• বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫
ads
জিএসপি নেই তবুও রফতানি আয় বেড়েছে

প্রায় ছয় বছর আগ থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি বন্ধ রেখেছে

আর্ট : রাকিব

মতামত

জিএসপি নেই তবুও রফতানি আয় বেড়েছে

  • আবদুল হাই রঞ্জু
  • প্রকাশিত ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮

রফতানি আয়ের প্রধান খাত এখন পোশাক শিল্প। মূলত সস্তা শ্রমের বদৌলতে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের উত্থান ঘটেছে। সত্তর আশির দশকে পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু। পোশাক শিল্পে নিয়োজিত কর্মীদের নৈপুণ্য, আন্তরিকতা ও ভালো মানের কাজের কারণেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে পোশাক শিল্প উন্নত বিশ্বের নজর কাড়ে। তর তর করে সমৃদ্ধ হতে থাকে পোশাক খাত। বিদেশি বায়ারদের চাহিদার কারণেই যত্রতত্র যেনতেনভাবে নন কমপ্লায়েন্স হিসেবে পোশাক কারখানা গড়ে ওঠায় নিয়োজিত কর্মীদের কর্মকালীন নিরাপত্তার ঘাটতি ছিল। এরই মধ্যে ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১০ শ্রমিকের মৃত্যু বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ওপর অশনিসঙ্কেত হিসেবেই দেখা দেয়। এ ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই সাভারে রানা প্লাজা ধসে প্রায় ১১০০ কর্মীর অকাল মৃত্যু ও শত শত আহত শ্রমিকের আহাজারির কারণে ক্রেতা দেশগুলো কমপ্লায়েন্সের অভিযোগ তোলে।

এরপর ২০১৩ সালে পোশাক শিল্পে নিরাপত্তাজনিত অভাব ও নন-কমপ্লায়েন্স কারখানার তৈরি পোশাক আমদানিকে নিরুৎসাহিত করতেই যুক্তরাষ্ট্র শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানি বা জিএসপি স্থগিত করে। এতে করে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মূলত বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো। যারা জিএসপি সুবিধা বহাল রেখে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোকে কমপ্লায়েন্স হিসেবে সংস্কার করতে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের মাধ্যমে তদারকি শুরু করে। টানা কয়েক বছর ধরে অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের প্রত্যক্ষ তদারকিতে দেশের পোশাক কারখানাগুলোর সংস্কার চলে। শেষ পর্যন্ত অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সের তরফে কমপ্লায়েন্স কারখানার সনদ দেওয়া হয়। এরপরও কিন্তু বাংলাদেশি পণ্য আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি পুনর্বহাল করেনি।

জিএসপি স্থগিত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য রফতানি বেড়েছে। গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশটিতে পণ্য রফতানি করে আয় হয়েছে ৫৯৮ কোটি ৩৩ লাখ মার্কিন ডলার, যা মোট রফতানি আয়ের ১৬ দশমিক ৩২ শতাংশ। একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি রফতানি আয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র থেকেই। প্রায় ছয় বছর আগ থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি বন্ধ রেখেছে। যদি জিএসপি সুবিধায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্য রফতানির সুযোগ থাকত, তাহলে রফতানি আয়ের পরিমাণ অনেক বেড়ে যেত। যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিতে প্রতিটি পণ্যে অন্তত ১৫ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হচ্ছে। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানি করছে জিএসপি সুবিধায়। এখন পোশাক খাতে বলতে গেলে কমপ্লায়েন্সের কারণে দুর্ঘটনা নেই বললেই চলে। এরপরও কোন যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য আমদানিতে জিএসপি সুবিধা বন্ধ রেখেছে, যা আমাদের বোধগম্যের বাইরে।

বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত অর্থবছরে রফতানি করে বাংলাদেশ মোট আয় করেছে ৩ হাজার ৬৬৬ কোটি ৮২ লাখ মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে রফতানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। অর্থাৎ আগের অর্থবছরের চেয়ে রফতানি আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের অর্থবছরের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য রফতানি বাবদ আয় বেড়েছে ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। মূলত বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যেসব পণ্য রফতানি হয়, তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে তৈরি পোশাক, হোম টেক্সটাইল, ক্যাপ, কাঁকড়া ও চিংড়ি জাতীয় পণ্য। গত অর্থবছরে শুধু তৈরি পোশাক রফতানি করেই দেশটি থেকে আয় এসেছে ৫৩৫ কোটি ২০ লাখ ডলার। দেশটি থেকে মোট আয়ের ৮৯ শতাংশেরও বেশি এসেছে পোশাক খাত থেকে। আর হোম টেক্সটাইল থেকে ১৮ কোটি ৭ লাখ ডলার, ক্যাপ থেকে ১২ কোটি ৬১ লাখ ডলার, কাঁকড়া ও চিংড়ি থেকে আয় হয়েছে ১ কোটি ৯৭ লাখ ডলার। গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও জার্মানি থেকে রফতানি আয় হয়েছে ৫৮৯ কোটি ৭ লাখ ডলার, যা প্রবৃদ্ধির আকারে ৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এটি মোট রফতানি আয়ের ১৬ দশমিক ০৬ শতাংশ। উল্লেখ্য, অবকাঠামোগত সমস্যা ও অব্যবস্থাপনার জন্য পণ্য রফতানিতে বিলম্ব না হলে আয়ের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পেত বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট কর্তৃপক্ষ।

অতিসম্প্রতি মিরপুরে বিআইবিএস অডিটরিয়ামে ‘ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন ইন আরএমজি বাই ব্যাংকস : রিক্্স অ্যান্ড সিটিগেশন টেকনিকস’ শীর্ষক কর্মশালায় একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ওই গবেষণায় বলা হয়, পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশ গোটা বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে। তবে অবকাঠামোগত সমস্যা ও ব্যবসায়ীদের নানা সমস্যার কারণে প্রায় ৬৫ শতাংশ রফতানি সঠিক সময়ে হয় না, যা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, রফতানি বাড়াতে হলে অবকাঠামো ও বন্দর ব্যবস্থাপনার দিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। সড়কে যানজট ও বন্দরের জটের কারণে পণ্য রফতানিতে অনেক সময় বিলম্ব হয়। এ অভিযোগটি অনেক পুরনো। তবে মহাসড়কগুলোর চার লেনের কাজ সমাপ্ত হলে যানজটের পরিমাণ কমে আসবে, তখন বন্দরের জটও অনেকাংশেই কমে আসবে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরে মোট রফতানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৪ বিলিয়ন ডলার। যদি অবকাঠামোগত সমস্যা ও বন্দর জট না থাকে, তাহলে লক্ষ্যমাত্রার পুরোটাই অর্জিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। যেহেতু দেশে গ্যাস একটি বড় ধরনের সমস্যা। এ সমস্যাকে রোধ করতে না পারলে উৎপাদনের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব হবে না। আমরা আশাবাদী, সরকার যানবাহন, বাসাবাড়িতে গ্যাসের শতভাগ ব্যবহার বন্ধ করে পোশাক কারখানাগুলোকে চালু রাখলে এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারলে অবকাঠামোগত সমস্যা অনেকাংশেই কমে আসবে। অপ্রিয় হলেও এটাই সত্য, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির মতো সেবা খাতকে উৎপাদনমুখী করতে না পারলে ব্যবসায়ীদের শত চেষ্টাতেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে না। যেহেতু আমাদের সমৃদ্ধ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান পোশাক খাতের ওপর ৮০ ভাগই নির্ভরশীল, সেহেতু শত প্রতিকূলতার মধ্যেও পোশাক খাতকে আরো সমৃদ্ধ করতে হবে। তাহলে রফতানি আয়ের ওপর আমাদের অর্থনীতির টেকসই সমৃদ্ধি অর্জন করা অনেকাংশেই সহজ হবে।

লেখক : সমাজকর্মী

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads