• বুধবার, ২৭ মার্চ ২০১৯, ১৩ চৈত্র ১৪২৪
ads
ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে এলেন বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

সংরক্ষিত ছবি

মতামত

ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে এলেন বঙ্গবন্ধু

  • এ এইচ এম ফিরোজ আলী
  • প্রকাশিত ১০ জানুয়ারি ২০১৯

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্ব ও অহংকার। স্বাধীনতা আমাদের অমূল্য সম্পদ। আর এই স্বাধীনতার মহানায়ক ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। তিনি ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে আসেন তাঁর স্বাধীন বাংলাদেশে। এ কারণেই এই দিনটি বাঙালির জাতীয় জীবনে আরেকটি ঐতিহাসিক দিন। আমাদের বিজয়ের পূর্ণতা অর্জনের দিন। স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসের শেষ অধ্যায়টি ছিল বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। তিনি ফিরে না এলে স্বাধীনতার ইতিহাস হয়তো অসম্পূর্ণ থেকে যেত। জাতি আজ যথাযোগ্য মর্যাদা ও আনন্দ-উল্লাসে দিনটি উদযাপন করবে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পাকিস্তানে। দীর্ঘ নয় মাস চৌদ্দ দিন পাকিস্তানের কারাগারে অন্ধকার প্রকোষ্ঠের নারকীয় বন্দিদশা থেকে ৮ জানুয়ারি মুক্তি পেয়ে লন্ডন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু।

কারাবাসকালে বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন তাঁর বিচারের প্রহসন মৃত্যুদণ্ড। মিয়াওয়ালী কারাগার থেকে তার কবর খোঁড়ার ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছিলেন। জেলে থেকেই জেলের ডিআইজি শেখ আবদুর রশিদের সঙ্গে হূদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। পাকিস্তানের পরাজিত জেনারেল নিয়াজির বাড়িও ছিল মিয়াওয়ালীতে। পাকিস্তানের পরাজয়ের কোনো হিংসাত্মক প্রতিক্রিয়া মিয়াওয়ালী জেলে যদি ঘটে, সেই ভয়ে শেখ রশিদ বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে নিয়ে যান তার বাসস্থানে। কিছুদিন পর ইয়াহিয়াকে সরিয়ে পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। তার আদেশেই বঙ্গবন্ধু অন্তরীণ অবস্থায় স্থানান্তরিত হলেন রাওয়ালপিন্ডির অদূরে সিহালা অতিথি ভবনে। ২৭ ডিসেম্বর সেখানে সাক্ষাৎ করেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ভুট্টোর জেলে বন্দি বঙ্গবন্ধু। সিহালা অতিথি ভবনে ছিল বেতার যন্ত্র। রেডিওতে বঙ্গবন্ধু আগেই শুনেছেন পাকিস্তানি ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দির কথা। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছেন তিনি বন্দি হলেও তার বাঙালি বিজয়ী। তাই ভুট্টোর কাছে তার মুক্তি দাবি করলেন। ভুট্টোর উত্তর, আরো কিছুদিন আমাকে সময় দিন। তখন বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারলেন ভুট্টো তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য। ৭ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে নিকটবর্তী অতিথিশালায় নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান বঙ্গবন্ধুকে এবং তাকে মুক্তিদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেও জানালেন ভুট্টো। পরদিন পাকিস্তান সফরে আসছেন ইরানের শাহ। তিনি নাকি বঙ্গবন্ধুর দর্শনাগ্রহী। বঙ্গবন্ধুর আশঙ্কা দুজন মিলে তার মুক্তির শর্তারোপ করতে পারেন। তাই কোনো সুযোগ ভুট্টোকে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। বঙ্গবন্ধু ভুট্টোকে জানালেন-না, আমাকে যেতেই হবে, আমার জনগণ অপেক্ষা করছে। আমার আর থাকার উপায় নেই। আমার বাঙালির কাছে আমি ফিরে যেতে চাই।

নিরুপায় ভুট্টো পাকিস্তান আর বাংলাদেশ মিলে একটি কনফেডারেশনের কথা জানালেন, যার রাষ্ট্রপতি হবেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, আমার জনগণের সঙ্গে দেখা করতে হবে, আমার সময়ের প্রয়োজন, দেশে ফিরেই আপনাকে জানাব। বঙ্গবন্ধুকে দেশে পাঠানোর দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহমদ। রেড ক্রস কিংবা জাতিসংঘের বিমানে সরাসরি দেশে আসার ইচ্ছার কথা জানালে ব্রিটেনকে বেছে নেওয়া হয় এবং রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা বজায় রেখে ১৯৭২ সালে ৮ জানুয়ারি লন্ডন পৌঁছে দেওয়া হয় বঙ্গবন্ধুকে। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে বঙ্গবন্ধুর আগমনের খবর জানিয়ে দেওয়া হলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড, দেশের বাইরে থাকলেও সব কর্মসূচি বাতিল করে দেশে ফেরেন এবং বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বরণ করেন।

সেখানে হোটেলে অবস্থানকালে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি আবেগঘন ভাষায় প্রবল আত্মবিশ্বাসী সুরে বলেন, ‘আমি কনডেম সেলে ফাঁসির অপেক্ষায় ছিলাম, বাঁচব কি মরব কিছুই জানতাম না, তবে জানতাম আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই।’ তখন হোটেলের বাইরে হাজার হাজার বাঙালি জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিয়ে সেখানকার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে। বঙ্গবন্ধুকে একনজর না দেখা পর্যন্ত কারো শান্তি নেই। মানুষের ভিড় দেখে ড. কামাল হোসেন নেমে আসেন হোটেলের বাইরের গেটে। কিন্তু কার কথা কে শোনে। বঙ্গবন্ধুকে না দেখলে কেউ এক চুলও নড়বেন না। বাইরের খবর শুনেই বঙ্গবন্ধু হোটেল ব্যালকনিতে এসে হাত নাড়েন হাসিমুখে। এ সময় স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয় অভিজাত মে-ফেয়ার এলাকা। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে রাজকীয় কমেট জেটবিমান ৯ জানুয়ারি সকাল ৭টায় জাতির পিতাকে নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে ১০ জানুয়ারি দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছে। সেখানে ২০টি দেশের রাষ্ট্রদূত অথবা কূটনীতিক প্রতিনিধি বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য উপস্থিত ছিলেন। তদানীন্তন সোভিয়েত ব্লকের রাষ্ট্রদূত, ব্রিটেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি, পশ্চিম জার্মানি, নরওয়ে এবং ডেনমার্কের প্রতিনিধিরা। আবদুস সামাদ আজাদ আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

ভারতের দিল্লি পালাম বিমানবন্দরেও হাজার হাজার মানুষের মিছিল। দিল্লির জনসাধারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে এক অভূতপূর্ব রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা প্রদান করে। রাষ্ট্রপতি ভিপি গিরি এবং প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ২১ বার তোপধ্বনি দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে রাজকীয় সম্মান জানান। বিমানবন্দরের লাউঞ্জে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ও স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কিছু সময় একান্তে বসেছিলেন, তখন বঙ্গবন্ধু ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছিলেন- আপনি অস্ত্র দিয়ে, অর্থ দিয়ে সাহায্য ও আশ্রয় দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের কঠিন দিনগুলোতে আপনি পাশে ছিলেন। আমি আপনার কাছে চিরঋণী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাছে অনুরোধ- ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ থেকে কখন ফিরিয়ে আনবেন। তখন শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধী বিস্মিত না হয়ে মহানুভবতার স্বরে বলেছিলেন, আপনি যেদিন চাইবেন সেদিন। দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র ২৪ দিনের মাথায় রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা নিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি আলাপ করে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি আদায় করে নেওয়া পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের স্বীকৃতির পথ সুগম হয়। ঢাকার আকাশে-বাতাসে সর্বত্র সাজসাজ রব। সেদিন ছিল সোমবার। বেলা ১টা ৫১ মিনিটে ঢাকার আকাশসীমায় ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানটি দেখামাত্রই অপেক্ষমাণ জনসমুদ্র উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মুজিব বাহিনীর চার প্রধান, কেন্দ্রীয় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা মুখে হাসি আর চোখে জল নিয়ে মহান নেতাকে হূদয় নিংড়ানো ভালোবাসা ও অভ্যর্থনা জানান। ডাকসুর সাবেক ভিপি তৎকালীন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ ফুল দিয়ে জাতির জনককে বরণ করেন। এ সময় বঙ্গবন্ধুর সংযমের সব বাঁধ ভেঙে যায়। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। সে ছিল এক অবিস্মরণীয় অভূতপূর্ব মুহূর্ত। ইতিহাসের ইতিহাস। ৩১ বার তোপধ্বনি দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাওয়া হয় মঞ্চের দিকে। ফুল ছিটানোর বৃষ্টি হয় চারদিকে। সেনা, বিমান, নৌবাহিনী রাষ্ট্রপ্রধানকে গার্ড অব অনার প্রদর্শন করেন। বিমানবন্দর থেকে বিকাল ৪টায় রেসকোর্স ময়দানে যান বঙ্গবন্ধু। রাস্তায় সময় লাগে ২ ঘণ্টা ১৩ মিনিট। মঞ্চের ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকালেন, নিজে কাঁদলেন, লাখো মানুষকে কাঁদালেন। দীর্ঘ কারাবাসের ক্লান্তিতে মলিন বদনে মুখ যেন তাঁর চন্দ্রমাখা হাসি। তারপর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জনসমুদ্রে ঐতিহাসিক ভাষণে বললেন, ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব- আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা...। এটি একটি আদর্শ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হবে। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি বানালেন। তার ৫৪ বছরের জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর গোটা জীবন কেটেছে আন্দোলন-সংগ্রামে। জীবন দিয়ে তিনি বাঙালির ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাঙালি-বাংলাদেশ-বঙ্গবন্ধু এক সুতায় গাঁথা।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক   

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads