• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
বসবাসযোগ্য ঢাকা বাস্তবায়নে বাধা

প্রতিদিন ঢাকায় মানুষের আগমন ঘটছে ১ হাজার ৭০০ জন

সংগৃহীত ছবি

মতামত

বসবাসযোগ্য ঢাকা বাস্তবায়নে বাধা

  • প্রকাশিত ২৯ আগস্ট ২০১৮

শামীম শিকদার

ঢাকায় টাকা ওড়ে- এই কথাটিকে কেন্দ্র করে হলেও ঢাকায় আসা, ঢাকায় থাকা, ঢাকায় একবার ঘুরে যাওয়া একটা নেশার মতো। ঢাকায় যারা থাকেন, তারা যেমন ঢাকা ছেড়ে যেতে চান না, তেমনি ঢাকায় একবার যারা ঢুকে পড়েন, তারা আর ফিরতে চান না। ঢাকা যতই সমস্যায় জর্জরিত হোক, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা যতই কম হোক, তবু ঢাকাবাসী ঢাকাতেই থাকতে চান।

ঢাকায় যারা বসবাস করেন এবং যারা ঢাকাগামী হন, তারা ঢাকার কঠিন জীবন এবং দুরবস্থার কথা মেনে নিয়েই থাকেন এবং আসেন। এর কারণ ঢাকা তাদের স্বপ্ন। এই যে মানুষের ঢাকামুখী হওয়া এবং ঢাকাকে বসবাসের অনুপযোগী করে তোলা, এটা তাদের মাথায় থাকে না। তারা মনে করেন, কোনো রকমে ঢাকায় ঢুকতে পারলেই হলো, জীবন বদলে যাবে। এর ফলে প্রতিদিন ঢাকায় মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতিদিন ঢাকায় মানুষের আগমন ঘটছে ১ হাজার ৭০০ জন। অবশ্য এ সংখ্যাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। কোনো কোনো হিসাবে সংখ্যাটি আড়াই হাজারের বেশি। এ হিসাবে ঢাকায় মাসে যুক্ত হচ্ছে ৫০ থেকে ৭৫ হাজার মানুষ। পৃথিবীর আর কোনো শহরে এত অধিক সংখ্যক মানুষের যুক্ত হওয়ার নজির খুব কমই রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, ঢাকার বর্তমান লোকসংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ। জাতিসংঘের ইউএনএফপির হিসাবে, পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল শহরগুলোর তালিকায় ঢাকা ১১তম। তবে আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার দিক থেকে এটি পৃথিবীর এক নম্বর জনঘনত্বের শহর। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৩ হাজার ৫০০ জন বসবাস করে।

২০১১ সাল থেকে সিরিয়ায় দেশি-বিদেশি বহুমুখী যুদ্ধ চলছে। বিমান হামলা, বোমা বিস্ফোরণ এমনকি রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারও হচ্ছে সেখানে। ফলে দামেস্কের বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকায় এক নম্বরে থাকা অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু উন্নয়নশীল দেশের রাজধানী ঢাকা বছরের পর বছর বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকার তলানিতে থাকে কীভাবে, তা আমাদের বোধগম্য নয়।

রাজধানী ঢাকা আর নাগরিক সমস্যা সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে বহু আগেই। তবু আমরা বলি, যতই সমস্যা থাক না কেন তবু ঢাকা আমাদের প্রাণের শহর। বর্তমানে ঢাকার ভেতরের চিত্র প্রত্যাশার বাইরে চলে গেছে। শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী কেবল দখলদারিত্বের কবলে পড়ে আবদ্ধ জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে। যদি এসব খাল রক্ষা করা যেত, তাহলে ঢাকা শহরের চেহারা অনেকটা পরিবর্তন হতো।

আবার অসংখ্য সমস্যার মধ্যে যেটি প্রধান হয়ে উঠেছে, তা হচ্ছে যানজট। জাতিসংঘের ইউএনডিপি এক গবেষণায় বলেছে, যানজটে বছরে ক্ষতি হয় ৩৫ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যানবাহনের পুড়ে যাওয়া বাড়তি জ্বালানির মূল্য ও নগরবাসীর স্বাস্থ্যহানির আর্থিক মূল্য।

যানজটে বছরে যে ক্ষতি হয় তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর একটি করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেও অতিরিক্ত অর্থ উদ্বৃত্ত থেকে যাবে।

যানজটের কারণ মোটামুটি সবারই জানা। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে ১৯টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ট্রাফিক আইন না মানা ও সঠিকভাবে প্রতিপালন না করা, যত্রতত্র কার পার্কিং এবং কার পার্কিংয়ের জায়গায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, যেখানে সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করা, রাস্তা ও ফুটপাথ দখল, ট্রাফিক পুলিশের যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব ইত্যাদি। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, যেখানে একটি আদর্শ শহরে ২৫ ভাগ সড়ক থাকে, সেখানে ঢাকা শহরে রয়েছে মাত্র ৮ ভাগ। আবার এই ৮ ভাগের মধ্যে কার্যকর রাস্তা হচ্ছে আড়াই ভাগ! এই কার্যকর রাস্তা দিয়ে সোয়া দুই লাখ গাড়ি চলাচল করতে পারলেও এখানে চলছে ৯ লাখ। তার ওপর প্রতিদিন ৩১৭টি গাড়ি রাস্তায় নামছে।

আবার নগরীতে লোকসংখ্যার অনুপাতে যে পরিমাণ গণপরিবহন থাকার কথা তা একেবারেই নেই। অথচ যানজট সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য এবং লোকজনের যাতায়াতে পর্যাপ্ত গণপরিবহনের বিকল্প নেই। সারা বিশ্বেই গণপরিবহনের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। বাংলাদেশই কেবল ব্যতিক্রম। এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, নগরীতে ৬০ ভাগ মানুষ হেঁটে চলেন। রিকশায় চলেন ১৯ ভাগ। বাস ও অটোরিকশায় চলেন ১৬ ভাগ। আর প্রাইভেট কারে চড়েন মাত্র ৫ ভাগ। অর্থাৎ ৫ ভাগ মানুষের প্রাইভেট কারের জন্য ঢাকার যানজট তীব্র হয়ে রয়েছে এবং প্রাইভেট কারেরই অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

ঢাকা শহরের ওপর চাপ কমানোর জন্য ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ এখন অত্যন্ত জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকাকে পরিষ্কার রাখতে ঢাকা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ২০১৬ সালকে পরিচ্ছন্ন বছর হিসেবে ঘোষণা করা হলেও কোনো বাস্তবায়ন নেই।

বসবাসের একটি যোগ্য শহর হিসেবে গড়ে তুলতে সবাই মিলে ঢাকাকে নিজের ঘরের মতো সাজানোরও প্রত্যয় ব্যক্ত করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যম, সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের এক্ষেত্রে অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন। এখন আমাদের সে দিকেই মনোনিবেশ করা উচিত।

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads