• রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
ক্রিকেটীয় ইমরানের রাজনৈতিক হৃদয়

ক্রিকেট জগতে লেডি কিলার হিসেবে একক আধিপত্য গড়েছিলেন ইমরান খান

ছবি : ইন্টারনেট

মতামত

ক্রিকেটীয় ইমরানের রাজনৈতিক হৃদয়

  • প্রকাশিত ০৯ আগস্ট ২০১৮

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ রাষ্ট্রের তকমা পাওয়া পাকিস্তানের সম্প্রতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। তবে সাবেক সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফের পর এবার ফের নির্বাচনকে ঘিরে সেনা হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনে দেশে এবং দেশের বাইরে লায়নখ্যাত সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ সরকার গঠনের পথে। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী ১৪ আগস্ট দলটি ইমরান খানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করবে। এ নিয়ে দেশে এবং বিদেশে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। এর কারণ হলো অতীতের সরকারগুলোর অমসৃণ পথ। প্রশ্ন উঠেছে- ইমরানের এই মধুচন্দ্রিমা ঠিক কতদিন থাকবে? যদিও ইমরানের ব্যক্তিত্ব আর দূরদর্শী ভাবনাকে কাছের দূরের সবাই স্বীকার করে। সে আঙ্গিকে তাকে বিচার করতে হবে ক্রিকেটীয় ভাষায়- এমনটাই বিশ্বগণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

পুরো নির্বাচনে সেনা হস্তক্ষেপের অভিযোগ ছিল বিস্তর। যদিও সেনাবাহিনী অভিযোগকে উড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি তার এই জয়ের পেছনে প্রযুক্তিই নেপথ্য ভূমিকা রেখেছিল বলে এক গবেষণায় বলা হয়েছে। এর পরও প্রশ্ন থেকে যায় ২৫ জুলাই অপরাপর দলগুলো এই প্রযুক্তির সুবিধা না পেলেও ইমরান খান এই সুবিধা কাজে লাগিয়েছিলেন। সেটা সেনা সহায়তায় পেয়েছিলেন কি না এখনো তা স্পষ্ট নয়, তবে সেনাদের ব্যাপারে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অভিযোগ করলেও কোনো দলই সরাসরি সেনা শব্দ উচ্চারণ করেনি। তাই বলা যায়, বড় ধরনের গোলযোগ না হলে ইমরান খানই হতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। আশির দশকে তাকে একবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দিলে তিনি সবিনয়ে ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন- ‘যেদিন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারব সেদিন ভাবব রাজনীতিতে আসব কি না?’ তিনি সেদিন আত্মবিশ্বাসী কথা যে নিছক মুখ ফসকে বলেননি তা প্রমাণিত। নিজেকে নিয়ে প্রচণ্ডভাবে আত্মবিশ্বাসী ইমরান সেদিন হূদয় দিয়ে পাকিস্তানের মানুষের মাঝে ‘রাজনৈতিক ইমরানের’ অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছিলেন। যে স্বপ্ন পূরণ হতে বাকি আর মাত্র কয়েকটা দিন।

নির্বাচনে জয়লাভ করেই ইমরান ঘোষণা দিয়েছেন কৃচ্ছ্রসাধনের। মন্ত্রিসভা ৩৩ থেকে কমিয়ে অনধিক ২০-এর মধ্যে নিয়ে আসার। এমনকি প্রেসিডেন্ট হিসেবে একজন নারীর নামও শোনা যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে নারী-পুরুষ সমতার প্রশ্নে হয়তো পাকিস্তানে নতুন প্রভাত উঁকি দিচ্ছে। পাশাপাশি ইমরান ঘোষণা দিয়েছেন রাষ্ট্রের খরচ বাঁচাতে সাদামাটা ছোট একটি বাড়িতে থাকবেন। সে মোতাবেক নির্দেশনাও এসেছে। এর ফলে বার্ষিক সরকারের ১৮৫ কোটি রুপি ব্যয় সাশ্রয় হবে।

এমন সিদ্ধান্ত জনগণকে ইতিবাচক এই বার্তা দিচ্ছে যে, দেশের অর্থ হেসেখেলে খরচ নয়, মানুষের কল্যাণে ব্যয় হওয়া উচিত। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে পাকিস্তান যেখানে ভঙ্গুর অবস্থায় সেখানে তার এমন ঘোষণা দুর্নীতিগ্রস্ত পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মকে অনুগত করার প্রশ্নে আফিমের মতো কাজ করবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।

ইমরানের এমন সিদ্ধান্তগুলো সহজাত সেটা বুঝতে একটু পেছনে ফিরতে হবে। অতীতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ভারতকে তাদের দেশে হারাতে চাই।’ আরেকটি সাক্ষাৎকারে হুঙ্কার দিয়েছিলেন- ‘আমি ভারতকে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে হারাতে চাইব।’ তিনি সেটা করে দেখিয়েছিলেন। ভারতকে তাদের মাটিতে প্রথম তার নেতৃত্বে ১-০তে টেস্ট জয় এবং ৫-১-এ ওয়ানডে জয় করে পাকিস্তান। ওই সফরে টেস্টে তিনি চল্লিশের বেশি উইকেট লাভ করেন। সেখান তার রিভার্স সুইং নতুন করে তাকে আলোচনায় আনে। ভারতের এমন হারের পর হোটেল করিডোরে রবি শাস্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন মেহেদী হাসানের গজল শোনার পরামর্শ দিয়ে। নিজে চলে গেলেন সিক্রেট রুমে, যেখানে কড়া সিকিউরিটি দণ্ডায়মান, দরজায় লেখা ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব’। ভারতীয় গণমাধ্যম জুড়ে তখন ইমরান খানকে জড়িয়ে সিক্রেট রুমে কখনো জিনাত আমান, মুনমুন, রেখা, পারভিন ববির নাম পাঠকের কাছে ছিল হটকেক (বিশেষ করে জিনাত-মুনমুন পাকিস্তানি বধূ হওয়ার পথে এগিয়েছিলেনও, কিন্তু দেশ থেকে তীব্র প্রতিবাদের মুখে ইমরান সেখান থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। অবশ্য এর পেছনে ভারত-বিদ্বেষী ইস্যুটাই কাজে লাগিয়েছিল পাকিস্তান)। ওপাশে বলিপাড়ার অন্যদের চাপাচাপি থেকে বাঁচতে তার সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বাধ্য হয়েছিলেন দরজায় ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব’ ট্যাগ ঝোলাতে। তার আপাদমস্তক সম্মোহন-জাগানিয়া ব্যক্তিত্ব, ক্ষিপ্র দৃষ্টি আর নারীর কোমল দেহকে নিমিষেই দুই বাহুতে পিষে ফেলার অদম্য ক্ষমতার কারণে বলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা ও প্রযোজক দেবানন্দ প্রস্তাব করেছিলেন ইমরানকে নায়ক হওয়ার। জবাবে বলেছিলেন- ‘আমি ৩৬ বছরের যুবক আর নায়িকা হবে ১৬ বছরের! কীভাবে কী?’

তার সময়ে ক্রিকেট জগতে লেডি কিলার হিসেবে তিনি যেমন একক আধিপত্য গড়েছিলেন, তেমনি ক্রিকেটের বাইরেও তার এই সম্মোহনী ক্ষমতায় কুপোকাত হয়েছিলেন রাজনীতি অঙ্গনের অনেক রথী-মহারথী- এই প্রভাব দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও বিস্তার করেছিলেন ইমরান। দেশে যেমন বেনজির ভুট্টোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, তেমনি ইউরোপের অনেক দেশেও অনেক মহারথী হয়েছিলেন তার কাছের মানুষ। ব্যক্তি ইমরানের সেই প্রভাব তাকে রাজনীতির পথে আসতে সহায়তা করেছে। এর আগে অবশ্য মায়ের নামে ক্যানসার হাসপাতালের মতো দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে সাধারণ পাকিস্তানিদের হূদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। আরেকটি কারণ হতে পারে তার প্রচণ্ড জাতীয়তাবাদী চেতনা। পরবর্তীকালে নিজের থেকে ২২ বছরের ছোট ইংল্যান্ডের ধনকুবের কন্যা জেমিমা গোল্ডস্মিথকে বিয়ে করে সেখানকার প্রভাবশালী মহলে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন ইমরান। বিয়ের দুই বছরের মাথায় ১৯৯৭ সালে রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নাম লেখান সাবেক এই কাপ্তান। যথারীতি মাঠের মতোই রাজনীতির ময়দানে দ্রুত নিজের অবস্থান ও লক্ষ্য স্থির করেন।

প্রচণ্ড জাতীয়তাবাদী চেতনা, বহির্বিশ্বে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি গণতান্ত্রিক উপায়ে এগিয়ে নেওয়ার উপলব্ধি, বিজয়ের পর পরই ভারতের উদ্দেশ্যে তার বন্ধুসুলভ অথচ মেজাজি বার্তা পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের আভাস স্পষ্ট। কারণ, তিনি ১৯৭১ সালের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে শোষণের বলি হতে দেখেছেন। স্বভাবতই তিনি অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দ্বিতীয়বার এমন ঘটনার মুখোমুখি হতে চাইবেন না, তেমনি প্রতিবেশীর সঙ্গেও মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন। তাই বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা থাকবে অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য পাকিস্তানের ভাবী শাসক ইমরানের অবস্থান কী হয় সেটা দেখার? এক্ষেত্রে শুধু বাংলাদেশ নয়, শক্তিধর প্রতিবেশী ভারতও তার পরীক্ষা নেবে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পাশে পাকিস্তানের অবস্থান সুদৃঢ় করার পাশাপাশি কাশ্মির ইস্যু হবে ইমরান খানের শাসনের মূল নির্ণায়ক। পথটি যে মসৃণ নয়, ইমরান খানও জানেন। তবে ঘটনা যাই ঘটুক, যত দিন, যত ঘণ্টা অমসৃণ ওই ক্ষমতার সিংহাসনে থাকুন, ইমরান খানকে ক্রিকেটীয় ভাষায় সবকিছু উপলব্ধি করতে হবে। অর্ধেক আলো শক্তিধর ভারতের দিকে থাকলেও ইমরান ব্যক্তিত্বের গুণে কিছুটা হলেও আলো নিজে কাড়বেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

আহমেদ তেপান্তর

গণমাধ্যমকর্মী

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads