• শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৪
ads
মোটরযান আইন ও চালকদের অপরাধ

শারীরিক কিংবা দৈহিকভাবে অনুপযুক্ত অবস্থায় গাড়ি চালনায় সর্বোচ্চ পাঁচশত টাকা জরিমানা হবে

সংগৃহীত ছবি

মতামত

মোটরযান আইন ও চালকদের অপরাধ

  • প্রকাশিত ১৬ আগস্ট ২০১৮

মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ অনুযায়ী মোটরযানের মালিক, চালক, কন্ডাক্টরের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের নিয়মনীতি আছে, যা ভঙ্গ করা অপরাধ। অথচ আইন থাকা সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত আইন ভঙ্গ করে গাড়ি চলছে। পুলিশ বিভিন্ন কারণে আপনার গাড়ি আটক করতে পারে, যেমন- লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে, নিষিদ্ধ হর্ন ব্যবহার করলে, নির্ধারিত গতির চেয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালালে, বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালালে, সঠিক জায়গায় গাড়ি পার্ক না করলে, গাড়ি চালাতে গিয়ে পুলিশের নির্দেশনা না মানা, গাড়ির ফিটনেস সংক্রান্ত কাগজপত্র নবায়ন না করা, ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন না করা, গাড়ির ধোঁয়া বের হওয়া, অবীমাকৃত মোটরগাড়ি চালনা ইত্যাদি। গাড়ি আটক করার সময় পুলিশ একটি বা দুটি কাগজ জব্দ করবে এবং আপনাকে একটি রসিদ দেবে। ঢাকা মহানগর ট্রাফিক পুলিশের চারটি জোন রয়েছে, যথা- উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিম। পুলিশের দেওয়া রসিদের পেছনেই লেখা থাকবে কোন জোনের ট্রাফিক পুলিশ আপনার গাড়িটি আটক করল। আপনাকে সেই জোনের অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট জোনের ডেপুটি কমিশনার জরিমানা নির্ধারণের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করে থাকেন। এসব ক্ষেত্রে আপনি আপনার অনুকূলে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরতে পারেন। ডেপুটি কমিশনার পূর্ণ জরিমানার চার ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত জরিমানা নির্ধারণ করতে পারেন, এমনকি জরিমানা মওকুফও করে দিতে পারেন। তবে আপনার ড্রাইভারকে রসিদসহ পাঠিয়ে জরিমানা দিয়ে আসাটাই ভালো। জরিমানা দেওয়ার জন্য ডেপুটি পুলিশ কমিশনার অফিস থেকে আরেকটি রসিদ দেওয়া হবে আপনাকে।

তবে জরিমানা না দিলে বা যথাসময়ে হাজির না হলে অপরাধের ধরন, ঘটনাস্থলসহ ইত্যাদি প্রতিবেদন সহকারে মামলাটি আদালতে পাঠানো হবে ওয়ারেন্ট ইস্যু করার জন্য। এসব ক্ষেত্রে জরিমানা নির্ধারণের পর আপনি যদি মনে করেন আপনার ওপর অন্যায় করা হয়েছে তবে আদালতেও যেতে পারেন। সামান্য জরিমানার জন্য আদালতে গিয়ে আর্থিক বিচারে আপনার কোনো ফায়দা হবে না, তবে রায় আপনার অনুকূলে গেলে সেটি একটি নৈতিক বিজয় হবে।

পুলিশ যদি কোনো কারণে গাড়ি আটক করে থানায় নিয়ে যায় এবং মামলা হয়, তাহলে গাড়িটি নিজের জিম্মায় নিতে আপনি আবেদন করতে পারবেন। প্রথমে থানা থেকে মামলার এজাহারের ফটোকপি তুলুন। সেই সঙ্গে গাড়ির নিবন্ধনের ফটোকপি কিংবা গাড়ির মালিকানা সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে একজন আইনজীবীর শরণাপন্ন হোন। আইনজীবী আটক করা গাড়িটি আপনার জিম্মায় নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করবেন। শুনানির প্রথম দিনে ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয় সাধারণত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে (আইও) বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) থেকে গাড়ির মালিকানা নিরূপণ করে কোনো অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে কি-না, তা যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আদেশ দেবেন।

আদালতের আদেশ সাধারণত পরবর্তী কার্যদিবসে সংশ্লিষ্ট থানায় পৌঁছে যায়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা যেন প্রতিবেদন অতিসত্বর থানা থেকে আদালতে পাঠান, তার জন্য আপনি ব্যক্তিগতভাবে জিআরও অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন। প্রতিবেদন থানা থেকে আদালতে পাঠানো হলে আইনজীবী নথি পর্যবেক্ষণ করে দেখবেন তা নথির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে কি-না। এরপর আইনজীবী একটি দরখাস্তের মাধ্যমে আদালতকে অবহিত করবেন যে, বিআরটিএ থেকে গাড়ির মালিকানা নিরূপণ করা হয়েছে। শুনানির সময় আদালতের সামনে গাড়ির মালিককে উপস্থিত থাকতে হবে। আদালত বিআরটিএ প্রতিবেদন, তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতিবেদন ও আইনজীবীর শুনানিতে সন্তুষ্ট হলে থানা কর্তৃপক্ষকে আদেশ দেবেন আটক গাড়িটি জিম্মায় দেওয়ার জন্য। পরবর্তী সময়ে তদন্তকারী কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে গাড়ি নিজের জিম্মায় নিতে পারবেন এই শর্তে, পরবর্তী সময়ে মামলার তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজন হলে তিনি তা থানায় হাজির করবেন। এভাবে গাড়িটি জিম্মায় নিতে প্রায় এক থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে।

অপরাধ ও শাস্তি

ধারা ১৩৮। লাইসেন্স ব্যতীত গাড়ি চালনা : কোনো ব্যক্তি মোটরযান অধ্যাদেশের ৩ ধারা (১) উপধারা লঙ্ঘন করে কোনো মোটরযান চালালে ১৩৮ ধারা মোতাবেক সর্বোচ্চ চার মাসের কারাদণ্ড অথবা পাঁচশত টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয়বিধ শাস্তি পেতে হবে।

ধারা ১৩৯। নিষিদ্ধ হর্ন কিংবা শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্র লাগানো ও ব্যবহার : যদি কোনো ব্যক্তি মোটরযানে এমন ধরনের হর্ন বা শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্র সংযোজন করে যা সংশ্লিষ্ট এলাকায় যথাযোগ্য কর্তৃপক্ষ এই আইন অথবা তদধীনে প্রণীত কোনো বিধি বা প্রবিধান মোতাবেক নিষিদ্ধ করেছেন, তাহলে ১৩৯ ধারা মোতাবেক সর্বোচ্চ একশত টাকা পর্যন্ত জরিমানা হবে।

ধারা ১৪১। লাইসেন্স সংক্রান্ত অপরাধসমূহ : (১) এই অধ্যাদেশ অনুসারে ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণ করার ও পাওয়ার অযোগ্য কোনো ব্যক্তি প্রকাশ্য স্থানে কোনো মোটরযান চালালে কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করলে এনডোর্সমেন্ট ব্যতীত সে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার অযোগ্য হওয়ার পর তার পূর্ববর্তী ড্রাইভিং লাইসেন্সের এনডোর্সমেন্টের কথা প্রকাশ না করে পুনরায় ড্রাইভিং লাইসেন্স সংগ্রহ করলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা পাঁচশত টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয়বিধ শাস্তি হবে। (২) এই আইন অনুসারে কন্ডাক্টরস লাইসেন্স পাওয়ার অযোগ্য কোনো ব্যক্তি প্রকাশ্য স্থানে ‘স্টেজ-ক্যারেজ’ করলে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড কিংবা দুইশত টাকা জরিমানা কিংবা উভয়বিধ শাস্তি পেতে হবে। (৩) যেকোনো সময় মোটরযান চলাকালে এই আইন অনুযায়ী কর্মরত যেকোনো কর্তৃপক্ষ বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখতে চাইলে তা প্রদর্শনে ব্যর্থ হলে দণ্ডস্বরূপ পঞ্চাশ টাকা জরিমানা করা হবে।

ধারা ১৪২। নির্ধারিত গতির চেয়ে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালালে : এক্ষেত্রে প্রথমবার অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ এক মাস কারাদণ্ড কিংবা সর্বাধিক তিনশত টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং পরবর্তীতে অনুরূপ অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড কিংবা সর্বাধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং তাহার ড্রাইভিং লাইসেন্স অনধিক এক মাস মেয়াদের জন্য সাসপেণ্ড করা হবে।

ধারা ১৪৩। বেপরোয়াভাবে কিংবা বিপজ্জনকভাবে গাড়ি চালনা : প্রথমবার এই অপরাধ করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড কিংবা পাঁচশত টাকা জরিমানা হবে এবং তার ড্রাইভিং লাইসেন্স একটা নির্ধারিত মেয়াদের জন্য সাসপেন্ড থাকবে।

ধারা ১৪৪। মদ্যপান কিংবা মাদকদ্রব্য সেবনের পর মাতাল অবস্থায় গাড়ি চালানো : গাড়ির ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ কার্যকর করতে অক্ষম, এমতাবস্থায় যদি কেউ গাড়ি চালায় তবে অনুরূপ অপরাধ প্রথমবার সংঘটনের জন্য সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড কিংবা সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয়বিধ শাস্তি হবে।

ধারা ১৪৫। শারীরিক কিংবা দৈহিকভাবে অনুপযুক্ত অবস্থায় গাড়ি চালনা : এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচশত টাকা জরিমানা হবে এবং তার ড্রাইভিং লাইসেন্স নির্দিষ্ট মেয়াদে বাতিল করা হবে।

ধারা ১৪৭। কতিপয় অপরাধে সহায়তার জন্য শাস্তি : কোনো ব্যক্তি ১৪৩ কিংবা ১৪৫ ধারা অনুযায়ী কোনো একটি অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করলে তিনি সে অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি পাওয়ার যোগ্য হবেন।

ধারা ১৪৮। মোটরগাড়ির দৌড়বাজি কিংবা গতি পরীক্ষা : এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক মাস কারাদণ্ড অথবা পাঁচশত টাকা জরিমানা কিংবা উভয়বিধ শাস্তি হবে এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স সর্বোচ্চ এক বৎসরের জন্য সাসপেন্ড করা যেতে পারে।

ধারা ১৪৯। নিরাপত্তাবিহীন অবস্থায় গাড়ি ব্যবহার : সর্বোচ্চ এক মাস কারাদণ্ড কিংবা সর্বাধিক দুইশত পঞ্চাশ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডণীয় করা হবে।

ধারা ১৫০। ধোঁয়া বাহির হওয়া মোটরযান ব্যবহার : এমনভাবে ধোঁয়া বাহির হয় যার ফলে স্বাস্থ্যের ক্ষতি হতে পারে, অনুরূপ মোটরগাড়ি চালালে সর্বোচ্চ দুইশত টাকা জরিমানা হবে।

ধারা ১৫১। এই অধ্যাদেশের সাথে সঙ্গতিবিহীন অবস্থায় গাড়ি বিক্রয় অথবা গাড়ির পরিবর্তন সাধন : সর্বোচ্চ দুই বৎসর মেয়াদী কারাদণ্ড কিংবা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয়বিধ দণ্ড দেওয়া হতে পারে।

ধারা ১৫২। রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস সার্টিফিকেট অথবা পারমিট ব্যতীত মোটরগাড়ি ব্যবহার : কোনো ব্যক্তি ৩২, ৪৭, ৫১(১) উপধারা অনুযায়ী পারমিট ব্যতীত মোটরগাড়ি চালালে— প্রথমবারের অপরাধের জন্য সর্বাধিক তিন মাস কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

ধারা ১৫৪। অননুমোদিত ওজন অতিক্রমপূর্বক গাড়ি চালনা : কোনো ব্যক্তি ৮৬ অথবা ৮৮ ধারার অধীনে আরোপিত কোনো নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা জরিমানা।

ধারা ১৫৫। অবীমাকৃত মোটরযান চালনা : কোনো ব্যক্তি ১০৯ ধারার বিধান লঙ্ঘন করে কোনো মোটরযান চালালে কিংবা চালানোর অনুমতি দিলে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা জরিমানার শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।

ধারা ১৫৬। অনুমতি ব্যতীত গাড়ি চালনা : কোনো ব্যক্তি কোনো মোটরযানের কিংবা অন্য কোনো আইনানুগ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত সংশ্লিষ্ট মোটরগাড়ি চালিয়ে থাকলে সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড অথবা সর্বাধিক দুই হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয়বিধ শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।

ধারা ১৫৭। প্রকাশ্য সড়কে অথবা প্রকাশ্য স্থানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি : সর্বোচ্চ পাঁচশত টাকা জরিমানা হবে এবং অনুরূপ মোটরযান কিংবা খুচরা যন্ত্র বা জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে।

ধারা ১৬০। ওয়ারেন্ট ব্যতীত গ্রেফতারের ক্ষমতা : ইউনিফরমধারী পুলিশ অফিসারের সামনে কেউ ৩২, ৫১, ১৪৩, ১৪৪, ১৪৫, ১৪৬, ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ১৫৪ কিংবা ১৫৬ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য কোনো অপরাধ করলে তিনি ওই অপরাধীকে ওয়ারেন্ট ব্যতীতই গ্রেফতার করতে পারেন।

মোটরযান সংক্রান্ত আইন সাধারণ মানুষের অধিকাংশই জানেন না। আবার কেউ জেনে থাকলেও তা মানতে ইচ্ছুক নন। এ অবস্থায় নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা দুরূহ। সুতরাং ট্রাফিক বিভাগ, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং মোটরযান মালিক, চালক ও জনগণ— সবাইকে সড়ক ও মোটরযান আইন যুগপৎ মেনে চলা বাঞ্ছনীয়।

সিরাজ প্রামাণিক

আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট

seraj.pramanik@gmail.com

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads