• বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads
সাংস্কৃতিক আয়োজনে দৈন্য

আমরা কী দেখব তা আমাদের নিজেদেরই ঠিক করে নিতে হয়

আর্ট : রাকিব

মতামত

সাংস্কৃতিক আয়োজনে দৈন্য

  • মামুন রশীদ
  • প্রকাশিত ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ঈদেই টানা তিন দিন ছুটি পাওয়া যায়। সংবাদপত্রে এত দীর্ঘ ছুটি আর নেই। ছুটির সময়টা ঘরে অলস বসে থাকতেই ভালো লাগে। ছুটি মানে ছুটিই। টানা ঘুম, ঘরের ভেতরে থাকা। বাইরের সঙ্গে সংযোগ নেই। ঘুমের বাইরে ঘরে থাকার এই সময় কাজে লাগানোর একমাত্র মাধ্যম ঘরোয়া বিনোদন। স্বজনদের সঙ্গে আড্ডার বাইরে এই বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম টেলিভিশন। মানুষকে ধরে রাখতে এই জাদুর বাক্সের জুড়ি নেই। স্বাভাবিকভাবে আমার চোখও জাদুর বাক্সের দিকেই ছিল। অন্য সময় টিভিপর্দায় চোখ রাখা হয় না। যাদের ঘরে স্কুল যাবে যাবে করছে এমন শিশু রয়েছে, তাদের জন্য আয়েশ করে টিভিপর্দায় চোখ রাখা কষ্টকর। কারণ, সারাক্ষণ পর্দা দখল করে থাকে সিএন, নিক, সনি আট অথবা দুরন্ত। নিজের ইচ্ছের এখানে দাম নেই। শিশুর ইচ্ছেকেই প্রাধান্য দিতে হয়। আমরা বাবা-মায়েরা সন্তানকে ব্যস্ত রাখতে, নিজেদের কাজগুলো স্বাচ্ছন্দ্যে করার প্রয়োজন থেকেই শিশুর চোখে ধরিয়ে দিই জাদুর বাক্সের রহস্য। আর সেই রহস্যে যখন তারা অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, তখন আমাদের আর চোখ রাখার সুযোগ থাকে না।

আমরা কী দেখব তা আমাদের নিজেদেরই ঠিক করে নিতে হয়। সেই সঙ্গে বেড়ে উঠছে যে শিশু তার রুচি তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্বও আমাদেরই। অথচ নিজেদের সুবিধার্থে আমরাই তাদের হাতে তুলে দেই রিমোট কন্ট্রোল। ফলে শিশু তার রুচিকেই প্রাধান্য দেয়। তখন আর বাবা-মায়ের করার কিছুই থাকে না। শিশুর রুচিই তখন আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে। এক্ষেত্রে আমার ঘরেও ব্যতিক্রম নয়। আমার সাত বছরের ছেলে নক্ষত্রই তার দখলে রাখে রিমোট। গল্পে গল্পে একদিন বলেছিলাম, ইংরেজি ভাষায় দখল থাকবে যার, তার পায়ের কাছে থাকবে পুরো পৃথিবী। সেই থেকে অবশ্য আগে উল্লেখ করা চ্যানেলগুলোর সঙ্গে যোগ হয়েছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, ডিসকভারি, স্টার মুভিজ, এইচবিওর মতো চ্যানেল। মাঝেমধ্যে সেখানেও ঢু মারে, কোনো সিনেমা পছন্দ হলে, আমারও ডাক পড়ে দেখার জন্য। ঈদের ছুটিতে যেহেতু ঢাকার বাইরে, আমার বাবা-মায়ের সঙ্গে। তাই টিভি রিমোটের দিকে কোনো আগ্রহ ছিল না পুত্রের। আমিও অলস সময় ঈদের অনুষ্ঠান দেখে কাটানোর সুযোগ পেয়ে গেলাম।

কিন্তু, কী দেখব? প্রায় দুই ডজন দেশীয় চ্যানেল। রিমোটের বোতাম টিপে টিপে একটি থেকে অন্যটি ঘুরতে লাগলাম। কোথাও বিজ্ঞাপন চলছে তো চলছেই, কোথাও ঈদের সাত দিনব্যাপী ধারাবাহিক নাটক। বিশ-পঁচিশ মিনিটের একটি এপিসোড দেখতে যে পরিমাণ ধৈর্য দরকার, তা মেলানো কঠিন। বিনোদন অনুষ্ঠানের নামে যা পর্দা জুড়ে ছিল, তা দেখার মতো উন্নত মন তৈরি করতে না পারার ব্যর্থতা আমাকেই পীড়া দিয়েছে। ঈদের তিন দিন ঘুরেফিরে, শেষ অবধি পাশের দেশের চ্যানেলের দিকেই চোখ গেছে। বারোয়ারি সিরিয়াল দেখানো চ্যানেলগুলো নয়, সেখানে এমন কিছু চ্যানেল রয়েছে, এমন কিছু অনুষ্ঠান দেখানো হয়— যাকে বিনোদন হিসেবে নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়া যায়। আমরা বরাবরই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মীরা বার বারই বলে আসছে বিদেশি চ্যানেলের বিরুদ্ধে। পারিবারিক সংস্কৃতি নিয়ে যেসব ধারাবাহিক কোনো কোনো চ্যানেলে প্রদর্শন করা হয়, তার বিরুদ্ধে হরহামেশাই কথা শোনা যায়। তা নিয়ে আছে নানান রঙ্গ-তামাশাও। তারপরও তো আমাদের চোখ ঘুরেফিরে সেসব ধারাবাহিকেই। এর উত্তর কি আমাদের টিভি অনুষ্ঠান নির্মাতারা ভেবে দেখেছেন? সারা দিন কাজের শেষে রাতে বাড়ি ফিরে মধ্যবিত্ত জীবনে বিনোদন বলতে তো ওই জাদুর বাক্সই। সেখানে কি আমাদের মতো মধ্যবিত্তের রুচির সঙ্গে তাল মেলানো কোনো অনুষ্ঠান রয়েছে? দর্শক ধরে রাখার মতো কোনো অনুষ্ঠান কি নির্মাণ হচ্ছে? প্রতিটি চ্যানেলেই একটি সময়ের পরেই শুরু হয়ে যায় টকশো। টকশো তো বিনোদন নয়, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের জন্য। রাজনীতি বিষয়ে আগ্রহী এই শ্রেণির মানুষের বাইরেও অসংখ্য দর্শক রয়েছে, সেই দর্শকদের চোখ পর্দায় ধরে রাখার জন্য আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর উদ্যোগ কী— আমার জানা নেই।

প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, শুধু টেলিভিশনের অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেই নয়, আমাদের পুরো সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেই শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। ঈদের ছুটিতে আগে গ্রামে গেলে নাটক দেখা হতো। গ্রামের ছেলেমেয়েরাই অভিনয় করত সেই নাটকে। অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি থাকত, গ্রামেরই কেউ একজন লিখত সেই নাটক। তারপর অনুশীলন শেষে অপেক্ষা, কবে ঈদের ছুটি হবে? গ্রাম থেকে শহরে যাওয়া ভাই-বোনেরা কখন আসবে? তাদের সামনে অভিনীত হবে সেই নাটক। এখন হয়তো দুই-একটা গ্রামে এ রকমটা হয়, কিন্তু সেই ধারাবাহিকতা সবখানে যে নেই তা আর বলে দিতে হবে না। একইভাবে এই নব্বইয়ের দশকেও আমাদের শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে যে সাংস্কৃতিক গতিধারা ছিল, তার লেশমাত্রই নেই। এই শতাব্দীর শুরুর দশকেও আমাদের প্রায় প্রতিটি জেলা শহরে লিটল ম্যাগাজিনের চর্চা ছিল। আজ তা নেই। সারা বছরই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশ হতো। এখন শুধু বইমেলাকে ঘিরে প্রকাশ হয় লিটল ম্যাগাজিন। কিন্তু ম্যাগাজিনের সেই বারুদ ভাব আর নেই। ‘সমাজতান্ত্রিক দেশে শিল্পের মালিকানা জাতির অথবা রাষ্ট্রের’ হলেও গণতান্ত্রিক দেশে তা নয়, আমাদের দেশেও নয়। সংস্কৃতিকে আমরা জনগণের সম্পদই মনে করি। অথচ তারপরও আমরা প্রতি পদে পিছিয়ে যাচ্ছি? বয়স বাড়লে পেছনের পথকেই মধুর মনে হয়, সামনের যা কিছু তার সবই অন্ধকার। সেই ভাবনাই আমাকে ঘিরে ধরছে? তবে যেভাবেই দেখি বা বলি না কেন, ছুটির তিন দিনে টেলিভিশনের অনুষ্ঠানমালা আমার সব আগ্রহকে হতাশ করেছে। একসময় প্রায় প্রতিটি দৈনিকেই টিভি সমালোচনা বিভাগ ছিল, আলাদা করে ম্যাগাজিনও ছিল, ছিল টিভি গাইডও। কিন্তু তারও চল উঠে গেছে বলা যায়। ফলে আমরা সাধারণ দর্শক বঞ্চিত হচ্ছি, আর সেই ফাঁকে ঢুকে পড়ছে বিদেশি চ্যানেল। শিশুদের জন্য আমাদের দেশের একমাত্র চ্যানেল দুরন্ত। অন্যের ঘরের কথা না বলে আমার ঘরের কথাই বলি। আমার ছেলে প্রথম দিকে যেভাবে দুরন্তের অনুষ্ঠান দেখার জন্য উন্মুখ ছিল, এখন তা নেই। এখন দুরন্ত ওকে টানে না। ডাবিং করা অনুষ্ঠানগুলোর বাইরে নিজস্ব যে অনুষ্ঠান তার দিকে সে ফিরেও তাকায় না। এটা কি আমার আর আমার ছেলের ব্যর্থতা? আমাদের রুচির নিম্নগতি? নাকি পুরো টেলিভিশনের অনুষ্ঠান ব্যবস্থার ত্রুটি? তবে এত এত গুণীর ভিড়ে, স্বাভাবিকভাবেই ভাবতে এবং বলতে বাধ্য— আমার আর আমার পুত্রেরই রুচির নিম্নগতি। কিন্তু আমরা এ থেকে উতরাব কী করে?

লেখক : সাংবাদিক, কবি

mamun_rashid3000@yahoo.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads