের প্রতি তার মমত্ববোধটুকু ছিল না, আর নিজের সন্তানের খোঁজে তিনি এখন মরিয়া। কথাগুলো শুধু ভাবলাম। অর্থাৎ প্রতিটি মানুষের সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। তা না হলে নিজের অজান্তে বড় কোনো সর্বনাশ ঘটতেও পারে। বাসের চালক, তারাও তো রক্তে-মাংসের একজন মানুষ। তাদের মধ্যে মানুষের প্রতি ভালোবাসার এত কমতি কেন? তারা একটু দায়িত্বশীল হয়ে গাড়ি চালালে এত মানুষের জীবনহানি ঘটত না। তবে দুর্ঘটনা দুর্ঘটনাই। তাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে হবে। ধরুন, একটি বাসের স্টিয়ারিং ভেঙে গেছে। চলন্ত অবস্থায় সামনের চাকা ফেটে গেছে কিংবা ব্রেক অকার্যকর হওয়ায় দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা হতেই পারে। তবে সড়কে চলার উপযুক্ত একটি গাড়িতে এ ধরনের ঘটনা সহসা ঘটার কথা নয়। যান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া গাড়ি চালানো উচিত নয়। দূরপাল্লার কিংবা লোকাল যে কোনো বাসই যাত্রী নামিয়ে দিয়ে পুনরায় যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করে। অনেক সময় দেখেছি, চার-পাঁচশ’ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে একই চালক বিনা বিশ্রামে আবার গাড়ি নিয়ে রওনা দেন। এটা কী করে সম্ভব? ক্লান্তি, ঘুমের ঘোরে বাসটি দুর্ঘটনায় পতিত হতেই পারে, এটাই স্বাভাবিক। ফলে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রুনি আক্তার। গত ১১ এপ্রিল রাজধানীর ব্যস্ততম সড়ক ফার্মগেটে বেপরোয়া বাসের চাপায় ডান পা থেঁতলে যায় রুনি আক্তারের। রুনি আক্তার মাস্টার্স সম্পন্ন করে এমবিএ করছিলেন। রুনি আক্তারকে পঙ্গু হাসপাতালে অপারেশন শেষে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। গত ৩ এপ্রিল কারওয়ানবাজার এলাকায় দুই বাসের চাপায় কলেজছাত্র রাজীব ডান হাত হারান। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজীব সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। পিতৃহারা রাজীবের ছোট দুই ভাইয়ের আহাজারি, কে দেখবে আমাদের? অবশ্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে রাজীবের দুই ভাইয়ের লেখাপড়ার ব্যয়ভার বহন করার। শুধু রুনি আক্তার ও রাজীবই নয়, গত ৫ এপ্রিল আয়েশা খাতুন মেয়ে অহনাবকে নিয়ে রিকশায় নিউ মার্কেট থেকে ধানমন্ডি স্কুলে যাওয়ার পথে দুই বাসের চাপায় গুরুতর আহত হন। ল্যাবএইড হাসপাতালে নিউরো সার্জারি বিভাগের কনসালট্যান্ট মাসুদ আনোয়ার জানান, আয়েশা খাতুনের মেরুদণ্ড ভেঙে গেছে, যা অস্ত্রোপচার করে ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু তার স্পাইনাল কর্ড ডেমেজ হয়ে গেছে। এ কারণে কোমর থেকে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে আছে। হয়তো শেষ পর্যন্ত চিরজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে তাকে বেঁচে থাকতে হবে। মাত্র কয়েকদিনের মাথায় একের পর এক দ্রুতগামী বাসের চাপায় যাত্রী, রিকশা আরোহী কিংবা পথচারীদের এভাবে দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়েছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। এ পর্যন্তই। সেই তদন্তের প্রতিবেদন জনগণ জানতেও পারে না। আরেকটি বড় দুর্ঘটনায় হারিয়ে যায় আগের ঘটনা। প্রকৃত অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তিও কোনোদিন হয় না। ভুক্তভোগীরা ক্ষতিপূরণও পান না। সহায়-সম্বল যা আছে, তা বিক্রি করে চিকিৎসা নিতে হয়। এজন্য আইনের শাসন প্রয়োজন। কারণ কোনো দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত না হলে অপরাধপ্রবণতা বাড়ে। আবার আইনের ফাঁকফোকর গলে অপরাধীরা পারও পেয়ে যায়। মানুষের একমাত্র ভরসা সৃষ্টিকর্তার কৃপা, যাঁর দয়ায় মানুষ বেঁচে আছে। আবার কেউ কেউ নিয়তি ভেবেও সান্ত্বনাও খোঁজেন।

সড়কে নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হয়, রোড শো হয়। বিআরটিএ সড়ক নিরাপত্তা ইউনিট গঠন করেছে। ২২টি জাতীয় মহাসড়কে থ্রি হুইলার, অটোরিকশা, নছিমন-করিমন চলাচল নিষিদ্ধ হয়েছে। বেশ কয়েকটি মহাসড়কে চার লেন চালু হয়েছে, স্থাপন করা হয়েছে সড়ক বিভাজন। নির্মিত হয়েছে ফুটওভার ব্রিজ-আন্ডারপাস। এরপরও সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে। সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে চার হাজার ৩১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ছয় হাজার ৫৫ জন নিহত এবং ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হয়েছিলেন। ২০১৭ সালে চার হাজার ৯৭৯টি দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৯৭ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হন। মনে হয়, সড়ক দুর্ঘটনায় এত বিপুলসংখ্যক যাত্রী পৃথিবীর আর কোনো দেশে মৃত্যুবরণ করেন না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালকদের যেমন সতর্ক হতে হবে, তেমনি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। যেমন রাজধানী ঢাকায় ফুটওভার ব্রিজ থাকার পরও অধিকাংশ পথচারী তা ব্যবহার না করে ব্যস্ততম সড়কে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পারাপার হচ্ছেন। অর্থাৎ আইনের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধটুকুও যেন আমাদের নেই। ফলে পথ পারাপারের সময়ও অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাও ঘটছে। এখন সরকারের উচিত ঢাকায় ব্যস্ততম সড়কের প্রতিটি মোড়ে আন্ডারপাস, ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা। তাহলে এসব ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগ্রহ মানুষের বাড়বে।

জীবনের মূল্য অনেক বেশি। এ উপলব্ধি মাথায় নিয়ে পথ পারাপারকারীদের সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে হবে। জেব্রাক্রসিং ছাড়া সড়ক পারাপার করা যাবে না। এটা নিশ্চিত করতে ট্রাফিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সর্বোপরি চালকদের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে হবে। তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হবে। অর্থাৎ চালক এবং সাধারণ মানুষ যদি সচেতনভাবে গাড়ি চালান এবং পথচারী পথ পারাপারে সতর্কতা অবলম্বন করেন, তাহলে রোধ করা সম্ভব সড়ক দুর্ঘটনা।

আবদুল হাই রঞ্জু , সমাজসেবী

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads