• শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
ads

মতামত

শিশুর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে অভিভাবকের ভূমিকা

  • মুফতি আহমদ আবদুল্লাহ
  • প্রকাশিত ১৬ জানুয়ারি ২০১৯

শিশুর সঠিক বিকাশের লক্ষ্যে তার শারীরিক, মানসিক ও আবেগিক বিকাশের জন্য পরিবারের অভিভাবকদের বিশেষ করে মা-বাবার ভূমিকা প্রধান। শিশুর প্রতিভা সঠিক বিকাশের ক্ষেত্রে তার মানসিকতা, চাহিদা, মেধা, কোনো কিছু গ্রহণ করার ক্ষমতা, ঝোঁক বা প্রবণতার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানকে পড়াশোনার জন্য অতিমাত্রায় চাপ প্রয়োগ করেন। এ চাপ যুগপৎ শারীরিক ও মানসিক হয়ে পড়ে। এ ছাড়া আছে নানা রকম আদেশ-নিষেধের দেয়াল। আরো কত বিধি-নিষেধ ও কড়াকড়ি আরোপিত হয় শিশুর ওপর। সে সঙ্গে শারীরিক নির্যাতনও চলে। অনেক পরিবারে এমনও দেখা গেছে, সংসারের কনিষ্ঠ সদস্যের ওপর সবার সমান কর্তৃত্ব ও শাসন চলে। এতে করে শিশুর মাঝে একটা অসহায়বোধ কাজ করে, যা পরবর্তীকালে তাকে দুর্বল মানসিকতাসম্পন্ন বা ভীতু প্রকৃতির করে তোলে অথবা করে তোলে বিদ্রোহী।

আমরা জানি, প্রতিটি শিশু তার নিজস্ব প্রতিভা নিয়ে জন্মায় এবং উপযুক্ত পরিচর্যায় তার সে প্রতিভা ডালপালা ছড়িয়ে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়। তাই কবির ভাষায় বলতে হয়, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুর অন্তরে’। অন্যদিকে অসুস্থ প্রতিকূল পারিপার্শ্বিক আবহ শিশুর প্রতিভাকে ধ্বংস করে। অনুকূল পরিবেশে শিশুর মেধা ও সৃজনশীলতা ভালোর দিক পরিচালিত হয়। মূলত একটি শিশু সঠিক পরিচালনা ও দিকনির্দেশনার মাঝে বড় হলে সে হতে পারে একজন গুণী মানুষ।

মধ্যবিত্ত পরিবারে দেখা গেছে, বাচ্চাদের শাসন করার জন্য হাতের কাছে বেত রাখা হয়। রোজ সন্ধেবেলা বাচ্চাদের গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে দিয়ে অভিভাবকরা পড়শিদের বাসায় খোশগল্পে মেতে ওঠেন। এদিকে গৃহশিক্ষক চলে যাওয়ার পর অভিভাবকরা ফিরে এসে দেখেন, বাচ্চারা মারামারি, হাতাহাতি, দুষ্টুমি, হৈচৈ শুরু করেছে। অভিভাবকরা নিষ্ঠুরভাবে শাস্তি দিয়ে এই হৈচৈ থামান। এই অতিশাসনের পরিণতি ভালো হতে দেখা যায় না। কেননা অতিরিক্ত শাসনে যেমন শিশুর মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, তেমনি আবার বিত্তবান পরিবারের লাগামহীন শাসনহীন সন্তানরাও অঢেল বিলাসিতার ফলে হয় যথেচ্ছাচারী ও বিপথগামী।

উচ্চবিত্ত পরিবারের অভিভাবকদের মধ্যে ভালোবাসাহীন সম্পর্কও অনেক সময় সন্তানদের যথেচ্ছাচারী ও বেপরোয়া জীবন যাপনে উদ্বুদ্ধ করে। অনেক পরিবারের অভিভাবকদের মধ্যে মায়েরা সমাজসেবার নামে সংসার, সন্তানকে আয়া-বাবুর্চির জিম্মায় রেখে বাইরে বেড়ান এবং বাবা ব্যবসার কাজে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ান। অনুরূপ অভিভাবক মা-বাবার সান্নিধ্যবঞ্চিত এসব সন্তান বন্ধুনির্ভর হয়ে পড়ে। এদের পক্ষে একসময় খারাপ বন্ধু-বান্ধবদের পাল্লায় পড়ে মাদকদ্রব্যের কাছে সমর্পিত হয়ে পড়াটাও অস্বাভাবিক নয়।

কথায় আছে, ‘সকালের সূর্য দেখেই সারাদিনের আবহাওয়া অনুমান করা যায়।’ ঠিক তেমনি প্রাক-প্রাথমিক স্তরের শিশুর চরিত্র গঠনের ওপর শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। এজন্য অভিভাবককে তার সন্তানের সুশিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আর এ সুশিক্ষার পূর্বশর্ত হলো, ধর্মীয় অনুশাসন। ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে জীবনের মৌলিক দর্শনের পরিচয় তাদের অবশ্যই করিয়ে দিতে হবে।

অপরদিকে শিশুরা অনুকরণপ্রিয়। হাঁটি হাঁটি পা-পা করে শিশু বড় হতে থাকে এবং চারপাশ যা দেখে তা-ই অনুকরণ করতে পছন্দ করে। এজন্য শৈশব থেকে শিশুর নির্মল ও সুন্দর চরিত্র গঠনের জন্য অভিভাবককে খুব সতর্ক থাকতে হবে, যাতে তাদের সামান্যতম ভুলে মাশুল সন্তানের ওপর না বার্তায়। এজন্য অভিভাবকদের ধৈর্য, সহনশীলতা, সংযম ও সমঝোতা দেখাতে হবে। স্নেহ-প্রীতি, ভালোবাসা, আচার-আচরণের প্রতিও লক্ষ্য করতে হবে। কেননা অভিভাবকদের অবহেলা এবং দুর্বলতার কারণেও শিশুরা তাদের ভবিষ্যৎ সোনার জীবন হারিয়ে অবক্ষয়ের পথ বেছে নিচ্ছে। সুতরাং এ ব্যাপারে অভিভাবকদের সচেষ্ট হতে হবে আন্তরিকতার সঙ্গে, যেন কখনো কোনো শিশুর প্রতিভা বিকাশে বাধার সৃষ্টি না হয়। এই প্রত্যাশা সব অভিভাবকের প্রতি।

 

লেখক : শিক্ষক, রসুলপুর জামিয়া ইসলামিয়া, ঢাকা

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads