• শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
সাংবাদিক-ঐক্য সময়ের দাবি 

সাংবাদিক-ঐক্য

প্রতীকী ছবি

মতামত

সাংবাদিক-ঐক্য সময়ের দাবি 

  • শামীম শিকদার
  • প্রকাশিত ১১ আগস্ট ২০১৮

বিভিন্ন ঘটনাবলি, বিষয়, ধারণাসহ মানুষ সম্পর্কিত প্রতিবেদন তৈরি ও পরিবেশন একজন সাংবাদিকের প্রধান কাজ। সাংবাদিক হচ্ছে জাতির বিবেক, কিন্তু সেই সাংবাদিকদের আজ লাঞ্ছিত হতে হয়। নির্যাতনের শিকার হতে হয় পথে পথে।

সভ্য সমাজব্যবস্থায় সাংবাদিকতা অতটা ঝুঁকিপূর্ণ নয়; কিন্তু আমাদের দেশের গোটা সমাজব্যবস্থা আজ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই বিভক্তি কোনো নীতিনৈতিকতা বা আদর্শের ভিত্তিতে নয়, এটা মূলত অন্ধ রাজনৈতিক পক্ষাবলম্বন। পেশাজীবীরাও আজ বিভক্ত। সাংবাদিকতাও এই বিভক্তির হাত থেকে বাঁচতে পারেনি, যা দুর্ভাগ্যজনক। পেশায় অনৈক্য, সাংবাদিকতা আর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ তথা রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেলা হচ্ছে। ঘটছে সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা। সাংবাদিকরাও দলীয় পরিচয়ে পরিচিত হন! কেউ আওয়ামীপন্থি, কেউ বিএনপিপন্থি, কেউ জামায়াতপন্থি, কেউ জাতীয় পার্টিপন্থি আবার কেউবা কমিউনিস্টপন্থি সাংবাদিক। এই দলীয় সাংবাদিকতাও সাংবাদিকদের পেশা ও জীবনের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাই বলে আমি এটা বলছি না যে, সবাই দলীয় সাংবাদিকতা করছেন, ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। সত্য কখনো বিপজ্জনক হতে পারে না। আমি এই দর্শনেই বিশ্বাস করি। আমি আরো মনে করি, সত্যান্বেষণই সাংবাদিকতার মহান ব্রত। প্রত্যেক সাংবাদিকই মানবাধিকার কর্মী- এটাও আমি বিশ্বাস করি। একজন মানবাধিকার কর্মী মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার তথ্যানুসন্ধান করে রিপোর্ট তৈরি করেন। ঠিক একইভাবে একজন সাংবাদিককেও ঘটনার পেছনের সত্যটাকে খুঁজে অনুসন্ধান করে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হয়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড তথা মানবাধিকার লঙ্ঘন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু-আদিবাসী নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, দুর্নীতি-জঙ্গিবাদ ও রাজনৈতিক সন্ত্রাস নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে হয়। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতরের সূত্রে ২০১৭ সালে দেশে ৩২৮টি দৈনিক এবং ৩৭৭ সাপ্তাহিকের পাঠক সংখ্যা গড়ে ২০ লাখ আন্দাজ করা হয়েছে। এ আন্দাজ বলে দেয় সংবাদমাধ্যম এখন মোটামুটি শিল্পে রূপ নিয়েছে। পাশাপাশি আবার দেখা যায়, সাংবাদিকতা পেশা ও শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ আরোপ আর হুমকির কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্র ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে।

সাংবাদিক নির্যাতনের রেকর্ড ছাড়িয়ে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের চোখে অন্যতম নিয়ন্ত্রিত সাংবাদিকতার দেশ। রাজনৈতিক নিপীড়ন ও সরকারি নানা বিধিনিষেধে ২০১৭ সালে দেশে ৬৫ সাংবাদিক হতাহত হয়েছেন, ৯০ সাংবাদিককে হত্যার হুমকি, ১৯ জনকে গ্রেফতার, বিভিন্ন আইনে ১৪ জনকে হয়রানি এবং ৫ জনকে অপহরণ করা হয়েছে।

আমাদের দেশে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ হলেই তাদের ওপর নেমে আসে নির্যাতন। যেটা কোনো সভ্য দেশের মানুষ আশা করে না। বিগত দিনে আমাদের দেশে যেসব সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদের বিচার না হওয়ায় সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও আক্রমণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অপরাধীরা একজোট হয়ে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হচ্ছে। পিছিয়ে নেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি দেশের পুলিশকে জনবান্ধব হওয়ার জন্য বললেও সেখানে হচ্ছে তার উল্টোটা। যে দেশে জাতির বিবেক সাংবাদিক সমাজকে পুলিশের নির্যাতনের শিকার হতে হয় সে দেশে সাধারণ মানুষের অবস্থা কোন পর্যায়ে তা আজ প্রশ্নসাপেক্ষ ব্যাপার।

পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, সংবাদ প্রকাশের জেরে বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিনিধি নাজমুল হুদাকে একাধিক মামলা দিয়ে জেলে পাঠায় পুলিশ। তাকে শারীরিকভাবেও নির্যাতন করার অভিযোগ ওঠে। রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির হরতালের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশের নির্মম নির্যাতনের শিকার হন বেসরকারি টিভি চ্যানেল এটিএন নিউজের রিপোর্টার এহসান বিন দিদার ও ক্যামেরাপারসন আবদুল আলীম। পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাটে নিষিদ্ধ পলিথিন কারখানার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে যমুনা টিভির রিপোর্টার শাকিল হাসান ও ক্যামেরাপারসন শাহীন আলমকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। দৈনিক জনতার প্রধান প্রতিবেদক মশিউর রহমান রুবেলকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি ও কুপিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। সৌদি আরবে হজ কাফেলায় যাওয়া দৈনিক যুগান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার ওবায়দুল্লাহ বাদলকে প্রাণনাশের হুমকি দেন ছাত্রলীগের এক নেতা। ডেমরার বাঁশেরপুল এলাকায় বিজয় টিভির সিনিয়র রিপোর্টার কামরুজ্জামানকে ছুরিকাঘাতের মাধ্যমে হত্যার চেষ্টা চালায় সন্ত্রাসীরা। সম্পাদক আবুল আসাদ কারা-নির্যাতিত হয়। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে এনটিভির জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ইমরুল আহসানকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে সন্ত্রাসীরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে কাফনের কাপড় পাঠিয়ে সাংবাদিক সুহাস চক্রবর্তীকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই বললেই চলে। এসবের প্রতিবাদ হচ্ছে, সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নির্যাতনের মাত্রা। শুধু সংবাদকর্মী নির্যাতন নয়, বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে হামলার ঘটনাও ঘটছে।

২০১৬ সালে ১১৭ সাংবাদিক নির্যাতন, হয়রানি ও আক্রমণের শিকার হয়েছেন। সাংবাদিক হত্যার বিচার এবং হয়রানি-নির্যাতনের ঘটনায় ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ না হওয়াতে এসব ঘটনা বেড়ে গেছে। দ্বিধাবিভক্তি দূর করে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করতে না পারলে এসব ঘটনা প্রতিরোধ করা যাবে না। বিচারহীনতার কারণে সাংবাদিকদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন এবং হয়রানি অব্যাহত রয়েছে। সাংবাদিকরা যাতে স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তা ছাড়া রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেমন এ দেশের উন্নয়ন চায়, তেমনি এদেশের সাংবাদিক সমাজও উন্নয়ন চায়। তাহলে সবার মতো সাংবাদিকদেরও নিরাপত্তা বিধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

শামীম শিকদার

লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads