• বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১ আশ্বিন ১৪২৫
ads
ব্যাংকিং খাতে লাগাতার অনিয়ম : উদ্বেগে জনগণ

এখন আর ব্যাংক মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নয়

আর্ট : রাকিব

মতামত

ব্যাংকিং খাতে লাগাতার অনিয়ম : উদ্বেগে জনগণ

  • আফরোজা পারভীন
  • প্রকাশিত ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

একটা সময় ছিল যখন ব্যাংক বলতেই মানুষ বুঝত সবচেয়ে নির্ভরতার আশ্রয়। সবচেয়ে গোপন আর সংরক্ষিত জায়গা। কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আবদ্ধ। তাই মানুষ কথা গোপন রাখতে বললে বলত, ‘আরে স্বাচ্ছন্দ্যে বল, আমি বাংলাদেশ ব্যাংক।’ অর্থাৎ তোমার কথা নিরাপদে গচ্ছিত থাকবে। আর সৎ কর্মচারী বলতেও বুঝত ব্যাংক কর্মকর্তাদের। মানুষের সহানুভূতিও ছিল তাদের জন্য। আহা, সেই সাতসকালে গিয়ে গভীর রাতে ফেরে, টাকা-পয়সা মেলানোর ঝক্কি-ঝামেলা! আর জুন ক্লোজিং মানে তো ব্যাংকেই রাত কাটানো। পুলিশ, কাস্টমস, শুল্ক, ভূমি এসব চাকরি সম্পর্কে যেমন নেতিবাচক ধারণা ছিল জনগণের, তেমনি ইতিবাচক ধারণা ছিল ব্যাংকের চাকরি আর ব্যাংক কর্মকর্তাদের সম্পর্কে।

খুব দ্রুত বদলে গেল দিন। এখন আর ব্যাংক মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নয়। ব্যাংকে টাকা বা সম্পদ আমানত হিসেবে রেখে মানুষ আর আগের মতো আশঙ্কামুক্ত নয়। একের পর এক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে টলে গেছে মানুষের আস্থার জায়গাটা।

২০১৩ সালের প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারিতে পড়ে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি ব্যাংক। সরকার গঠিত পরিচালনা পর্ষদ কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়। এমনকি প্রধান কার্যালয়ের ঋণ যাচাই কমিটি বিরোধিতা করলেও পর্ষদ ঋণ অনুমোদন দিয়েছে। পর্ষদের মাত্র ১১টি সভায় ৩ হাজার ৪৯৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক তখন একটি বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছিল, ‘অধিকাংশ ঋণই গুরুতর অনিয়ম করে দেওয়া হয়েছে। এই ঋণ পরিশোধ বা আদায় হওয়ার সম্ভাবনা কম।’ খেলাপিকে ঋণ দেওয়া, সক্ষমতা যাচাই না করে ঋণ দেওয়া- এমন অনেক কুকীর্তি ঘটে এ ব্যাংকে। এই ধরনের ঋণ প্রদানের পেছনে দুর্নীতিও জড়িত ছিল বলে জানা যায়। এ বিষয়ে দুদক তদন্ত করছে।

ভুয়া নথিপত্র তৈরি করে সরকারের নগদ সহায়তা তহবিল থেকে ১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা নিয়ে অন্য একটি ব্যাংক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়। অপকর্মে সহায়তা করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিকে অর্থায়নও করে ব্যাংকটি। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকটির পাওনা ২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। বিদেশে রফতানির ১ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা আটকা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক ও সরকারের তহবিল থেকে পাঁচ বছরে নিয়েছে ৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া দরকার ছিল। আগের অপকর্মগুলোর বিচার না হওয়ায় এ ঘটনা ঘটেছে। এটা বিচারহীনতার সংস্কৃতি।’

অন্যদিকে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে হলমার্ক নামের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একটি ব্যাংক থেকে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়ার ঘটনা সবার জানা। ২০১৩ সালে পাঁচটি ব্যাংক থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় বিসমিল্লাহ গ্রুপ। সর্বশেষ একটি ব্যাংকের ঋণ বিতরণে অনিয়ম, জালিয়াতি ও লুটপাট অতীতের যেকোনো ব্যাংক কেলেঙ্কারিকে ছাড়িয়ে যায়। এসব করেই ক্ষান্ত হননি ওই ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যান। গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে পে-অর্ডারের মাধ্যমে নিজেদের অ্যাকাউন্টে টাকা সরিয়ে নেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধ করতেও তারা পিছপা হননি।

আমানতকারীদের অর্থ লোপাটের তদন্ত করতে গিয়ে জঘন্য অপরাধটি খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাই তাদের প্রতিবেদনে চেয়ারম্যান ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যানের নৈতিক স্খলন ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে অবৈধ নিয়োগ বাণিজ্য, ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও ঋণ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার। এসব করার জন্য পরিচালনা পর্ষদের কেউ কেউ সরাসরি ঋণ গ্রহীতাদের কাছ থেকে কমিশনও নিয়েছে। দুদক তদন্ত করছে। কয়েকজন কারাগারেও গেছেন।

দেশের আরেকটি চাঞ্চল্যকর খবর, ডিজিটাল চুরির মাধ্যমে অপরাধীচক্রের বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১০১ মিলিয়ন ডলার উধাও করে দেওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ দেশের বাইরে থেকে অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা হ্যাক করেছে। বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তারা এ ক্ষতির জন্য ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংককে দায়ী করেছে। এই ব্যাংক হ্যাকিংয়ের ঘটনায় ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক বলেছে, ‘তাদের ওখান থেকে হ্যাকিং হয়েছে এর কোনো প্রমাণ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ বিষয়ে খবর জানার পরই তারা সাধারণ নিয়ম পালন করেছে।’

এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এক বছরের অধিক সময় ধরে প্রস্তুতি নিয়ে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। চুরি যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে ফেরত আনা গেছে মাত্র দেড় কোটি ডলার। অন্য অর্থ ফেরত আনা নিয়ে জটিলতা আছে। ফিলিপাইনের ব্যাংক আরসিবিসি ইতোমধ্যে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘অর্থ ফেরৎ দেওয়ার পরিকল্পনা তাদের নেই।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমান এ ঘটনায় পদত্যাগও করেছেন।

এটিএম কার্ড জালিয়াতি জন্ম দিয়েছে আরেক আলোচিত ঘটনার। এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক জার্মানির নাগরিক পিওতর সিজোফেন (ছদ্মনাম থমাস পিটার) এ বিষয়ে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তার ভাষ্য মতে, ঘটনায় জড়িত আছে প্রাইভেট এজেন্ট, হোটেল ব্যবসায়ী, ব্যাংকের কার্ডশাখার কর্মী ও পুলিশ। তিনি বলেছেন, তাদের চক্রটি স্কিইং ডিভাইস নামে এক মেশিনের মাধ্যমে গ্রাহকদের কার্ডের ব্যক্তিগত তথ্য চুরির মাধ্যমে ক্লোন করে টাকা তুলে নেয়। এ জাল এখন এতটাই বিস্তৃত যে, এ বছরের মার্চ মাসেও একই পদ্ধতিতে বেশ কয়েকটি ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ শোনা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত সোনা মিশ্র ধাতুতে রূপান্তরিত হওয়ার ঘটনা। ঘটনাটি কতটা সত্য আমাদের জানা নেই। প্রথমে একটি জাতীয় দৈনিকে খবরটি প্রকাশিত হয়। তারপর বিএনপি নেতারা দাবি করেন, ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত ৯৬৩ কেজি ২২ ক্যারেটের সোনা ১৮ ক্যারেটের মিশ্র ধাতুর চাকতি হয়ে গেছে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অন্যদিকে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, ‘অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয়। সোনা ঠিকই আছে, ঘরেই আছে।’

ব্যাংক অর্থনীতির চালিকাশক্তি আর গ্রাহক হচ্ছে তার প্রাণ। সেই গ্রাহকরা পদে পদে হচ্ছেন বিড়ম্বনার শিকার। আজকাল রাস্তার মোড়ে মোড়ে ব্যাংকের শাখা। গ্রাহক সেবার কথা মাথায় রেখে হয়ত ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এই উদ্যোগ নিয়েছে। ফলে একের পর এক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনাও বেড়েছে। ঘটনা ঘটার পর কয়েক দিন জোরালোভাবে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়, তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়, মামলা হয়। তারপর বিষয়টি থিতিয়ে যায়। এর কিছুদিন পর নতুন আরেকটি ঘটনায় আগের ঘটনা মানুষ ভুলে যাচ্ছে।

এ ব্যবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। আমানতকারীদের খোয়া যাওয়া টাকা ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ কমিশন, আর্থিক বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ও আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিকল্প নেই। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার জন্য সাহায্য নিতে হবে আন্তর্জাতিক আদালতের। ব্যাংকের প্রতি জনগণের সেই পূর্বের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। আর সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে লেখাপড়া জানা, সৎ মানুষদের মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে হবে। পরিচালক বা ব্যাংক কর্মকর্তার আত্মীয় বলেই যেন কোটার ভিত্তিতে কেউ নিয়োগ না পায় বেসরকারি ব্যাংকে। ব্যাংকিং জানা দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের হাতে দিতে হবে ব্যাংক পরিচালনার ভার। কর্মকর্তাদের হতে হবে বিনয়ী, গণমুখী। হাসিমুখে ধৈর্যশীল হয়ে কথা বলবেন তারা। যাতে মানুষ তাদের দেখে, তাদের কথা শুনে সহজে তাদের ওপর আস্থা রেখে নিজের আমানত গচ্ছিত রাখতে পারেন।

ঋণ প্রদান করতে হবে যথাযথ নিয়ম মেনে, নিয়ম মেনেই ঋণ রিকভারির ব্যবস্থা করতে হবে। বিগশট বা চেনাজানা লোক বলে যেন ঋণ অনাদায়ী না থাকে। ঋণ আদায় হবে, সেই আদায়ী ঋণ পুনরায় বিতরণ হবে। মানুষের কাজে লাগবে সেই ঋণ। এভাবে ঘুরবে অর্থনীতির চাকা। এজন্য থাকতে হবে যথাযথ মনিটরিং সিস্টেম। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে হতে হবে সৎ, নিরপেক্ষ ও দক্ষ এবং সর্বপ্রকার দুর্নীতিমুক্ত।

কোনো ঘটনা ঘটার পর পরই তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তদন্ত কমিটিকে যথাসময়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। আর সেই প্রতিবেদনের বাস্তবায়নও যেন হয় এবং জনগণ যেন সেটা জানতে পারে সেদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। আমার বিশ্বাস, এ ব্যবস্থাগুলো নিতে পারলে লাগাতার ব্যাংক কেলঙ্কারির আস্তে আস্তে অবসান হবে। ব্যাংকের প্রতি জনগণের সেই পূর্বের আস্থা আবার ফিরে আসবে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক, সাবেক যুগ্ম সচিব

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads