• বুধবার, ২৭ মার্চ ২০১৯, ১৩ চৈত্র ১৪২৪
ads

মতামত

মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না

  • মোহাম্মদ আবু নোমান
  • প্রকাশিত ০৯ জানুয়ারি ২০১৯

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অমূল্য বাণী ছিল— ‘বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র হয় না’ এবং বঙ্গবন্ধুর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ উক্তি, যা পৃথিবীর সমস্ত মানুষের জন্য চিরদিনের অনুপ্রেরণার বিষয়, তা হলো— ‘মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না।’ শেখ হাসিনা চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচনই হয় কোনো-না-কোনো দিক থেকে ব্যতিক্রমী। এবারের নির্বাচনটি সেদিক থেকে অধিকতর ব্যতিক্রমী। এই নির্বাচনে প্রায় সব দলই অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু এই অংশগ্রহণ একেবারে মুক্ত ও অবাধ ছিল না। এবার মূলত সংসদে কার্যকর বিরোধী দল থাকছে না।

সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারি দলের সঙ্গে একটা শক্তিশালী বিরোধী দল থাকে, সেটা এবার হয়নি। গণতন্ত্র থাকতে হলে অবশ্যই বিরোধী দল থাকতে হবে, বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা সম্ভব নয়। সরকার উন্নয়ন কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্রকে নয়। একটি দলের টিকে থাকার মানদণ্ড হচ্ছে জনভিত্তি, শুধু আয়োজনে সাজানো নির্বাচন বা ক্ষমতায় থাকাই বড় কথা নয়।

ইতোমধ্যে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, জাতীয় পার্টিই হতে যাচ্ছে প্রধান বিরোধী দল। দলের কোনো সদস্য মন্ত্রী হবেন না। বিরোধীদলীয় নেতা হবেন দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। নির্বাচনের পর গত কয়েক দিন ধরে এই ইস্যুটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ছিল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে রয়েছে জাতীয় পার্টি। ফলে দলটি সরকারে না বিরোধী দলে থাকবে তা নিয়ে ছিল আলোচনা। আর এখন এরশাদ সাহেব উপ-প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদা দাবি করছেন। ফলে এ দলটির প্রতি জনআস্থা যে একেবারেই নেই তা বার বার প্রমাণিত হয়েছে।

এদেশের বিচিত্র রাজনীতির কুটিল ও সুবিধাবাদী দলের মহাসমারোহ আমরা নির্বাচনের আগে থেকেই দেখছি! একথাও ঠিক যে, বর্তমান সংসদ থেকে ‘মাইনাস’ বিএনপির করুণ পরিণতির কারণেই আজ জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দল। একই সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচন করেও জাতীয় পার্টি বিরোধী দলে! যাকে বলা যায় ‘সরকারি বিরোধী দল’! বিশ্বকে তা সাফল্যের সঙ্গে ‘কাগজে কলমে’ স্বীকৃতির মাধ্যমে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি! আবার সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল থেকেই কী লাভ! কেননা গত চার দশকে এ দেশে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া, এই দুজন নেতার শাসন আর শোষণ যা-ই বলা হোক, সবটাই ছিল রূপকথার মতো। বিশেষ পরিস্থিতি ও বিয়োগান্ত ইতিহাস ধারণ করে, নেতৃত্বের সঙ্কট ও শূন্যতা তৈরি হওয়ায় নিয়তিই তাদের টেনে এনেছিল রাজনীতির পথে। রাজনীতিতে তারা ছিলেন পরস্পর অমিত্র, বিদ্বেষপরায়ণ, প্রধান প্রতিপক্ষ বললেও কম বলা হবে। যার দৃষ্টান্ত পৃৃথিবীর কোথাও নেই। রাজনীতিতে এ দু’দলের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণেই দেশব্যাপী তৈরি হয়েছে বিভেদের এক অলঙ্ঘনীয় শিল-পর্বত। যার বাস্তব উদাহরণ নির্বাচনের পরপর নোয়াখালীর সুবর্ণচর এলাকায় চার সন্তানের জননীকে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কারণে গণধর্ষণ করা।

ক্ষমতা অর্জন এবং ক্ষমতায় টিকে থাকা অবশ্যই যুদ্ধ। তবে মনে রাখতে হবে তা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ নয়- সুকৌশলের যুদ্ধ, কুকৌশলের নয়। যেনতেনভাবে ক্ষমতায় থেকে চাটুকারদের বাহবা পেলেও মানুষের ভালোবাসা পাওয়া যায় না, ইতিহাস তার আপন মনেই আবার ঘুরে যায়। দেশব্যাপী আওয়ামী লীগ যে উন্নয়ন করেছে, বর্তমানে যে উন্নয়নের ধারা চলমান রয়েছে, এসব জনবান্ধব কর্মকাণ্ডকে সামনে তুলে ধরে, রাজনৈতিক কলাকৌশল অবলম্বন করে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে, জনগণের ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা ঠিক রেখে, যদি বিরোধী দলকে কোণঠাসা করা যেত তাহলে সেটা হতো ক্ষমতাসীনদের সক্ষমতার প্রতিশোধ। প্রকৃতপক্ষে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এমন দুটি দল, যারা কোনো শক্ত বিরোধী পক্ষ বা বিরোধী দল রাখার পক্ষে নারাজ। তবে রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু না থাকলেও দুর্দিন বলে যে কিছু আছে তা সব দলকেই মনে রাখতে হবে।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে, ২৬ অক্টোবর ২০১৩ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়াকে ফোন করে ২৮ তারিখ গণভবনে আসার জন্য দাওয়াত দেন। উদ্দেশ্য, একসঙ্গে বসে কথাবার্তা বলা ও রাতের খাবার খাওয়া। ওই সময় বিএনপির নেতৃত্বে ১৮-দলীয় জোট ৩ দিনব্যাপী হরতাল ডেকেছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বেগম জিয়ার ৩৭ মিনিট কথা হয়েছিল। ফোনে খালেদা জিয়া নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি করেছিলেন। আর শেখ হাসিনা সর্বদলীয় সরকার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া মানেননি।

আওয়ামী লীগ সরকার যদি এখন কাজ করতে চায়, তাহলে অনেক কাজ করতে পারে। তাদের ইশতেহারে অনেক ভালো ভালো লক্ষ্যের কথা বলা আছে। এখন সেগুলো বাস্তবায়নের দিকে তারা মন দিতে পারে। যদি সেটা তারা করে তো খুবই ভালো কথা। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে দেশের কিছু অর্থনীতিবিদের দ্বিমত আছে। এখন তারা যদি ভিন্নমতকে বিবেচনা করে, গ্রহণ করে সেটা আরো ভালো। ক্ষমতাসীনরা যেন নির্বাচনী ইশতেহারটা ভুলে না যায়। ইশতেহারে আছে, ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চেতনাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হবে এবং সংবিধান হবে রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ দলিল। আইনের শাসনের মূল বক্তব্যই হচ্ছে আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান; কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংরক্ষণ ও মর্যাদা সমুন্নত রাখা হবে। সর্বজনীন মানবাধিকার সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে কোনো প্রচেষ্টা প্রতিহত করার ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা হবে।’

একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা থেকেই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি তোলা হয়েছিল একসময়। এই দাবি নিয়ে আন্দোলনের সামনের কাতারে ছিল আওয়ামী লীগ। আবার আওয়ামী লীগের হাত দিয়েই বাতিল হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। একটি গণতান্ত্রিক দেশ প্রশাসনের ওপর ভর করে দমন-নিপীড়ন মামলা-হামলা দিয়ে কখনোই সঠিক পথে এগোতে পারে না। তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া, ইরাক ও লিবিয়া।

পঁচাত্তরের পর আওয়ামী লীগের অবস্থাও খুব খারাপ ছিল। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, সাহস, বুদ্ধিমত্তা, কৌশল সবকিছুকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগ আজকের এই অবস্থানে এসেছে। একটা ব্যাপার আমাদের সবারই মনে রাখা উচিত, স্বাধীনতা আমরা এমনিতেই পাইনি— অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা, লাঞ্ছনা-বঞ্চনা, শোষণ-শাসন, নিপীড়ন, গণহত্যার মধ্য দিয়ে পেয়েছি।

রাজনীতি প্রজ্ঞা ও বুদ্ধির খেলা। রাজনীতির মাঠে বিএনপিও একটি শক্তিশালী দল ছিল। ক্ষমতায় থাকাকালীন জনগণের যতদূর না সেবা করেছে, তার চেয়ে নিজেদের শক্তি অপচয় করেছে বিরোধী দলকে ঘায়েল করতে। তখন হয়তো তারা ভাবতেও পারেনি বর্তমানের মতো সময় তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আজ গ্রেনেড, গুলি, কামান ছাড়াই বিএনপির ওপর মহা-সুনামি বয়ে গেল। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সূক্ষ্ম না স্থূল কারচুপি হয়েছে— এ নিয়ে আলোচনা চলছে, চলবে। বাস্তবতা হলো, বিএনপি রাজনৈতিক দল হিসেবে একেবারেই খাদের কিনারায় চলে গেছে। আর আওয়ামী লীগের সামনে রয়েছে সুন্দর সময়, যদি তারা তাকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে পারে।

 

লেখক : সাংবাদিক

ধনঁহড়সধহ১৯৭২—মসধরষ.পড়স

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads