• শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ৫ মাঘ ১৪২৪
১০ জানুয়ারি ও বিজয়ের কথা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

সংরক্ষিত ছবি

মতামত

১০ জানুয়ারি ও বিজয়ের কথা

  • মামুন মুস্তাফা
  • প্রকাশিত ১০ জানুয়ারি ২০১৯

আজ ১০ জানুয়ারি। সাতচল্লিশ বছর আগে ১৯৭২ সালের এই দিনে বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম অগ্নিপুরুষ বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। আমাদের মুক্তিসংগ্রামের ধারাবাহিক ইতিকথা, একজন মুজিবের মহানায়ক হয়ে ওঠার গল্প কিংবা স্বাধীন বাংলার মুক্তিকামী মানুষের উচ্ছ্বাস আমার এ লেখার পটভূমি নয়। বলতে চাই আমাদের বিজয়ের কথা, যে বিজয়ের পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। তার প্রতিটি পথে শেখ মুজিবুর রহমান এই একটি নাম কীভাবে মন্ত্রের মতো জাগরণে, স্বপ্নে, রণাঙ্গণে, এমনকি আমাদের সাহিত্যে জায়গা করে নিল— তা আমাদের অনুধাবনের বিষয় হওয়া উচিত বলে মনে করি।

আমার জন্মলগ্নের বিজয়কে আমি দেখিনি। কিন্তু জ্ঞান হওয়ার পর প্রতিটি বিজয় উৎসব প্রত্যক্ষ করেছি। ১৬ ডিসেম্বর— এই একটি দিন কি বাঙালির বিজয়ের দিন? অথচ এ বিজয়ের প্রস্তুতিপর্ব ছিল দীর্ঘ, রক্তাক্ত আর কণ্টকময়। শুধু ধর্ম দিয়ে গঠিত রাষ্ট্র বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। আচার-প্রথা-সংস্কৃতির বৈপরীত্যে তাই বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আর সেই সত্তায় প্রথম আঘাত আসে বাংলা ভাষার মর্যাদার দাবি প্রসঙ্গে। একই সঙ্গে বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতির মনন ও মেজাজের প্রতীক রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণাও বাঙালিকে করে তোলে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ।

সাতচল্লিশের দেশভাগের শেকড়বিচ্যুতি থেকে উত্তরণের পথে যখন বাধা হয়ে দাঁড়ায় তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী, সঙ্গে এদেশীয় দোসর, তখন বাঙালির সামাজিক ও রাজনৈতিক চরিত্রে অব্যবস্থা, লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা ও ধর্মান্ধ জাতীয়তা এবং পরবর্তীকালে সামরিক শাসনের জাঁতাকলে মধ্যবিত্তের বিকাশের ধীর, সুষ্ঠু ও আত্মপ্রত্যয়ী ধারাটিকে ক্রমান্বয়ে নিষ্ক্রিয় করে তোলে। সে সময়কার পাকিস্তান শাসনযন্ত্রে যে ফ্যাসিবাদী স্বেচ্ছাচারের প্রকাশ ঘটে, তার অনুরূপ চরিত্রের প্রতিফলন ঘটে সে সময়ের বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। সেই প্রেক্ষাপটে একজন নেতার খুব প্রয়োজন ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান— সেই নাম, যিনি বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন বাঙালির মর্মব্যথা, হয়তো কথাও।

যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ‘আইয়ুবের বেসিক ডেমোক্র্যাসি’, ৬ দফা, ১১ দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা— এসব কিছুর সূচাগ্র ভেদ করে বাঙালির বিশ্বাসের প্রতীক শেখ মুজিবুর রহমান এগিয়ে গেলেন বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষায়। সুতরাং এ সময়ে রাষ্ট্রচরিত্রে যে নৈরাজ্য ও অবক্ষয়, আবিলতা ও অশ্রু— এ সবকিছু ঠাঁই করে নিয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ও তার মানসচারিত্র্যে। তারই প্রতিফলন ঘটে শেখ মুজিবুর রহমানের সমস্ত অবয়বে। তাকে কেন্দ্র করে কবি লিখতে বাধ্য হন— “আমি যখন গ্রামে পৌঁছলুম তখন দুপুর,/...খবর পেয়ে যশমাধব থেকে আসবে ন্যাপকর্মী ইয়াসিন,/তিন মাইল বিষ্টির পথ হেঁটে রসুলপুর থেকে আসবে আদিত্য।/রাত্রে মারাত্মক অস্ত্র হাতে নিয়ে আমতলা থেকে আসবে আব্বাস।/ওরা প্রত্যেকেই জিজ্ঞেস করবে ঢাকার খবর:/— আমাদের ভবিষ্যৎ কী?/— আইয়ুব খান এখন কোথায়?/— শেখ মুজিব কি ভুল করছেন?/— আমার নামে কতদিন আর এরকম হুলিয়া ঝুলবে?/... কণ্ঠ থেকে অক্ষম বাসনার জ্বালা মুছে নিয়ে বলবো:/‘আমি এসবের কিছুই জানি না,/আমি এসবের কিছুই বুঝি না’।” (হুলিয়া : প্রেমাংশুর রক্ত চাই/নির্মলেন্দু গুণ)   

সেই বিপন্ন সময়ে যেভাবে নেমে এসেছিল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবদমন, তার পাশাপাশি বাঙালিকে লড়তে হয়েছিল তার ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির জন্যে। আর সেই লড়াই চূড়ান্ত লড়াইয়ে পরিণত হলো মুক্তির সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের বীভৎসতা বাংলাদেশের মানুষের ভাবনায় ছিল না, নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলো। নয় মাসের দীর্ঘ মুক্তির যুদ্ধে বাংলাদেশ শুধু যে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো তা-ই নয়, অনেক প্রাণহানি, নারীর সম্ভ্রম হারানোর পাশাপাশি জন্ম নিল অনেক যুদ্ধশিশু এবং জাতিকে মেধাশূন্য করা হলো সুপরিকল্পিতভাবে। কিন্তু এসবের জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। তাই বাঙালির বীর মহাকালের নায়ক শেখ মুজিবুর রহমান বন্দি হলেন ঠিকই, মৃত্যুভয়ে ভীত ছিলেন না। তাই তো ১০ জানুয়ারি তার প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাঙালির সত্যিকারের স্বাধীনতা অর্জিত হলো।

বাঙালির মহানায়ক ফিরে এসেই দেশগড়ার যে রূপরেখা দিলেন, সেখানে মা-মাটি-মানুষের নিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু নিরাপত্তার আখরে বাংলাদেশের আপামর মানুষ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে স্বাধীনতার যে বীজমন্ত্র হূদয়ে ধারণ করেছিল, তার বিনাশ অতি দ্রুত যেন ঘটতে থাকে কিছু পরাজিত মুখোশের ছদ্মাবরণে। যখন দেখি রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরেই দানা বাঁধে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ক্রমবিলীয়মান রূপ, স্বৈরতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা এবং অপারেশন থিয়েটারে কাটাছেঁড়ার মতো ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে যে যার মতো সংবিধানকে করল ক্ষতবিক্ষত। অথচ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। সেই অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বলি হতে হলো ধর্মান্ধ মুসলমান নামের নরপিশাচদের হাতে সংখ্যালঘু অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর সঙ্গে উদার মুক্তমনা মুসলমান সম্প্রদায়কেও। তাই বুঝি হত্যা করা হলো আমাদের সূর্যসন্তান বুদ্ধিজীবীদের। পাশাপাশি নিরীহ, খেটে খাওয়া ধর্মপ্রাণ মুসলমান, তারাও রেহাই পেল না হানাদার বাহিনীর হাত থেকে। তেমনই একজন পটুয়াখালীর জোবেদা খাতুন। স্বামীকে হারিয়ে তিনি হলেন যুদ্ধশিশুর মাতা। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে তার স্বীকৃতি মেলেনি। তার ভাষাতেই বলা যাক, ‘মুক্তিযুদ্ধে স্বামীকে হারিয়েছি। শিকার হয়েছি পাশবিক নির্যাতনের। গর্ভে ধারণ করেছি যুদ্ধসন্তান। এত আত্মত্যাগের পর পেয়েছি প্রবঞ্চনা। আমি এখন শয্যাশায়ী। মৃত্যুর পর আর কী হবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়ে।’ (১৬ ডিসেম্বর ২০১৪, বিজয় দিবস সংখ্যা/দৈনিক ইত্তেফাক)

সুরবালা সিং, রহিমা বেওয়া, প্রভা রাণী মালাকার কিংবা খুলনার উন্মাদিনী গুরুদাসী— এসব বীরাঙ্গনার আজ আর কিছু চাওয়ার নেই। রাষ্ট্রের স্বীকৃতি তাদের জোটেনি কপালে অথবা রাষ্ট্র তাদের দেখতে চায়নি, যখন রাষ্ট্রই গোপন পথে বিক্রি করেছে চড়া দামে কেনা জনতার স্বাধীনতাকে স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি রাজাকার এবং মুখোশধারী মুক্তিযোদ্ধার কাছে। অথচ আমাদের অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা কী অসহ্য যন্ত্রণা, দুর্গম পাহাড়সম বাধা আর হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়ে দেশমাতৃকার স্বাধীনতায় শত্রুর মোকাবেলা করেছেন পথে-প্রান্তরে। একদিকে অস্ত্র হাতে বীরযোদ্ধাদের শত্রু খতম, অন্যদিকে প্রবাসী অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের তৎপরতাসহ স্বাধীন বাংলা বেতারের কণ্ঠস্বর, এম আর আখতার মুকুলের ‘চরমপত্র’ পাকিস্তানি সেনাদের ললাটে লিখে দিল চরম পরাজয়। অথচ আমাদের সম্মিলিত শক্তি ও তেজ ’৭৫-পরবর্তী স্বৈরশাসকদের অবিবেচকপ্রসূত কার্যক্রমের ফলে ধূলিসাৎ হতে বসেছিল। এ থেকে জাতিকে উদ্ধারের ক্ষমতাও যেন হারিয়ে ফেলেছিল বিপজ্জনক বুদ্ধিজীবী, বিবেকবর্জিত রাজনীতিবিদ এবং আত্মমত্ত প্রশাসন। কেননা চিরকাল তারা গণযুদ্ধের মওকা থেকে ব্যক্তিগত ফায়দা ও মুনাফা তুলে নিতে ব্যস্ত। আর তাই বছর বছর বাঙালির বিজয় উৎসবে পুরনো রেকর্ডই বেজে চলেছে। কবে মিলবে এ জাতির পূর্ণ স্বাধীনতা? এমনি এক সংকটে যখন বার বার ফিরে আসে বাঙালির ভরসাস্থল শেখ মুজিবুর রহমানের মুখচ্ছবি, তখনই আশার আলোকবর্তিকা হাতে এগিয়ে এলেন জাতির পিতার যোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনা।

আত্মমর্যাদাশীল জাতি গঠনে এখন প্রয়োজন তারুণ্যের শক্তি। যে তরুণের রক্তশোণিত বেয়ে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সেই বিজয়ধারা সমুন্নত রাখতে আজ নতুন প্রজন্মের তারুণ্যকে এগিয়ে আসতে হবে ইতিহাসের সত্য-স্মারকচিহ্নিত পথ বেয়ে। এই সত্যকে বুঝতে পেরে, ওই তরুণকেই উদারচিত্তে গ্রহণ করে নিয়েছেন আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। এখন তিনি তারুণ্যের শক্তিকে সাথী করে সামনে থেকে জাতিকে নেতৃত্ব দেবেন। ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশ আজ মনে করে, জাতির পিতার স্বপ্নপূরণে বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাশীল রাষ্ট্র হিসেবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কোনো দ্বিতীয় নেই। বাঙালির বিজয়গাথা অক্ষুণ্ন রাখতে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বর্তমান সরকারকে সহযোগিতা করা। সুতরাং ১০ জানুয়ারি শুধু দিবস পালন নয়, আজ আমাদের অঙ্গীকারের দিন। তবেই যুগে যুগে আমাদের বিজয় উৎসবে বাঙালি মুক্ত কণ্ঠে ধারণ করতে সক্ষম হবে কবিশ্রেষ্ঠ শামসুর রাহমানের স্বাধীনতার অমোঘ কবিতা— ‘স্বাধীনতা তুমি/শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা/স্বাধীনতা তুমি/পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।/...স্বাধীনতা তুমি/বাগানের ঘর, কোকিলের গান,/বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,/যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।’

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads