• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
কেমনে সকাল হবে

বাসের চাপায় হাত হারানো শিক্ষার্থী রাজীব

সংরক্ষিত ছবি

মতামত

কেমনে সকাল হবে

  • আবদুল হাই রঞ্জু
  • প্রকাশিত ০৭ আগস্ট ২০১৮

‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে?’ ছোটবেলায় এই কবিতা পড়তে পড়তে বড় হয়েছি। সে অনেক দিন আগের কথা। দেখতে দেখতে কৈশোর, তারুণ্য পেরিয়ে প্রৌঢ় অবস্থায় এসেছি। ক’দিন ধরে হাজার হাজার কিশোর-তরুণ প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগানে স্লোগানে গেয়ে যাচ্ছে— ‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে?’ ওরা বুঝতে পেরেছে রাজীব, করিম দিয়া, পায়েলের মতো সম্ভাবনাময় তরুণদের বেঁচে থাকতে হলে ঘুম ভেঙে সকলকেই জেগে উঠতে হবে। তা না হলে স্বস্তির সকালের দেখা হয়ত কোনো দিনও মিলবে না।

মাত্র ক’মাস আগের কথা, শিক্ষার্থী রাজীব বাসের চাপায় হাত হারিয়ে হাসপাতালের বেডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরলোকে যাত্রা করেন। এরপর কলেজছাত্র পায়েল বাসে উঠতে গিয়ে আহত হলে নির্দয়ভাবে বাসের হেলপার সহযোগিতার বদলে মুখ থেঁতলে ওকে পানিতে ফেলে দিল। কী এক নিদারুণ নিষ্ঠুরতা! আমাদের দেশে বাসের চালক, হেলপার, সুপারভাইজরদের নেতা যখন ক্ষমতাধর মন্ত্রী, তখন হেলায় অবহেলায়, দু’চারটি শিক্ষার্থীর অকাল মৃত্যু হলেই বা কী আসে যায়! এভাবেই প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্তে বাস-ট্রাক দুর্ঘটনায় কতজনকেই না মরতে হচ্ছে অবলীলায়। এত মৃত্যুর পরও বাসের মালিক, শ্রমিক সংগঠনের নেতারা সাহায্যের বদলে বিদ্রূপ করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই ওরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠছে। রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কে ওরা পাল্লা দিয়ে কে কাকে টপকিয়ে সামনে গিয়ে যাত্রী তুলবে, চলে সেই প্রতিযোগিতা। যার শিকার হয়ে জীবন দিল শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম এবং একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম মিম। একজন প্রশিক্ষিত গাড়িচালক কখনই যাত্রী ওঠানোর জন্য এভাবে বাস চালাতে পারে না। এসব চালক অদক্ষ, অপ্রশিক্ষিত কিংবা হেলপার। যাদের হাতে মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘায়িতই হবে। তবুও প্রশাসন, মালিকপক্ষ নীরব, শ্রমিকপক্ষ নির্বিকার। উল্টো ওদের নেতা (যিনি মন্ত্রী) বলেছিলেন, ‘একজন চালকের লাইসেন্স পেতে গরু-ছাগল চিনলেই হলো।’ পরিণামে প্রতিবছর হাজার হাজার যাত্রীকে অকাতরে জীবন দিতে হচ্ছে। আর হাজার হাজার যাত্রীকে আহত হয়ে চিকিৎসা নিতে হয়। অনেকেই চির জীবনের জন্য পঙ্গুত্বকে বরণ করে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের বোঝা হয়েই শুধু বেঁচে আছেন, থাকবেন। এর কি কোনো প্রতিকার নেই? এমনি প্রশ্ন দেশের লাখো-কোটি জনতার। কিন্তু জবাব নেই। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন রুটে বাস মালিক, শ্রমিকগণ মিলিতভাবে নানা অজুহাতে বাস চলাচল বন্ধ করে দিয়েছেন। অর্থাৎ মানুষকে জিম্মি করে হলেও ওরা যাত্রী হত্যার (?) নিশ্চয়তা আদায় করতে চায়।

নিহত ছাত্রী দিয়া খানম মিমের বাবার নাম জাহাঙ্গীর আলম। তিনি পেশায় একজন বাসচালক। তিনি ঢাকা রাজশাহী চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে একতা পরিবহনের বাস চালান টানা ২৭ বছর যাবৎ। বাস চালিয়ে সংসার চালান। স্বপ্ন ছিল মেয়ে মিমকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করে তুলবেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, বাসচালক জাহাঙ্গীর আলমের সে স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। তিনি বলেন, ঢাকা শহরে যারা বাস চালায় তারা প্রকৃত চালক নয়। হেলপাররাই বাসচালক। ফলে দুর্ঘটনার নামে মানুষ খুন করা হচ্ছে। আমার মেয়েকেও খুন করা হয়েছে। আমি খুনিদের বিচার চাই। আর যে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে আমার বুকের ধনকে আমি হারিয়েছি, সেই বাস আর কোনো দিন চালামু না বলে তিনি বিলাপ করতে থাকেন। একজন বাবার কাঁধে যখন সন্তানের লাশ ওঠে, তখন সে বাবাই শুধু বুঝতে পারেন, সন্তান হারানোর ব্যথা কত নির্মম।

এ দেশের ছাত্র সমাজের আন্দোলন কোনো দিন বৃথা যায়নি। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন বিজয়ের চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে গেছে এ দেশের ছাত্রসমাজ। আজ দেশের ছাত্রসমাজ আবার জেগে উঠেছে নিরাপদ সড়কের দাবিতে। প্রতিটি মানুষই স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চায়। সবাই নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচতে চায়। মাত্র মাস দুয়েক আগের কথা। আমার রাজনৈতিক জীবনের অকৃত্রিম বন্ধু কমরেড জাহেদুল হক মিলু। বয়সে আমার থেকে দু’বছরের বড়। তিনি নাবিল পরিবহনের যাত্রী হয়ে ঢাকা থেকে কুড়িগ্রাম আসছিলেন। বাসটি কুড়িগ্রাম পৌঁছলে সুপারভাইজর তাকে ঘুম থেকে ডেকে না দেওয়ায় বাসটি উলিপুর পর্যন্ত চলে যায়। ঘুম ভাঙলে সেখানে নেমে সিএনজি ট্যাক্সিতে করে উলিপুর থেকে কুড়িগ্রাম আসার পথে দুর্ঘটনায় পতিত হয়ে গুরুতরভাবে আহত হন। প্রায় এক মাস চিকিৎসাধীন থাকাকালীন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এভাবে সম্ভাবনাময় কত জীবন যে অকালে ঝরে যাচ্ছে, তার খবর কে রাখে?

এর প্রতিকারে বুকভরা আশা নিয়ে যখন দেশের ছাত্রসমাজ রাজপথে নেতৃত্ব শূন্য আন্দোলন চালাচ্ছে, যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, যোগাযোগমন্ত্রী, শ্রমিক নেতা নৌমন্ত্রী ক্ষমা চেয়ে প্রতিকারের অঙ্গীকার করছেন; তখন মনে হচ্ছে, হয়ত এ দফায় প্রতিকারে কিছু একটা হতেও পারে। এ জন্যই সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ‘আমরা যদি না জাগি মা, কেমনে সকাল হবে’ আহ্বানে দলমত নির্বিশেষে সবাই জেগে উঠুক- এটাই এখন জাতির প্রত্যাশা।

 

লেখক : সমাজকর্মী

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads