• বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
ক্ষম হে জাতির পিতা

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

সংরক্ষিত ছবি

মতামত

ক্ষম হে জাতির পিতা

  • প্রকাশিত ১৪ আগস্ট ২০১৮

বিশ্বজিত রায়

ঘুমন্ত বাংলাদেশ তখনো নিশিবসানের নিদ্রিত প্রতীক্ষায় নিঃশ্বাস ফেলছে। কেউ কি জানত তাদের ঘুমে রেখেই হত্যা করা হবে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে? না, বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বাঙালি কখনো আঁচ করতে পারেনি এমনটি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট নিথর রাতের শেষলগ্নে বুট আর বুলেটের শব্দে প্রকম্পিত হয় ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বরের আকাশ-বাতাস। জলপাই রঙা সেনা রাইফেলের বুলেটবারুদ ঝাঁঝরা করে দেয় রাজনীতি, শান্তি, স্বাধীনতা, মুক্তি ও মানবতার মহাকবি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসাসমৃদ্ধ বঙ্গবক্ষ। নিমিষেই নেতিয়ে পড়ে বাংলাদেশ। হু-হু করে কেঁদে ওঠে মানবতা, স্তম্ভিত হয়ে পড়ে রাত সমাপন মুহূর্তের সব অনুষঙ্গ। সন্তানের প্রাণবধ বেহায়াপনা বেদনায় শোকের অতলে নিমজ্জিত নির্বাক বঙ্গমাতা বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। ততক্ষণে রক্তলাল ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর বাড়িটি। সেদিন জাতি হয়েছিল অভিভাবকশূন্য।

বাঙালি-বাংলাকে অভিভাবকহীন করে হন্তারক দল ফিরে গেছে তাদের আপন গন্তব্যে। প্রাণশূন্য বঙ্গবন্ধু তখনো পড়ে আছেন বত্রিশ নম্বরের রক্তাক্ত সিঁড়িতে। অবশেষে জাতির পিতার নিথর দেহটি কড়া প্রহরায় নিয়ে যাওয়া হয় টুঙ্গিপাড়ার দুর্ভাগা পল্লীতে। শোকে স্তব্ধ আলো-বাতাসের নিঃশব্দ কান্নায় ভারী টুঙ্গিপাড়ার মৃত্তিকা ময়দানে নামানো হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধুর বিপন্ন দেহ। তখন অযত্ন অবহেলার চরম বাস্তবতা দেখে টুঙ্গিপাড়ার মাটি ও নিস্তেজ প্রকৃতি। বাংলার মাটি-মানুষের কল্যাণে প্রাণ উৎসর্গকারী শুচিশুদ্ধ আত্মার দীর্ঘদেহী মানুষটির সঙ্গে বাঙালির নিম্নশ্রেণিভুক্ত ঘৃণ্য গোষ্ঠীর অসহনীয় আচরণে মানবতার দেবী মুখ লুকিয়ে লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করেন। পরাধীন বাংলা ও মুক্তিকামী বাঙালির জন্য নিজেকে আজন্ম সঁপে দেওয়ার অপরাধ এবং মুক্ত স্বাধীন অথচ বিধ্বস্ত বাংলায় শান্তিসুখের চিরস্থায়ী কল্যাণ কামনান্তে ব্যতিব্যস্ততার অপরাধেই হয়তো বঙ্গবন্ধুকে দস্যুপনার দুর্দান্ত প্রতিযোগিতায় প্রাণ বলিদান করতে হয়েছে।

বাঙালি এমনটি করতে পারে তা কখনো বিশ্বাসই করতেন না মানবতার বিস্ময় বঙ্গবন্ধু। তার সাহস, প্রজ্ঞা, বীরত্বের কাছে চিরশত্রু পাক ভুট্টো-ইয়াহিয়া ও বৈশ্বিক শক্তিধর ক্ষমতা মাথানত করলেও কেবল বাঙালি ওই সারমেয় শাবকরাই বিশ্বাসঘাতকতার চূড়ান্ত নজির স্থাপন করল। যার কোমল মনের বিস্তৃত অঙ্গনে শুধু বাঙালির বসতই ছিল না, আপন অস্তিত্বে তিনি শোষিত বাংলার সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির স্বপ্নই সর্বদা লালন করে গেছেন। বাঙালির আস্থা, বিশ্বাস, ভরসার প্রতিদানও দিয়েছিলেন নিজেকে মৃত্যুর অগ্নিকুণ্ডলীতে ছুড়ে দিয়ে। মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় রেখে শত্রুপক্ষের প্রতি একটি অনুরোধের কাতর উক্তি তুলে ধরে মৃত্যুমুখী বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমাকে মেরে ফেলে দাও বাধা নেই, তবে মৃত্যুর পর লাশটা আমার বাঙালির কাছে পৌঁছে দিও।’

একটি জাতিকে কতখানি ভালোবাসলে, কতটুকু বিশ্বাস করলে, কতটুকু আপন ভাবলে একজন নেতা এমন কথা বলতে পারেন। বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে বিশ্বাস করেছিলেন বলেই প্রাণবধের চতুর চক্রান্ত বিষয়ক বিদেশি গোয়েন্দা তথ্য পেয়েও প্রাণপ্রিয় জাতিকে অবিশ্বাস করা বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সম্ভব হয়নি। আর তাই তো তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের সরকারি বাসভবন ছেড়ে নিরাপত্তাহীন নিজস্ব বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। বঙ্গবন্ধুর এমন সাদামাটা জীবনযাপনে বিস্মিত ভিনদেশি সাংবাদিকের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু দৃঢ়চিত্তে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি সাধারণ মানুষের নেতা, নিরাপদ চৌকিতে থাকলে নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে সাধারণ মানুষ সহজে আমার কাছে ঘেঁষতে পারবে না। এমন পরিবেশই আমার উপযুক্ত স্থান।’

বঙ্গবন্ধুর অসামান্য অর্জন ও জীবনবাজি ভালোবাসার যৎসামান্য প্রতিদানও দিতে পারেনি অধম বাঙালি। শোষণ-বঞ্চনার বিকৃত বেহায়াপনায় বিপন্ন যে জাতিকে চিরমুক্তির সাধ পাইয়ে দিলেন তিনি, সেই জাতির কিছু বিভ্রান্ত সন্তান বুলেটের বিষমাখা নিশানায় ক্ষতবিক্ষত করল চির উন্নত হার-না-মানা বিপ্লবীর বুক। একটি জাতির দীর্ঘ যন্ত্রণা ঘুচিয়ে স্বাধীনতার সুখ ছিনিয়ে আনার মহামানবতুল্য বিরল ক্ষমতাধর মানবতাবাদী মহত্ত্বের মূল্যায়নটুকুও করতে পারিনি আমরা। আজ তাই নিজেকেই ধিক্কার দিই! চরম পৈশাচিকতা, বীভৎস বর্বরতা, নির্মম নষ্টামি ও অযাচিত অসভ্যপনায় ধ্বংস করে দেওয়া হলো জাতির পিতার মানবতাবাদী দেহটি।

পিতা, তুমি কত বড় অপরাধী! মহাপাপ করে বসলে তুমি! যাদের জন্য, যে ভূমির জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেলে, সেই স্বাধীন ভূখণ্ডের মুক্ত জাতি, এই বাঙালির কিছু বিপথগামী সন্তানরাই মানবতাহীন মর্মস্পর্শী কায়দায় হত্যা করল তোমায়। নরকের নোংরা আস্তানায় পাপিষ্ঠ আত্মাকে কীভাবে শাস্তি দেওয়া হয় জানি না, তবে তোমার জীবন জয়ের বিশালতার পাওনাস্বরূপ যে প্রাপ্যতা বুঝিয়ে দেওয়া হলো তা নরককুণ্ডলীর বহ্নিশিখার ভয়াবহ উত্তাপ থেকেও পীড়াদায়ক। জুলুমবাজ পাকশত্রুরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মৃত্যুকবরের ভয় দেখানো ছাড়া তার গিরিসম ব্যক্তিত্বের কাছে দাঁড়ানোর সাহস দেখাতে পারেনি; সেখানে তারই সমজাতির কুপ্রবৃত্তিধারী কিছু উচ্চাভিলাষী বাঙালি-প্রেতাত্মার নির্দয় আঘাতে নিঃশেষ হলো জাতির পিতার তেজস্বী প্রাণ। অথচ এ জাতির কল্যাণ সাধনই ছিল বঙ্গবন্ধুর অন্যতম ব্রত। শোষিত বাঙালির বিবর্ণ মুখে হাসি ফুটানোর মহামন্ত্রে ধ্যানমগ্ন মানুষটির পুণ্যময় প্রাণপ্রদীপ নিভিয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত করা হলো বাংলাদেশকে। এ যেন পুত্রহাতে পিতা খুনের নজিরবিহীন বর্বরতা। পরপারে ভালো থাকুন পিতা। আপনার সুমহান আত্মার শান্তি কামনা করা ছাড়া এ ভাগ্যবিড়ম্বিত জাতির আর কিছুই করার নেই।

 

লেখক : নিবন্ধকার

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads