• শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
এ ব্যাধি থেকে মুক্তি চাই!

এ ব্যাধি থেকে মুক্তি চাই!

প্রতীকী ছবি

মতামত

এ ব্যাধি থেকে মুক্তি চাই!

  • আফরোজা পারভীন
  • প্রকাশিত ০২ জুন ২০১৮

বিদেশে পাড়ি দেওয়া এখন ভাইরাসের মতো ছড়াচ্ছে। আমাদের ছেলেমেয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। কেন পাড়ি জমাচ্ছে, বিদেশে গেলে কী লাভ, আদৌ কোনো লাভ আছে কিনা এসব না ভেবেই পাড়ি জমাচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন ভালো ছাত্রছাত্রী বৃত্তি পেয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেত। এই দলে ছিল মেধাবী ছাত্রছাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার, গবেষকরা। তারা বেশিরভাগই শিক্ষা সমাপ্ত করে দেশে ফিরত। দেশের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করত। এরপর আমাদের ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ানরা চাকরি নিয়ে বিদেশে যেতে শুরু করল। বিশ্বব্যাপী কম্পিউটার প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এ দেশের ছেলেমেয়েও ওদিকে ঝুঁকে পড়ল, কেউ গেল পড়তে, কেউ চাকরি করতে। এ পর্যন্ত ভালোই ছিল। তারপর এক পর্যায়ে আমেরিকা ‘ডিভি’ ছাড়ল পর পর বেশ কয়েক বছর। আশ্চর্য সারা দেশের শিক্ষিত অশিক্ষিত সমপ্রদায়ের মানুষ নির্বিশেষে ডিভির পেছনে ছুটল। এ এক অদ্ভুত সোনার হরিণ। সরকারি কলেজের শিক্ষক আমেরিকা গিয়ে মুরগি বিক্রি করতে শুরু করল, ব্যাংকার বাড়ির দারোয়ান হলো। ভুলে গেল তারা সোনালি অতীত। কেউ কেউ পরিবার-পরিজন ফেলে নিজে গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে থাকল। কিন্তু যাওয়া থামল না। এরপর মাইগ্রান্ট হতে থাকল কানাডায়। মালয়েশিয়া, তুরস্ক তাদের ‘সেকেন্ড হোম’ প্রকল্প চালু করল। ব্যস হয়ে গেল। বড়লোক মাত্রই ইউরোপ-আমেরিকা কানাডায় নামে-বেনামে একাধিক বাড়ি করল। মালয়েশিয়া তুরস্কের দ্বৈত সিটিজেন হলো। ছেলেমেয়ে মালয়েশিয়ার স্কুল-কলেজে ভর্তি করল। হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার হতে থাকল। ছেলেমেয়ের স্কুল-কলেজ শুরু হলো শুধু মালয়েশিয়া, তুরস্ক নয়, ইউরোপ-আমেরিকায়। তারা ভুলে গেল ওসব দেশের শীতের কষ্ট, পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতা, সব, সবকিছু।

অন্যদিকে খুলে গেল কুয়েত-কাতার-মালয়েশিয়া-সৌদি আরবের শ্রমবাজার। দেশে যারা আয়েশে আধাবেলা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয় তারা এসব দেশে গিয়ে কেউ শ্রমিক হলো, কেউ ড্রাইভার। কেউ কাজ পেল না, কেউ উটের জকি হলো, কেউ বা এয়ারপোর্ট থেকে ফিরে এল, কেউ কেউ জেলে পচল বছরের পর বছর। সমুদ্রে ডুবে মৃত্যু হলো অনেকের। দালাল শ্রেণি ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। গরিব মানুষের ঘটি-বঁটি বাধা পড়ল, জমি জিরেত বউয়ের গয়না বিক্রি হলো। তবু বিদেশে যেতে হবে।

আজকাল শুধু ধনী আর দরিদ্র নয়, সব শ্রেণির গন্তব্য বিদেশ। বাবা-মা ভাবছেন, ‘এই বয়সে তো আর আমরা বাইরে গিয়ে কিছু করতে পারব না, কোনোক্রমে ছেলেমেয়েকে পাঠিয়ে নিরাপদ হই।’ যুক্তি অনেক। দেশে চাকরি নেই, নিরাপত্তা নেই, যানজটে জীবন অতিষ্ঠ, জঙ্গিবাদ, মেধার সঠিক মূল্যায়ন নেই আরো কত কী। যেন ওদেশে কত ভালো ভালো চাকরি আছে, যেন ওসব দেশে জীবন অনিরাপদ নয়, যেন জানজট নেই। এক লসএনজেলসেই যে জানজটের বহর পড়ে তা দেখলে বাংলাদেশকে বাহবা দিতে ইচ্ছে হয়। আর জঙ্গিবাদ কোথায় নেই? হ্যাঁ, ঠিক আগে আমাদের দেশে এটা ছিল না, এখন হয়েছে। তা হবে না কেন? মেধাবী মুক্তবুদ্ধির ছেলেমেয়ে যদি বিদেশে গিয়ে অড জব করে, তাদের মেধার অপচয় করে, পেট্রো ডলারের পেছনে ছোটে, তাহলে এই ছেলেগুলো যে জঙ্গি হচ্ছে তাদের মাথায় শুভবোধ ঢোকানোর লোকের তো কমতি পড়ে যাচ্ছে। আর মূল্যায়ন! হাস্যকর! যে দেশে তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকতে হয়, আত্মমর্যাদা খুইয়ে সবসময় ছোট হয়ে থাকতে হয়, যে দেশ আমাদের পরগাছা মনে করে, সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয় কখন কোন সরকার আসে আর বের করে দেয়, কতটা বিধিনিষেধ চাপে, সেখানে আবার কিসের মূল্যায়ন? এক ক্লাবে পর্যন্ত বসার সুযোগ পায় না বাঙালিরা। ক’জন বাঙালি বলতে পারেন তারা নিজের কমিউনিটির বাইরে বিদেশিদের বাড়িতে যাতায়াত করেন, তাদের সঙ্গে একই ক্লাবে আড্ডা মারেন, তাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মেশেন? আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, হাতেগোনা দু’চারজনও পাওয়া যায় কিনা সন্দেহ!

আমার দু-একটা অভিজ্ঞতা আছে এ ব্যাপারে। আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বাড়িতে নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। স্বামী-স্ত্রী দুজন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমাকে পেয়ে যেন হাতে চাঁদ পেয়েছিলেন। খাওয়া-দাওয়া গল্পগুজব হলো। এক পর্যায়ে জানতে চাইলাম, ‘অবসর কাটান কী করে?’ ‘টিভি দেখি, বই পড়ি।’ ‘কেন আশপাশে কোনো ক্লাব নেই?’ ‘আছে বিদেশিদের। ওখানে আমাদের যেতে কেউ নিষেধ করে না। তবে গেলে মেশে না।’ বুঝুন অবস্থাখানা! একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক একটি ক্লাবে অবাঞ্ছিত। কারণ তিনি বিদেশি, কালো চামড়া।

আর একটা ঘটনা বলি, ইতালির ভেনিসে ক্যানেলের কিনারা দিয়ে হাঁটছি। অপূর্ব সুন্দর চারদিক। ঘুরে ঘুরে দেখছি। ক্যানেলের পাশে মাটিতে পত্রিকা ছড়িয়ে বিক্রি করছে একটা ছেলে। অনর্গল ইংরেজিতে লোক ডাকছে। আমি ওকে অতিক্রম করে চলে গেলাম। তারপর আমার কেমন যেন মনে হলো ও আমার খুব চেনা। আমার শহরের ছেলে। আমি ফিরে গিয়ে বললাম, ‘আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ?’ ও এক ঝটকা আমার দিকে তাকালো। তারপর অনর্গল ডয়েস বলতে শুরু করল। যেন শোনেইনি আমার কথা। আমি কয়েকবার ওর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে ফিরে এলাম। মনে হলো চিৎকার করে বলি, ‘ফিরে চল ভাই আমার, ফিরে চল নিজের দেশে।’ এলাকার লোক জানে, ও ইতালিতে একটা বড় চাকরি করে।

আর নিরাপত্তা? এই তো মাঝেমধ্যেই শুনি লাগাতার মৃত্যুর খবর। ডাকাতের হাতে নাজমা বেগমের মৃত্যু হলো। কী প্রয়োজন ছিল একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় স্কুলশিক্ষকের দেশ থেকে বিদেশে গিয়ে মুদি দোকানদার হওয়ার! শুনেছি তার স্বামীও একটা কলেজের শিক্ষক ছিলেন। তিনিও এখন দোকানদারি করেন। তার কিছুদিন আগে সন্তানের হাতে বাবা-মায়ের মৃত্যু, মসজিদে মোয়াজ্জিনের মৃত্যু সবই ঘটেছে খোদ আমেরিকায়। তথাকথিত নিরাপদ, সভ্য দেশে। নিঃসঙ্গতা আর অসহায়ত্বের কথা যদি বলি সে তো সীমাহীন। যে বিদেশে যায়, আস্তে আস্তে তার কাছের কিছু মানুষ নিয়ে যায়। ভাই-বোন শালা-শালি এসব। কিন্তু অতটুকুই। সে তো পারে না তার পাড়া-প্রতিবেশী, তার গ্রাম বা তার শহরকে সঙ্গে নিয়ে যেতে। ওখানে নেই কোনো অবসর। বেকার মানুষের কোনো দাম নেই। যতক্ষণ তুমি খাটতে পারছ তুমি একজন মানুষ। যখন পারছ না, তুমি বাতিলের খাতায়। তোমাকে কেউ জিজ্ঞাসা করবে না কেমন আছ তুমি, শরীর কেমন। বন্ধুবান্ধব আত্মজনের সাহচর্য পাবে না। রাস্তায় সালাম পাবে না, মরলে দেশের মাটি পাবে না। আর সর্বক্ষণ তোমার চিন্তায় না জানি ছেলে কিংবা মেয়ে কোনো বিদেশি কিংবা অন্য ধর্মের কাউকে বিয়ে করে ফেলল। একটা মূল্যবোধ নিয়ে তুমি বড় হয়েছ। সে মূল্যবোধের বাইরে তুমি বেরিয়ে আসতে পারবে না, সে তুমি ইউরোপ যাও আর আমেরিকায় যাও।

আর দারিদ্র্য, তাও আছে। আমাদের একজন চেনা সাংবাদিক মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেন দারিদ্র্যের কারণে। দারিদ্র্যের কষাঘাতে ধুঁকে ধুঁকে মরেন। আর আমি নিজেই রাতের নিউইয়র্কের রাস্তায় ডাস্টবিন থেকে খাবার তুলে খেতে দেখেছি। এর নাম বিদেশ! তবু আমরা যাই। কিন্তু কেন যাই?

অনেক রক্ত ঝরিয়ে দেশটা স্বাধীন করেছি আমরা। তারপরও রাজনৈতিক নানা টানাপড়েনে পাড়ি দিয়েছি দীর্ঘ বৈরী পথ। আমি মানছি দেশে এখনো অনেক সমস্যা আছে। কিন্তু দেশের প্রতি কি আমাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই, নেই কোনো দেনা? যে দেশ জল দিল, হাওয়া দিল, আশ্রয় দিল সেই দেশকে উপেক্ষা করার কী অধিকার আছে আমার। তবু বুঝতাম দেশ আমাকে আশ্রয় দিতে, প্রশ্রয় দিতে অপারগ। তাও তো নয়। বাংলাদেশ তো আজ সবদিকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ। প্রাইভেট সেক্টর ডেভেলপ করেছে, সরকারি চাকুরেদের বেতন বেড়েছে, প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, হচ্ছে প্রতিনিয়ত। অনেকগুলো বেসরকারি টিভি হয়েছে, সংবাদপত্র আছে অগুনতি। এদেশে বসেই তো আমাদের ছেলেমেয়ে মাসে চার-পাঁচ লাখ টাকা আয় করছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ বেড়েছে। এদেশে আছে ঢাকা আর নটর ডেম কলেজের মতো কলেজ, আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট। সারা দেশের উপজেলা পর্যায়ের একটা করে কলেজ সরকারি করা হয়েছে। তবু আমরা কেন ছুটছি এই সোনার হরিণের পেছনে? এটা কী আমাদের কোনো মানসিক ব্যাধি!

লেখক; কথাশিল্পী, কলাম লেখক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads