• শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
 কোন পথে পাকিস্তানের রাজনীতি

পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন একসময়ের ক্রিকেট তারকা ইমরান খান

ছবি: সংগৃহীত

মতামত

কোন পথে পাকিস্তানের রাজনীতি

  • প্রকাশিত ৩১ জুলাই ২০১৮

পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন একসময়ের ক্রিকেট তারকা ইমরান খান। বড় কোনো অঘটন না ঘটলে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ১৪ আগস্ট তিনি শপথ গ্রহণ করবেন। পার্লামেন্টে তার পাকিস্তান তেহরিক-এ-ইনসাফ দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তিনি একটি কোয়ালিশন সরকারের প্রধান হবেন। জনাব খান পূর্বাপর বলে আসছেন যে, তিনি একটি নতুন পাকিস্তান বিনির্মাণ করবেন। তিনি মদিনার মতো একটি রাষ্ট্র বানাতে চান পাকিস্তানকে। একই সঙ্গে ইমরান খান বলেছেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যে পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখতেন, সেই পাকিস্তান নির্মাণ করতে চান তিনি। মি. জিন্নাহ উপমহাদেশের মুসলমানদের একটি স্বতন্ত্র জাতি বিবেচনা করে তাদের জন্য পৃথক আবাসভূমির কথা বললেও কখনো মদিনার মতো রাষ্ট্র গঠনের কথা বলেছেন, ইতিহাস এমন কোনো সাক্ষ্য দেয় না।

নির্বাচনের ফল যখন বেরুতে শুরু করে তখনই ইমরান খান জাতির উদ্দেশে ভাষণ তৈরি করেন, যা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। ওই ভাষণে তিনি তার নতুন পাকিস্তানের বিদেশনীতি কী হবে তারও একটা রূপরেখা দেন। ভারত, চীন ও আমেরিকার সঙ্গে মিত্রতা বজায় রাখার যে সূত্রটি তিনি দেন, তার মধ্যে তেমন কোনো চমক নেই। নতুন মোড়কে পুরনো জিনিস। তবে আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি যে কথা বলেন, তা ইসলামাবাদের অন্য মিত্রদের জন্য কিছুটা উদ্বেগের কারণ বৈকি। কাবুলের বর্তমান সরকারের সঙ্গে ইসলামাবাদের ভালো সম্পর্ক থাকলে আমেরিকার খুশিই হওয়ার কথা, যদিও ভারতের জন্য বিষয়টি খানিকটা হলেও অস্বস্তিকর। কারণ, কাবুলের সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক খুবই ভালো। কাবুল সরকারের ওপর দিল্লির যথেষ্ট প্রভাবও রয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে আফগান সরকারের সম্পর্ক যদি আরো ভালো হয়, তাহলে দিল্লির প্রভাব হ্রাস পেতে পারে। এটি হচ্ছে অতি সরল একটি হিসাব। কিন্তু ইমরান যে কথাটি বলেছেন, সেটি মোটেও সরল নয়। আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কথা বলতে গিয়ে তিনি পাক-আফগান সীমান্ত তুলে দেওয়ার যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন, তাতে সন্ত্রাসবিরোধী চলমান বৈশ্বিক নীতির বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন রয়েছে। আমেরিকা ও ভারত উভয়ের কাছে ইসলামাবাদের নতুন সরকারের এই মনোভাব প্রীতিকর বোধ না হওয়াই স্বাভাবিক। পররাষ্ট্রনৈতিক এই চিন্তাসূত্র থেকে ইমরানের জন্য বেরিয়ে আসাও সহজ নয়। কেননা, খানের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনের শক্তিকেন্দ্রগুলো অনুরূপ চিন্তাসূত্রের পরিপোষক। এরা পাকিস্তানকে একটি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রশক্তি হিসেবে তৈরি করতে চায়, যাতে সবসময়েই তাদের কর্তৃত্ব বজায় থাকে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ— যেকোনো প্রকারে হোক। দেশের ভেতরে সব অবস্থায় তারা নির্ধারক শক্তি হিসেবে বিরাজমান থাকতে চায়। এই চাওয়াকে বাস্তবরূপ দেওয়ার জন্য নেপথ্যের এই শক্তি পাকিস্তানের সৃষ্টিলগ্ন থেকেই সক্রিয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্বাধীনতার এক বছরের মাথায় মারা যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই শক্তি তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তারের সহজ পথ পেয়ে যায়। পাকিস্তানের সামন্তশ্রেণি, পাঞ্জাব ও বেলুচিস্তানের সৈন্য, নব্য ধনিক সম্প্রদায় এবং পাকিস্তানের মধ্যবিত্ত শ্রেণির রক্ষণশীলতাকে তারা সাফল্যের সঙ্গে কাজে লাগিয়ে আসছে পূর্বাপর। পবিত্র ইসলামের মূল শিক্ষাকে পাশ কাটিয়ে এরা সবময়েই ধর্মের ধ্বজা উড়িয়ে একটি ধর্মাশ্রিত মৌলবাদী জাত্যাভিমান সৃষ্টি করে, যা দেশের মানুষকে একটা পিঞ্জিরার মধ্যে আটকে রেখেছে। এ থেকে বেরুনো পাকিস্তানের পক্ষে কঠিন। এই জাত্যাভিমানের পিঞ্জিরার খোপ যাতে কখনই আলগা হয়ে না যায়, তার জন্য পাকিস্তানের এমন একটি জ্ঞাতিশত্রু দরকার, যার কোপানল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সেই নেপথ্যের শক্তির আশ্রয় ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প থাকবে না। হাইপার টেনশনের বটিকার মতো সেটি হবে আমৃত্যু সেব্য। সেই জ্ঞাতি শত্রুর নাম ভারতীয় জুজু।

পাকিস্তানের নেপথ্যের সেই অনুপেক্ষণীয় শক্তিটি হচ্ছে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সমান বয়সী এই প্রবলপ্রতাপ গোয়েন্দা সংস্থা সম্পর্কে বলা হয় যে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। পাশ্চাত্যের কোনো কোনো সামরিক পর্যবেক্ষক আইএসআইকে এক নম্বরে রাখার পক্ষপাতী। বস্তুত একটি গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে মুঠোর মধ্যে নিয়ে কোনো গোয়েন্দা সংস্থার সর্বক্ষেত্রে সক্রিয় থাকার দৃষ্টান্ত খুব কমই রয়েছে বলে মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষক। এই শক্তি পাকিস্তানে কখনই গণতন্ত্রের ভিত শক্ত হতে দেয়নি। এরা যখন যাকে ইচ্ছা রাজনীতির সামনের কাতারে তুলে এনেছে, ক্ষমতায় বসিয়েছে। নিজের মতো করে কিছুটা বাড়তেও দিয়েছে। কিন্তু বেশি বাড়বার চেষ্টা করলে কলার খোসার মতো ছুড়েও ফেলে দিয়েছে। সামরিক কি বেসামরিক, যেখান থেকেই নেতা তুলে আনা হোক না কেন, নিজের মতো করে তারা বেশিদূর উড়তে পারেননি। সময়মতো সুতো কেটে দেওয়া হয়েছে। কারো কারো পরিণতি হয়েছে খুবই খারাপ। এ ক্ষেত্রে একটি জুতসই দৃষ্টান্ত হতে পারেন পাকিস্তানের শিক্ষিত ও প্রগতিমনস্ক সামন্ত, অতিশয় চালাক রাজনীতিক জুলফিকার আলী ভুট্টো। সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানে (বর্তমান পাকিস্তানে) সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর খুঁটির জোরে তার আস্ফাালন সকল সীমা-পরিসীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সামগ্রিকভাবে পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তরের পথে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন প্রধান বাধা। তিনি জাতীয় সংসদ অধিবেশন ডাকা হলে কসাইখানায় পরিণত হবে বলে হুমকি দিয়েছিলেন। এক পাকিস্তানে দুই প্রধানমন্ত্রীর অসম্ভব এক তত্ত্ব হাজির করতেও তিনি কুণ্ঠাবোধ করেননি। আলোচনার নামে প্রহসনের পর সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করেন এবং সেটা অব্যাহত ছিল ৯ মাস। পাকিস্তানে বসে প্রগতিবাদী ভুট্টো তখন ডুগডুগি বাজিয়েছেন। পাকবাহিনীর চূড়ান্ত পতনের পর ইয়াহিয়া ও তার সামরিক দোসরদের ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করলেন। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে জেড এ ভুট্টো এই বার্তা দিতে চাইলেন যে, তিনি বামপন্থি ও প্রগতিবাদী। কিন্তু ১৯৭৭ সালে এসে তিনি মুখোমুখি হলেন তাদের, যারা ছিল তার পশ্চাতে, যাদের হাতে ছিল তার ক্ষমতার নাটাই। আবির্ভাব হলো আরেক হতভাগ্য সামরিকজান্তা জিয়াউল হকের। ভুট্টোকে ঝোলানো হলো ফাঁসির দড়িতে। জিয়াউল হকও উড়লেন কিছুদূর। তারপর প্লেনক্রাশে অপমৃত্যু। এলেন সুশিক্ষিতা ভুট্টো তনয়া বেনজীর ভুট্টো। একসময় তাকেও মরতে হলো। স্বামী জারদারি রাষ্ট্রক্ষমতা পেলেন। পরিহাসের শিকার হলেন তিনিও। তার আগে একবার ক্ষমতায় আনা হয় নওয়াজ শরীফকে। কারগিল সঙ্কটের অজুহাতে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ নওয়াজকে হটিয়ে দিলেন। পারভেজ তার কারিশমা খুব দেখাতে চাইলেন। বই লিখলেন। পাকিস্তানের ইতিহাসে এক মহান রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার জন্য আঁকুপাঁকু করতে লাগলেন। কিন্তু তার আগেই ফুৎকারে পারভেজের বাতি নিভিয়ে দেওয়া হলো। আবার নওয়াজ শরীফ। আদালতের নির্দেশে আবারো পতন। নির্বাসন শেষে এখন তিনি পাকিস্তানের জেলখানায়। মাঝখানে, ফাঁকেফুকে পাকিস্তানে কত নেতা এলেন আর গেলেন, কে রাখে তার হিসাব!

এতদিন পর ক্ষমতার পাদপীঠে এলেন ইমরান খান। ক্রিকেটের মাঠ থেকে রাজনীতিতে। রাজনীতির মাঠে নানান ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শেষমেশ নির্বাচিত হয়ে তিনি উপমহাদেশের দুই পারমাণবিক শক্তির একটি পাকিস্তানের মসনদে আসীন হতে যাচ্ছেন শিগগির। তার দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দেশে ও বিদেশে প্রশ্ন উঠেছে। বলা হচ্ছে, ইলেকশন স্বচ্ছ হয়নি। সেনাবাহিনী তাকে জিতিয়ে দিয়েছে। আমেরিকা, চীন ও ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কথা ইমরান বললেও মিত্ররা সন্দিহান। তারা ইমরানের জয়কে ভালো চোখে দেখছে না। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইলেকশনে সেনা হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছে। ভারতেরও একই অভিযোগ। তা সত্ত্বেও প্রতিবেশী ও আজন্ম প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত এবং পাকিস্তানের পরীক্ষিত মিত্র আমেরিকা ইমরানকে স্বাগত জানিয়েছে। এটা হচ্ছে কূটনৈতিক শিষ্টাচার। এর মধ্য দিয়ে সম্পর্কের মাত্রা নির্ণয় করা যায় না। চীনও ইমরানের ব্যাপারে উচ্ছ্বসিত নয়। পাক-আফগান সীমান্ত খুলে দেওয়ার যে ইচ্ছা ইমরান ব্যক্ত করেছেন তাতে তালেবান এবং অনুরূপ মনোভাবাপন্নরা খুশি হলেও কাবুল সরকারের বিষয়টিকে ভালোভাবে নেওয়ার কথা নয়। তালেবানরা প্রতিবেশী পাকিস্তানের ভূমি ব্যবহার করার আরো বেশি সুযোগ পাক, কাবুল এমনটি চাইতে পারে না। কিন্তু আইএসআই এবং ইমরানের সমর্থকদের বৃহত্তর অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তেমনটিই চায় বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। ইমরান নিজে সন্ত্রাসবাদের পক্ষপাতী না হলেও তিনি পাকিস্তানের মাটি ও আকাশ ব্যবহার করে আমেরিকার সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের স্পষ্টতই বিপক্ষে। তার এই অবস্থান পাকিস্তানে বেশ পপুলার বলেও ধারণা করা হয়। এমতাবস্থায় এর থেকে সরে আসা ইমরানের পক্ষে মোটেও সহজ নয়।

ক্রিকেটার ইমরান খানের ইলেকশন জয়ের খবরে তার সময়ের আরেক ক্রিকেট তারকা কপিল দেব উচ্ছ্বসিত। তিনি রাজনীতি নিয়ে ভাবেন না। তার মতোই এক ক্রিকেট তারকা একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বলে তিনি বোধগম্য কারণেই আপ্লুত। বিবৃতি দিয়ে তা তিনি প্রকাশও করেছেন। কিন্তু ক্রিকেট তারকা আজহার উদ্দিন খান কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় এক লেখায় বিজয়ী ইমরানকে জানিয়েছেন সতর্ক অভিনন্দন। তার সেই লেখায় আজহার উদ্দিন বলেন, ক্রিকেটের মাঠ এবং রাজনীতির ময়দান এক জিনিস নয়। ক্রিকেটের ক্যাপ্টেন ইমরান খানকে দেখেছি মাঠের মধ্যে স্বাধীনভাবে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে। এখন দেখা যাবে সরকার পরিচালনায় তিনি কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। এই মন্তব্যের মাধ্যমে আজাহার উদ্দিন কী বোঝাতে চেয়েছেন? তিনি কি পাকিস্তানি রাজনীতির সেই নেপথ্যচারী শক্তির দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যারা ইমরানের দলকে জিতিয়ে এনেছে বলে অভিযোগ উঠেছে! পাকিস্তানে কোথাকার জল কোথায় গড়াবে, সে কেবল জানে ভবিষ্যৎ। ইমরান খান গুডবয় প্রধানমন্ত্রী হয়ে কত দিন থাকতে পারবেন, এখন সেটাই প্রশ্ন। ইমরানের ক্ষেত্রে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি কখন ঘটবে অথবা আদৌ ঘটবে কি না, সে-ই এখন দেখার বিষয়।

লেখক : ফাইজুস সালেহীন

কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক 

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads