• বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫
ads

মতামত

তর্ক-বিতর্কে অসমের নাগরিকপঞ্জি

  • রহিম আবদুর রহিম
  • প্রকাশিত ২৮ আগস্ট ২০১৮

ভারতের অসমের ‘নাগরিকপঞ্জি’ বিষয়টি ‘টক অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’। হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টানসহ বহু জাতের শান্তির আবাসভূমি অসমে জাত-পাতের মতো সাম্প্রদায়িকতা নেই বললেই চলে। তবে এনআরসি নিয়ে আলাপ-আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক রাজনীতি-অপরাজনীতিতে সরগরম ভারত। আতঙ্ক, হতাশা, ভয়ভীতি কাজ করছে ভুক্তভোগী মহলে। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভক্ত হওয়ার পর থেকে ভারতবর্ষের এক প্রান্তের জনমানুষ জীবন-জীবিকার তাগিদে অন্য প্রান্তে বসতি স্থাপন করেছে বলে মনে হচ্ছে। এ ছাড়া ভারতবর্ষের ২৯টি রাজ্যের মানুষ যে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে গিয়েছে এ প্রমাণও শতসহস্র। ১৯৪৭-এর দেশ বিভক্ত হওয়ার পর তদানীন্তন পাকিস্তান ও পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের কিছু জনমানুষ কারণে-অকারণে ভারতের আসামে পাড়ি জমিয়েছে, এটাও সত্য। ৩৩টি জেলা নিয়ে গঠিত অসম রাজ্যের প্রতিবেশী অন্যান্য রাজ্যগুলো হচ্ছে ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড, মনিপুর, অরুণাচল, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গ।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অসমের প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তরে ভুটান-নেপাল, পূর্ব-দক্ষিণে মিয়ানমার এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে বাংলাদেশ। সময়ের ব্যবধানে অসমে বিভিন্ন অঞ্চলের বহিরাগতদের আগমন এমনভাবে ঘটতে থাকে যে, অসমের স্থায়ী বাসিন্দারাই নিজভূমে পরবাসী হতে থাকে। স্থায়ী বাসিন্দারা তাদের অস্তিত্ব এবং নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে বেঁচে থাকার তাগিদেই ১৯৭৯ সালে (বহিরাগত) ‘অভিবাসী খেদাও’ আন্দোলন শুরু করেন। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় ওই সময়ে গঠিত ‘অল অসম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন’ নামের একটি সংগঠন। আন্দোলন চলে দীর্ঘ ছয় বছর (১৯৭৯-১৯৮৫ পর্যন্ত)। এই আন্দোলনে তৎকালীন ভারত সরকারের পুলিশ মিলিটারির গুলিতে মারা যান আন্দোলনরত ৮৫৫ ছাত্র-জনতা। একপর্যায়ে ১৯৮৫ সালে ১৫ আগস্টের মধ্যরাতে তৎকালীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ‘অভিবাসী খেদাও’ আন্দোলনের নেতাকর্মীদের একটি চুক্তি হয়। ওই চুক্তিতে উল্লেখ থাকে, ১৯৭১-এর ২৪ মার্চ মধ্যরাত পর্যন্ত অসমে যারা প্রবেশ করেছে, বসবাস করছে, তারাই ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন। চুক্তির পরের বছরই ‘অভিবাসী খেদাও’ অল অসম স্টুডেন্ট ইউনিয়নের অন্যতম নেতা প্রফুল্ল কুমার মহন্ত, (এজিপি) আসাম গণপরিষদ নামে দল গঠন করেন এবং ওই দল থেকে তিনি রাজ্য সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়ী হন। প্রফুল্ল কুমার মহন্ত রাজ্য সরকারে প্রবেশ করার পর তিনি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন, ‘অভিবাসী খেদাও’ আন্দোলন বিষয়টি মুখে যতটুকু বলা সহজ, বাস্তবতায় ততটা সহজ নয়। বিষয়টির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মানবিক আবেদন পারস্পারিক, যা রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায়, ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’। অভিবাসী খেদাও আন্দোলন এবং বাস্তবতার অন্তর্নিহিত বিশ্লেষণ করেই ওই সময় প্রফুল্ল কুমার মহন্ত জনদাবি থেকে দূরে চলে যান। ফলে আর অভিবাসী খেদাও আন্দোলন চাঙ্গা হয়নি। তবে ওই সময় ভারতের আন্তর্জাতিক সীমান্ত এলাকায় পুশব্যাক-পুশইন নাটকীয় কর্মকাণ্ড চালিয়ে পরিবেশ ঘোলাটে করার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। আন্দোলনের বাস্তবতার সঙ্গে পরিবেশ পরিস্থিতি মেলাতে গিয়ে দেখা গেছে, অসমে যারা বর্তমানে বসবাস করছে তারা ভারতের কোনো না কোনো রাজ্যেরই জনমানুষ। অভাব-অনটন, নদীর ভাঙন, পাহাড় ধস, বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে তারা হয়তোবা অসম অঞ্চলটিকে শেল্টার হিসেবে কোনো না কোনো সময় ব্যবহার করতেই পারে। তৎকালীন সময় আন্দোলনকারীরা অনুমান করেছিল, অসমের বহিরাগতরা সম্ভবত ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিদের নির্মম হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতেই বাংলাদেশ থেকে ভারতের অসম রাজ্যে প্রবেশ করেছে। তাদের এ ধারণা হতেই পারে, তবে ইতিহাস এবং বাস্তবতার আলোকে তাদের ধারণা পুরোপুরি সত্য নয়।

অসমে সরেজমিনে কথা হয় স্কুটার চালক ১৮ বছর বয়স্ক কামালের সঙ্গে। সে জানায়, তার এনআরসি হয়েছে। এখানে হিন্দু-মুসলিম ভেদাভেদ নেই। ওরা ভালো আছে। তার মতে, অসমের কিছু মানুষ নাকি মনে করে, মুসলমান মানেই তারা বাংলাদেশি বাঙালি। অসমের আনাচে-কানাচে শত বছর ধরে বসবাস করছে নেপালি, রাজস্থানি, মারাঠি, পাঞ্জাবি ও গুজরাট অঞ্চলের হিন্দু-মুসলিম। অসম মানেই বহুজাতের জনমানুষের আবাসন ভূমি। বহুজাতিক মানবের এই চারণভূমিতে এক সময় যারা সোনা ফলিয়ে অসম রাজ্যকে পরিপুষ্ট করে তুলেছে, তাদের নিয়েই বারবার চলে এনআরসি বিতর্ক। অসমের রাজধানী ডিসপুরের ব্রহ্মপুত্র লজের সামনে কথা হয়েছে বরপেটার স্থায়ী বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে। এনআরসি তালিকায় তার এবং তার বাবা-মার নাম আসেনি। তবে তার ছোট বোন ও চাচা-চাচিদের নাম এসেছে। বোঝা গেল, খড়সা প্রণয়নকালে মাঠকর্মীদের ভুলত্রুটি হয়েছে। বিষয়টি আতঙ্কের কিছুই নয়। ১৮ বছর বয়স্ক আমিনুল ইসলাম, সে লেখাপড়া করে ইডেনভেলি কলেজে। তার পরিবারের সবার নামই তালিকায় এসেছে। তার কথায় বোঝা গেল, এনআরসি বিষয়টি আতঙ্কের নয়, তারপরও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ঝালোকবারির প্রান্তিক ব্যবসায়ী ময়নুল হক জানালেন, এনআরসি নিয়ে ভয়ের কিছুই নেই, আমরা তালিকাভুক্ত হয়েছি, সবারই হবে, ভুলভ্রান্তির কারণেই অনেকে হয়তোবা তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। অসমে যারা জন্মগ্রহণ করেছে তাদের কোনো ভয় নেই। কামাখ্যা শহরের মালিগাঁও কথা হয়েছে হাজু থানার টাঙ্গনমারির গ্রামের টাইটেল পাস মাওলানা সাইফুল আলীর সঙ্গে। তিনি একটি সিনিয়র ইসলামিয়া মাদরাসার শিক্ষক, এনআরসি তালিকা থেকে তাদের পুরো পরিবারের নাম বাদ পড়েছে। তাদের আত্মীয়-স্বজনদের ১৯৬৬ সালে অসমের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এরপরও তালিকায় তাদের নাম না থাকায় তার ধারণা বংশলিঙ্গ তথ্য দিতে পারেনি বলেই হয়তো এমনটা হয়েছে। বহু পুরনো দিনের এসব কাগজপত্রও তাদের কাছে নেই। তাহলে এখন উপায়? উত্তর, ‘অসমের অধিবাসী অসমেই থাকব’। অসমের মৌরাবারি জামিয়া ইসলাম দারুল উলুম মাদরাসার হাফিজুর রহমানসহ ২০ জন ছাত্রের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা সবাই একসঙ্গে এক বাক্যে বলেছে, তাদের সব পরিবারের সব সদস্যের নাম এনআরসিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাদের মাদরাসাটি এলাকার হিন্দু-মুসলমানের অর্থে পরিচালিত হচ্ছে। অসমে হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে মানবতার বন্ধন যে দৃঢ় এটা বোঝা গেল তাদের কথায়।

অসমের বামপন্থি নেতা, বিশিষ্ট সমাজসেবী, রোঙ্গীয়া সাবডিভিশনের পশ্চিম বুড়িগোগ মৌজার পঞ্চায়েত চেয়ারম্যান আবুল হোসেন (৬৫) এনআরসি সম্পর্কে বলেন, ‘অল অসম স্টুডেন্ট ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা চেয়েছিল অবৈধ অভিবাসীদের অসম থেকে তাড়াতে। কিন্তু ওই আন্দোলনের নেতা প্রফুল্ল কুমার মহন্ত এজিপি করে ক্ষমতায় গেলেন, অথচ দাবি পূরণ হলো না, ব্রিটিশ কর্তৃক সৃষ্ট পুরনো জটিলতা এত সহজে সমাধান সম্ভব নয়। ৩৩ বছরের পূর্বের একটি দাবি এনআরসি পদ্ধতি, এটি বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের শৃঙ্খলাবোধ ফিরে আসবে, তবে তা যেন কোনোভাবেই রাষ্ট্রের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহের অপকৌশল না হয়।’ অসমের শিক্ষা-সংস্কৃতি, আচার-আচরণ ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয়েছে অল ইন্ডিয়া কালচারাল সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক, মীরাবাঈ রাষ্ট্রীয় পদকে ভূষিত বিশিষ্ট শিল্পী পখিলা কলিতার সঙ্গে। তিনি জানান, অসমের মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনায় গড়ে উঠেছে। এখানে হিন্দু -মুসলিম, বৌদ্ধ-খ্রিস্টানের মধ্যে কোনো জাতিগত ভেদাভেদ নেই। যা প্রমাণ করতে তিনি আমাকে নিয়ে গেছেন অসমের নানা প্রান্তের নানাজনের কাছে। এনআরসি নিয়ে কথা হয়েছে অসমের সাংস্কৃতিক সংগঠন তক্ষশীলা কালচারাল সংগঠনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. অরনিমা বড়ুয়ার সঙ্গে। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এনআরসি বিষয়টিকে কেন্দ্র করে অসমে কোনো মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে কি না? তিনি উত্তরে বলেছেন, ‘মানবতার সম্মিলনে গঠিত অসম, এই রাজ্যেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন সুরের দেবতা, মানবতার মহাপুরুষ, সঙ্গীত শিল্পী ভুপেন হাজারিকা। অসমের আকাশে বাতাসে দিবানিশি ঝংকৃত হয়— মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য। সেখানে মানবতার বিপর্যয় হাস্যকর।’

১৩০ কোটি জনসংখ্যার দেশ ভারতের ২৯টি প্রদেশের মধ্যে পশ্চাৎপদ রাজ্য অসমের মোট ৩৩টি জেলার ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনের (এনআরসি) জন্য আবেদন করেছিলেন ৩ কোটি ২৯ লাখ জনমানুষ। এর মধ্যে তালিকাভুক্ত হয়েছেন ২ কোটি ৮৯ লাখ। তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন ৪০ লাখ। বাদ পড়াদের আবেদনের সময়সীমা বৃদ্ধি করেছেন কেন্দ্রীয় সরকার। ক্ষমতাসীন কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক দল বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বলেছেন, বাদ পড়া ৪০ লাখ জনমানুষের মধ্যে ১৩ লাখ হিন্দু, বাকিরা মুসলিম। কেউ বলেনি বাদ পড়াদের কী হবে? বলার প্রয়োজন অনুভব না করে সবাই যার যার অবস্থান থেকে রাজনীতি-অপরাজনীতির চরম খেলায় মেতে উঠেছে। তবে সরেজমিনে পরিদর্শন করে স্পষ্টই বলা যায়, এনআরসি থেকে কেউ বাদ পড়বে না, পড়ার কথাও না। কোনো না কোনোভাবেই তাদের নাম অবশ্যই তালিকাভুক্ত হবে। অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত খেটে খাওয়া জনমানুষ এনআরসি নিয়ে প্রথম দিকে কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি।

এখন বিষয়টি সবাই গুরুত্বসহকারে আমলে নিয়েছে। সময়ের ব্যবধানে যাদের নথিপত্র খোয়া গেছে, তাদেরও মনোবল চাঙ্গা। কেননা, তারা বিভিন্ন সময় ভোটার হয়েছেন, আসামের মাটিতে জন্ম নিয়েছেন, এরপরও কেন এনআরসিতে নাম থাকবে না। সরকার সংশ্লিষ্টরা বারবার আশ্বাস দিচ্ছে, বৈধ নথিপত্রধারীরা কোনোভাবেই এনআরসি থেকে বাদ পড়বে না। সরকারের আশ্বাসের বাস্তবতা মিলেছে অসমের পশ্চিম সীমান্ত ঘেঁষা ভবানীপুরের হাবিবার কথায়। সে দিল্লির লখনৌতে শ্রমিকের কাজ করে, প্রায় ১৪০০ কিলোমিটার দূর থেকে এসেছে এনআরসি সংগ্রহ করতে। তার এনআরসি হয়েছে, আবার কাজে ফিরে গেছে। অসম ঘুরে যা দেখলাম, তা একটি রাজ্যের নিয়মশৃঙ্খলা রক্ষার রুটিনওয়ার্ক। হাওয়ায় উড়ছে শুধু পুঁথি সাহিত্যের সেই, ‘লাখো লাখো মরে সৈন্য, হাজারে হাজার; হিসাব করিয়া দেখি আছে জনা চার।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads