• বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
খায়েশ

মনের চাওয়াই তো খায়েশ

আর্ট : রাকিব

মতামত

খায়েশ

  • আবদুল মতিন খান
  • প্রকাশিত ২৯ জুলাই ২০১৮

মন তো কত কিছু চায়। মন চাইতেই পারে। চায় অনেক কিছু করতে। চায় অনেক কিছু পেতে। কথায় আছে, ‘মনে করি করী কিন্তু হয় হয় না।’ মনের চাওয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয়ে থাকে আকাশকুসুম। মা তার শিশুকে ভাবে চাঁদ। চাঁদনি রাতে শিশুকে কোলে নিয়ে দাওয়ায় বসে তার কপালে গালে চুমু দিতে দিতে বলে ‘চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা।’ মানুষের এসব চাওয়া বেশি দিন টেকে না। কাল বা সময় এমন একটা জিনিস, যা মুহূর্তে মুহূর্তে বিলীন হয়ে যায়। সময়ের এই বিলীয়মানতার মধ্যে মানুষকে জীবন সংগ্রামের প্রস্তুতি বা শিক্ষা নেওয়া, শিক্ষা শেষে কর্মজীবনে প্রবেশ, বিয়েশাদি ও সন্তান উৎপাদন, তাদের মানুষ করা ও তাদের বিয়ে দেওয়া, কর্মজীবন পাড়ি দিয়ে অবসরে যাওয়া, অবসরে করার কিছু না থাকলে জাবর কাটা, অর্থাৎ অতীত রোমন্থন- এভাবেই চলতে হয় ভেসে।

মোটা দাগে সময়ের পিঠে এভাবে ভেসে চললেও চলা বহু ক্ষেত্রে হয় না এমন মসৃণ। চড়াই-উৎরাই ছাড়াও থাকে বাধাবন্ধ। অসম সমাজে হাঁ-ভাতেদের এগিয়ে চলা অন্নভোজীদের থেকে হয় ঢের বিঘ্নসংকুল। হাঁটাচলা শেখার প্রায় পর থেকে নিজের পেটের খাবার নিজেকে জোগাড় করতে হয়। করতে গিয়ে চড়-থাপ্পড় থেকে শুরু করে হাত-পা বেঁধে কোমরে দড়ি দিয়ে গাছ অথবা খুঁটির সঙ্গে আটকে থেকে খেতে হয় মৃত্যু পর্যন্ত বেদম লাঠিপেটা। এই যন্ত্রের যুগে কাজের গাফিলতির অজুহাতে মলদ্বারে মোটরযানের চাকায় বাতাস পোরার পাম্পের আগা ঢুকিয়ে পেটে হাওয়া দেওয়ায় পাকস্থলী ও ফুসফুস ফেটে মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে মৃত্যুও এদের হালের কপালের লিখন। বাঙালি যে অসাধারণ সৃজনশীল মেধাবী জাতি এ অচিন্ত্যনীয় পদ্ধতিতে মানুষ খুন তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। পৃথিবীর অন্য কোনো জাতির কোনো প্রতিভাবান এমন পদ্ধতির হত্যার কথা ভাবতে পারেনি। এতসব দুর্দশার মধ্যে বসবাস করেও দু’একজন জীবনযুদ্ধে এগিয়ে গিয়ে সফল হয়। ইদানীং বিনে পয়সায় লেখাপড়া শেখার সুযোগ হয়েছে। এর সুযোগ নিয়ে অধ্যবসায়ী কেউ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করে পরীক্ষায় ভালো ফল করলে শিক্ষকদের মনোযোগ পায়। ফাইনাল বা বোর্ডের পরীক্ষায় হয় প্রথম। উচ্চশিক্ষার জন্য শহরের কলেজে ভর্তি ও তার হোস্টেলে থাকার জন্য পায় সহূদয় বিত্তবানের আর্থিক সহায়তা। উদ্যমী ও প্রতিভাবানদের কোথাও আটকে থাকতে হয় না। তারা তরতর করে এগিয়ে যেতে পারে।

আজকের অস্থির সমাজে, যারা প্রতিভাবান ও বুদ্ধিমান নয় তাদের জীবন সংগ্রাম বেশ কঠিন। তাদের কর্মজীবনে প্রবেশ, নিজের ও পরিবারের পেটের ধান্ধা মেটানো সহজ হয় না। ছোটখাটো চাকরি পেতে হলে হোমরাচোমরা কাউকে ধরতে হয়। খালি হাতে ধর্ণা দিয়ে কাজ হয় না। লাগে মোটা রেস্ত। সেটা সংগ্রহ করতে বেচতে হয় মা অথবা স্ত্রীর গয়না। কিংবা বেচতে হয় জমি। দেশে কাজের সুযোগ কম থাকায় সাহসীরা পাড়ি জমায় বিদেশে। যারা টেকনিক্যাল বিদ্যায় ডিগ্রিপ্রাপ্ত তারা বিদেশে ভালো বেতনের কাজ পায়। এদিক দিয়ে ভারত এগিয়ে। ভারতের যারা আরব দুনিয়া এবং মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরে কাজ করে তাদের কারিগরি বিদ্যায় ভালো ডিগ্রি থাকায় তারা ভালো বেতনে কাজ করে। ভারতের দক্ষ জনশক্তি ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিম ইউরোপ ও জাপানেও উচ্চ পারিশ্রমিকে কাজ করে। ভারতের টেকনিশিয়ানরা বাংলাদেশেও অতি উচ্চ পারিশ্রমিকে কাজ করে। বাংলাদেশ থেকে ভারতীয়রা অতি মোটা দাগে বিদেশি মুদ্রা অর্জন করে নিয়ে যায়।

ভারতকে দেখেও বাংলাদেশিরা শেখে না। বাংলাদেশের অদক্ষ শ্রমিক দেশে সামান্য উৎপাদনের কাজ করে। বিদেশে গিয়েও তাই করে। এই অদক্ষ শ্রমিকদের হাড়ভাঙা শ্রমের দ্বারা অর্থ যা দেশে আসে সেটাই বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রা ভান্ডারের প্রধান উৎস। বাংলাদেশ যদি দেশে দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে পারত, তাহলে বাংলাদেশের কলকারখানা তৈরির ও সেগুলোর পরিচালনায় বিদেশি টেকনিশিয়ান ও ব্যবস্থাপক নিয়োগের দরকার হতো না। বর্তমানে ভারত ও শ্রীলঙ্কা থেকে এনে তাদের পেছনে যে বিপুল অর্থ গচ্চা যাচ্ছে সে টাকাটা বাঁচানো যেত। দেশের যুবারাও কাজ পেত। তাদের উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে হতো না। ভারতীয় ফেনসিডিল ও বর্মী ইয়াবা গিলে মানসিক প্রশান্তির আশায় বিষাদগ্রস্ত হয়ে জীবন বরবাদ করতে হতো না।

বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক ও দুপুরের টিফিন সরবরাহ করায় দ্রুত একটি শিক্ষিত জনবল বাংলাদেশে গড়ে উঠছে। প্রতি ইউনিয়নে কারিগরি শিক্ষার জন্য বিদ্যালয় স্থাপন এখন সময়ের দাবি। দেশে যত হাই স্কুল আছে সেগুলোতে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এটা করতে কিছুটা সময় লাগবে, যেহেতু শিক্ষকের অভাব রয়েছে। কারিগরি শিক্ষক তৈরির জন্য প্রতিবিভাগে একটি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ স্থাপন করা যেতে পারে। ভারত থেকে শিক্ষক ও শিক্ষাসামগ্রী এনে কলেজগুলো চালু করা যেতে পারে। এভাবে আরম্ভ করলে বছর পাঁচেক পর দেশেই একটি শিক্ষকগোষ্ঠী গড়ে উঠবে। দেশে গড়ে উঠবে টেকনিক্যাল বিদ্যায় শিক্ষিত একটি যুবগোষ্ঠী, যারা দেশে ও বিদেশে ভালো বেতনের কাজ পাবে।

যন্ত্র সভ্যতা দ্রুত এগিয়ে চলেছে। যন্ত্রের সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত তাদের কেউ কেউ শ্রম লাঘব ও উৎপাদন বৃদ্ধির সহজতর উপায় বের করতে থাকেন সচেষ্ট। এর জন্য তারা বাড়তি কিছু করেন না। নিত্যদিনের রুটিন কাজ করতে করতে তাদের মাথায় এসব ভাবনা ঢুকে যায়। সেই ভাবনা থেকে তারা পেয়ে যায় উন্নততর পদ্ধতি। মনে হতে পারে, এ সব উন্নত যন্ত্র সভ্যতা দেশের বৈশিষ্ট্য। তা নয়। আমাদের দেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশেও পদ্ধতি উন্নয়নের ক্রিয়াকলাপ দেখতে পাওয়া যায়। মাঝে মাঝেই সংবাদপত্রের পাতায় এসব সাফল্যগাথা দেখতে পাওয়া যায়।

ব্যক্তির সাফল্য দেশের সাফল্য বলে বিবেচিত হয়। যেখানে টিমওয়ার্ক থাকে, সেখানে টিমের সাফল্য দেশের সকল মানুষের সাফল্য বলে হয় গণ্য। এটা চোখে পড়ে আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিযোগিতার সময়। টিম জিতলে সারা দেশ পড়ে উল্লাসে ফেটে। বাংলাদেশের মানুষকেও তাদের টিমের বিজয়ে উল্লাস করতে দেখা গেছে। বহুবার। নারীরা এ দেশে ছিল পিছিয়ে। বহু প্রতিকূলতার সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে বাংলাদেশের মহিলা টিমগুলো বনেদি টিমগুলোকে ঘোল খাইয়ে আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতেছে। তখন সারা বাংলাদেশে কী আনন্দ আকাশে-বাতাসে।

তবে সব আনন্দ মাটি হয়ে যায় ঢাকায় এলে। ঢাকায় গাড়িতে বিশ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে লেগে যায় পাঁচ ঘণ্টা। এর জন্য দায়ী করা হয় যানজটকে। ঢাকার রাস্তার যে ধারণ ক্ষমতা তাতে দু’লাখ গাড়ির ঠাঁই হতে পারে। ঢাকায় গাড়ির সংখ্যা কত কেউ জানে না। আন্দাজ করা হয় ১১ লাখ। এর সঙ্গে আছে প্যাডেল চালিত ট্রাইসাইকেল রিকশা। একই সড়কে দ্রুতগতির কার, ট্রাক, লরি, বাস, মিনিবাস, অটোরিকশা, স্কুটার প্রভৃতির সঙ্গে ধীরগতির সাইকেল রিকশা চলার সুযোগ থাকায় দেখা দেয় যানজট। পৃথিবীর কোনো রাজধানী শহরে এবং বড় শহরে এত ধরনের যান দেখা যায় না। সারা উন্নত বিশ্বে কাজের সময় হলো সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা। তারপর সব সুনসান। ঢাকায় কাজের নির্দিষ্ট সময় নেই। ভোর ৪টা থেকে রাত ২টা-আড়াইটা পর্যন্ত কাজ চলে। উন্নত দেশে কাজের যে আট ঘণ্টা সময়, তখন শহরের ভেতরের রাস্তায় কার চলতে বিশেষ দেখা যায় না। তখন চলে শুধু দোতলা বাস। যাদের কার আছে তারা কার রেখে সে সময় ওঠেন বাসে। ফলে উন্নত অর্থনীতির দেশের শহরে যানজট হয় না। ঢাকা ও দেশের বড় শহরে যানবাহন চলার জন্য উন্নত দেশের নিয়ম চালু হলে যানজট থাকবে না। তার জন্য দরকার হবে বাসে ওঠার মানসিকতার। সেটা হলো বুর্জোয়া মানসিকতা। আমাদের দেশে সামন্ত পৃষ্ঠপট থেকে উঠে আসা হঠাৎ বিত্তবান ঢের অর্থের মালিক বনলেও চেতনায় সে বুর্জোয়া নয়, সামন্ত। এরাই দেশের মালিক মোক্তার। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে হালে নিম্ন আয় থেকে উন্নয়নশীল স্তরে উতরেছে বলে তকমা পেলেও মন-মানসিকতায় সে রয়ে গেছে সামন্তযুগে। সন্তানের বিয়ের সময় ও বাপ-মায়ের কুলখানির সময় বিশাল অনর্থক ভোজের আয়োজন তার প্রমাণ।

সামন্ত মানসিকতার প্রমাণ স্পষ্টভাবে মেলে পুণ্যবানদের সমাধিস্থল ও ধর্মগুরুদের আস্তানায় ধর্ণা দেওয়ায়। এসব কাজ ধর্মে যে কেবল নিষিদ্ধ তা নয়, পাপেরও। অথচ এগুলো পুণ্যকর্ম ভেবে তার চর্চা হয় অবাধে। মজার ব্যাপার হলো, এ কাজ ভক্তি সহকারে করে স্বল্পবিত্ত ও অধিক বিত্তের লোকেরা। এদের বাধা দেবে কে? এদের বোঝালেও বুঝবে না। এদের মধ্যে পরকালভীতি তীব্রভাবে বাজে। এদের বুঝ হলো ইহকালেরটা দেখে। এরা দেখে ইহকালে প্রভাবশালীকে ধরলে কাজ উদ্ধার হয়। দেখে তাকে টাকা দিয়ে মূল্যবান উপহারাদি দিয়ে খুশি করলে তিনি তার অনেক মুশকিলই আসান করে দেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে ঠেলে দেয় সেসব ব্যক্তির অনুগ্রহ পেতে যারা আধ্যাত্মিক সাধনায় নাম করেছেন। তাদের আস্তানায় চাল, ঘি, গরু, খাসী, মোরগ-মুরগি ইত্যাদি উপাচার নিয়ে ভক্তের ভিড় লেগে থাকে দিনরাত। এটা গুরু ও ভক্ত দু’পক্ষই উপভোগ করে।

সামন্ত মানসিকতার লোকের কাছে ইহকালের চেয়ে পরকাল অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তারা ভাবে এ জগতে আজ আছি কাল নেই। পরজগৎ হলো তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পরজীবনের জন্য প্রস্তুতি ভালো হওয়া দরকার। জীবনে যত খায়েশ থাকে মধ্যবয়সের শেষে তার প্রায় সবটাই মিটে যায়। তখন খায়েশ প্রবল হয়ে ওঠে পরজীবন সুখী ও মসৃণ করার ভাবনায়। এতে দোষের কিছু নেই। তবে মানুষ যা করে তা ধর্ম নির্ধারিত পথে নয়। মানুষ র্যাশনাল, তবে এ ক্ষেত্রে নয়। তারা পরকাল নিষ্কণ্টক করতে এমন সব কাণ্ড করে, যা সম্পূর্ণ ধর্মবিরুদ্ধ।

মনের চাওয়াই তো খায়েশ। একেক বয়সের খায়েশ একেক রকম। বালকের খায়েশ নাটাই ধরে খোলা মাঠে ঘুড়ি ওড়ানো। কিশোরের খায়েশ দৌড়ঝাঁপে অংশ নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ। যুবকের খায়েশ তার মনের মতো যুবতীর সহানুভূতি পাওয়া। প্রাপ্ত বয়স্কের খায়েশ ভালো উপার্জনের একটা পথ পাওয়া। ছেলেদের খায়েশ মেটানোটা এতকাল সকলের চোখে পড়ত। লেখাপড়ার বিস্তার ঘটায় মেয়েদের খায়েশ মেটানোর কথা এখন প্রকাশ পাচ্ছে। তাদের খায়েশ হলো ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাদের হারিয়ে দেওয়া। এ কাজে তারা দারুণভাবে সফল। তারা সব জায়গা থেকে ছেলেদের দিচ্ছে হটিয়ে। মেয়েরা একসময় ছিল গৃহবন্দি এবং পুরুষের ইচ্ছার দাস। মেয়েদের এখন খায়েশ যদি হয় পুরুষকে গৃহবন্দি ও তাকে তার ইচ্ছার দাস করা, তাহলে তাদের দোষ দেওয়া যাবে না। পরিবর্তনশীল দুনিয়ায় খায়েশ পূরণের বিষয়টি সময়ের দাবি অনুযায়ী মিটবে, সেটাই স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads