• শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২১ কার্তিক ১৪২৪
ads

মতামত

নকল ও ভেজাল ওষুধ নিয়ন্ত্রণ জরুরি

  • মাহমুদুল হক আনসারী
  • প্রকাশিত ১৪ জানুয়ারি ২০১৯

এটা অত্যন্ত ভয়াবহ ব্যাপার যে, জীবন রক্ষাকারী ওষুধও এখন ভেজাল ও মানহীন। এসব ওষুধ খেলে রোগ বালাই থেকে মুক্তি পাওয়া তো দূরের কথা উল্টো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় জীবনহানির আশঙ্কা রয়েছে। নকল ও ভেজাল ওষুধ নিয়ে কম কথা হয়নি। কিন্তু এর বিপরীতে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা সন্তোষজনক নয়। রোগব্যাধি হলে ওষুধ খেয়ে জীবন রক্ষা করে মানুষ। কিন্তু সেই ওষুধেও ভেজাল থাকাটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। মানহীন ও ভেজাল ওষুধ খেয়ে রোগ সারার বদলে আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, দেশে ওষুধের উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত কোনো স্তরেই সরকারি পরীক্ষাগারে মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয় না। বিপণনের পর অধিদফতরের কর্মকর্তারা বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠান। তখন ওষুধের মান জানা যায়। এর আগ পর্যন্ত পরীক্ষাহীন, মান না জানা ওষুধই ব্যবহার করে মানুষ। এভাবেই ওষুধ কোম্পানিগুলো এ দেশের মানুষকে রীতিমতো গিনিপিগে পরিণত করেছে।

এক হিসাবে দেখা যায়, প্রতিবছর ১২ হাজার আইটেমের ওষুধ বাজারে আসছে। কিন্তু ওষুধ প্রশাসনের যে লোকবল ও যন্ত্রপাতি রয়েছে তাতে তারা মাত্র সাড়ে তিন হাজার আইটেম ওষুধের নমুনা পরীক্ষা করতে পারে। বাকি ৭০ শতাংশ ওষুধের মান যাচাইহীন অবস্থায় রয়ে যায়। দুঃখজনক হচ্ছে, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরি ও বাজারজাত দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ওষুধ উদ্ভাবনকারী ছাড়া জেনেরিক বা বর্গনামে ওষুধ প্রস্তুত করাই হচ্ছে নকল ওষুধ। তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি দেশেই বর্গনামে ওষুধ প্রস্তুত চলছে। ফলে ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। অনেক কোম্পানি জেনেশুনে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এ অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। অথচ বাংলাদেশে ওষুধ একটি বিকাশমান শিল্প। ১২৭টি দেশে আমাদের তৈরি ওষুধ রফতানি হচ্ছে। রফতানি আয় বৃদ্ধিতেও ওষুধ শিল্প বড় ভূমিকা রাখছে। শুধু তাই নয়, জীবন রক্ষাকারী মূল্যবান অনেক ওষুধও এখন আমাদের দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে। সার্বিক বিবেচনায় শুধু জনস্বার্থই নয়, কোম্পানিগুলোর নিজ স্বার্থেও ওষুধের মান ঠিক রাখা অত্যন্ত জরুরি।

গত জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংরক্ষিত আসনের এক সদস্যের প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ভেজাল ওষুধ বন্ধে সরকাকের কিছু পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন,  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গুড  ম্যানুফ্যাকচারিং প্রাকটিস (জিএমপি) গাইডলাইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় এবং ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনের দায়ে ৮৬টি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাময়িক এবং ১৯টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয়। এ ছাড়া ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ উৎপাদনে ২০১৬ সালের  জানুয়ারি থেকে ৬১টি পদের রেজিস্ট্রেশন বাতিল ও ১৪টি পদের রেজিস্ট্রেশন সাময়িক বাতিলসহ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে মন্ত্রী তখন সংসদে জানান। মনে রাখা দরকার ওষুধ কোনো সাধারণ পণ্য নয়। জীবন রক্ষার জন্য ওষুধের গুরুত্ব অপরিসীম। এজন্য ওষুধ কোম্পানিগুলো যাতে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে সেটি জোর নজরদারিতে রাখতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে সরকারের অর্জন কম নয়। কিন্তু স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে সেটি ভেস্তে যাক এটি কাম্য হতে পারে না। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এ বিষয়ে জনগণ সরকারের কঠোর অবস্থান দেখতে চায়। বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির এমআরদের (মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ) দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসার সময় এসব এমআরের তৎপরতা রোগীদের অসহ্য করে তোলে। তাদের অনিয়ন্ত্রিত ঘোরাফেরায় চিকিৎসকও অস্বস্তিতে পড়েন। ওষুধ কোম্পানির নানা ধরনের প্রলোভনে পড়ে চিকিৎসককে প্রেসক্রিপশনে সঠিক চিকিৎসা প্রদানে হিমশিম খেতে দেখা যায়। চেম্বারের বাইরে অপেক্ষমাণ এসব রিপ্রেজেন্টেটিভ রোগীদের থেকে প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে মোবাইলে ছবি তুলে কোম্পানির অফিসে সাপ্লাই করে। ওষুধ কোম্পানি, ডাক্তার ও এমআরদের এসব অসৌজন্য তৎপরতা বন্ধ করতে হবে। এসব নিয়ে কোনো অবস্থায় কোনো অন্যায় কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া সমুচিত নয়। তাই বর্তমান সরকারের সফলতার সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতকে আরো এগিয়ে নিতে হলে ওষুধের ভেজাল প্রতিরোধ করতে হবে। মান নিয়ন্ত্রণ ও ভেজালবিরোধী নজরদারি জোরদার করতে হবে।

 

লেখক : প্রাবন্ধিক

সয.যড়য়ঁবধহংধৎর—মসধরষ.পড়স

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads