• মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৩ আশ্বিন ১৪২৫
ads
সুপেয় পানির আধারকে বাঁচাতে হবে

প্রতীকী ছবি

মতামত

সুপেয় পানির আধারকে বাঁচাতে হবে

  • আবদুল হাই রঞ্জু
  • প্রকাশিত ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক সুপেয় পানি। সেই সুপেয় পানির আধারগুলো ক্রমান্বয়েই সঙ্কুচিত হচ্ছে। অথচ জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সুপেয় পানির চাহিদা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। আমরা জানি, পৃথিবীর তিন-পঞ্চমাংশ পানির মধ্যে মিষ্টি পানির পরিমাণ মাত্র ৩ শতাংশ, বাকি ৯৭ শতাংশ পানি সমুদ্রের, যা লবণাক্ত। এমনকি মিষ্টি পানির চক্র আবহাওয়ার স্বাভাবিক প্রকৃতি ঠিক রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পানি থেকে বরফ, মেঘ, আবার মেঘ থেকে বৃষ্টি এবং বরফ গলে পানির উৎপত্তি- এভাবেই পানি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার গতিপ্রবাহকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সহায়তা দিচ্ছে। অথচ সেই পানির অপচয় কিংবা মনুষ্যসৃষ্ট নানা সঙ্কটে পড়ে পানি মানুষের জীবনহানিরও কারণ হচ্ছে।

পানির আধার বলতে আমরা বুঝি, নদ-নদীর পানি, বৃষ্টির পানি এবং ভূগর্ভস্থ পানি। বলতে গেলে দেশের ছোট-বড় নদ-নদীগুলো প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানির অভাবে শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। এমনকি মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে পানির স্তর হু-হু করে নিচে নেমে যাচ্ছে। পানির স্তর নেমে যাওয়ার ফলে পানিতে আর্সেনিকের মাত্রাও বাড়ছে। এর ওপর আবার নগর মহানগরকে ঘিরে থাকা নদ-নদীগুলো কারখানার বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, এমনকি ময়লা আবর্জনা ফেলার ভাগাড়ে পরিণত করা হয়েছে। ফলে নদ-নদীর স্বাভাবিক পানির রঙ বদলে গেছে। এখন সেসব পানি বর্জ্যের রঙ ধারণ করেছে। যে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগকে বলা হতো রাজধানী ঢাকার প্রাণ, সেই নদীগুলো মনুষ্যসৃষ্ট দখল দূষণের কবলে হারিয়ে ফেলেছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। ফলে বর্জ্য ও আবর্জনার দুর্গন্ধে এখন এসব নদীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকাও কঠিন হয়ে পড়েছে। পানি বিশেষজ্ঞদের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, কতিপয় শিল্প মালিক ‘বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি’ বন্ধ রেখে সিসা ও ক্রোমিয়াম মিশ্রিত শিল্পের বিষাক্ত কেমিক্যাল ধরে রাখায় তা ধীরে ধীরে জমা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানির জলাধারে।

পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর চারপাশে থাকা নদীগুলো ৬২ ধরনের রাসায়নিক বর্জ্যে মিশে বিষাক্ত জলাধারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে একসময় হাজারীবাগের দেড় শতাধিক ট্যানারি থেকে প্রতিদিন গড়ে ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গায় নির্গত হয়েছিল। বর্তমানে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্পগুলো সাভারে স্থানান্তরিত হওয়ায় বুড়িগঙ্গার ট্যানারি দূষণ কমলেও এখন সাভারের পাশ ঘেঁষা নদীও দূষণের কবলে পড়ে স্বাভাবিক পানি বিষাক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ শুধু ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর করলেই হবে না, বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে চালু করতে হবে। তা না হলে প্রতিনিয়তই পানিতে বর্জ্য ফেলা হবে এবং যে কারণেই পানি দূষিত হবে। শুধু ট্যানারি শিল্প কিংবা কলকারখানার বর্জ্যই যে নদীতে পড়ছে তা নয়।

পরিবেশ অধিদফতরের মতে, স্যুয়ারেজ লাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন নগরবাসীর ত্যাগ করা ১৩ লাখ ঘনমিটার বর্জ্য আশপাশের নদীতে গিয়ে পড়ছে। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের মধ্যে পাগলায় ওয়াসার বর্জ্য শোধনাগারে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য শোধন হলেও অবশিষ্ট বর্জ্যের স্থান নদ-নদীর খোলা জায়গায়।

শুধু ট্যানারি শিল্পের বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, পোশাক শিল্পের তরল বর্জ্যই জীবন-জীবিকার জন্য হুমকি নয়, এর সঙ্গে নিকট ভবিষ্যতে যোগ হবে দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্রের লোনা পানি। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বঙ্গোপসাগরের পানির গড় উচ্চতার তুলনায় ১৫০ থেকে ১৬০ ফুট নিচে নেমে গেছে। যে কারণে সমুদ্রের লোনা পানি ক্রমান্বয়েই উত্তরাঞ্চলের দিকে অগ্রসর হয়ে ঢাকা শহর এবং এর পাশের অঞ্চলের জলাধারের মিষ্টি পানিকে খাওয়ার অযোগ্য করে তুলতে পারে। ‘দি প্রোগ্রাম অব ফোরকাস্টিং স্যালাইন ওয়াটার ইরিগেশন এবং ইরিগেশন ওয়াটার কোয়ালিটি অ্যান্ড ওয়াটারলগিং ইন সাউদার্ন এরিয়া’ প্রকল্পের আওতায় পরিবেশ আন্দোলন বাপা ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন-২০১৩ সালের পৃথক জরিপে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। এ সম্পর্কিত রিপোর্টের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বাপার পানি ও পরিবেশ প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইফতেখার আলম জানিয়েছিলেন, ২০১০ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করায় ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার পানির স্তর সমুদ্রের গড় উচ্চতা থেকে ১৫০ থেকে ১৭০ ফুট নিচে অবস্থান করছে। এভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন অব্যাহত থাকলে আগামী ২০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ঢাকার ভূ-অভ্যন্তর সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে পূর্ণ হবে। যদিও বিএডিসি মাত্র এক থেকে দেড় দশকের মধ্যে ঢাকা শহরের ভূগর্ভস্থ ফাঁকা জায়গা লবণাক্ত পানিতে পূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা করেছিল। উল্লেখিত জরিপে সময়ের তারতম্য নিয়ে বিতর্ক না করে সহজভাবেই বলা যায়, এখনই সতর্কতা অবলম্বন না করলে সাগরের লোনা পানি ঢাকার অভ্যন্তরে ঢুকে যাবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ কারণে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন কমিয়ে এনে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের দিকেই আমাদের এগোতে হবে। এ জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নদ-নদীর পানি পরিশোধন করে পানের উপযোগী করে তুলতে হবে। তা না হলে মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক সুপেয় পানির আধারকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।

সুপেয় পানির সঙ্কট শুধু বাংলাদেশেই নয়, এ সঙ্কট নিয়ে হাহাকার গোটা বিশ্বেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের ২০০৮ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বে প্রায় ৩০০ কোটির অধিক মানুষ সুপেয় পানির সঙ্কটে পড়তে পারে। এ প্রসঙ্গে এশিয়ান ওয়াটার ডেভেলপমেন্ট আউটলুক-২০১৩-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়ার ৪৯টি দেশের পানি নিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে অবস্থানকারী ৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। মূলত বাংলাদেশে পানি খাতের সঙ্গে যে ১৩টি মন্ত্রণালয় যুক্ত, তার মধ্যে অধিকাংশ মন্ত্রণালয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে ঘুষ, দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাবে মাশুল দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা (সূত্র : দৈনিক আমাদের সময়, তাং- ২২/৩/২০১৬ইং)। চলতি বছরের ১৯ মার্চ ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় অষ্টম বিশ্ব পানি সম্মেলনে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থার (ইউনেস্কো) ২০১৮ সালের বিশ্ব পানি উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে বিশ্বে ৩৬০ কোটি মানুষ পানি সঙ্কটে রয়েছে। পানির ব্যবহার এভাবে বাড়তে থাকলে আগামী ২০৫০ সালে ৫৭০ কোটি মানুষ পানি সঙ্কটে পড়বে বলেও মন্তব্য করা হয়।

মোদ্দা কথা, যেহেতু মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক পানি, সেহেতু সুপেয় পানি প্রাপ্তিকে নিশ্চিত করতে হলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনতে হবে এবং ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহারকে বাড়াতে হবে। পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে না পারলে সুপেয় পানির আধারকে বাঁচানো সম্ভব হবে না।

 

লেখক : সমাজকর্মী

 

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads