• শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০১৯, ৮ চৈত্র ১৪২৪
ads

মতামত

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং রাষ্ট্রভাষার হালচাল

  • জি এম শহিদুর রহমান
  • প্রকাশিত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

আমরা বাঙালি জাতি হিসেবে খুবই গর্বিত। আমাদের আছে মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করার মতো গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। সত্যিই একথা ভাবতে বুকটা গর্বে ভরে ওঠে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে পাকিস্তানিরা আমাদের মায়ের মুখের ভাষা তথা মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। শুরু হয় বাংলার দামাল ছেলেদের ইতিহাসখ্যাত ভাষা আন্দোলন। এই ইতিহাস কারোর  অজানা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের ভাষা আন্দোলন কী উর্দু ভাষার বিপক্ষে ছিল, নাকি আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য ছিল? অবশ্যই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষাই ছিল আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। কোনো অবস্থাতেই উর্দু বা অন্য কোনো ভাষার বিরুদ্ধে ছিল না এই আন্দোলন। আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে আমরা পেলাম আমাদের মাতৃভাষা দিবস যা পালিত হয় ২১ ফেব্রুয়ারি। এরপর ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায় বাংলা ভাষা।

কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে আমাদের নিয়তি নির্ধারিত হলো এভাবে— যে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে জীবনের বিনিময়ে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায় করা হলো। সেই মাতৃভাষা দিবস পালন করতে হয় ২১ ফেব্রুয়ারি। আমাদের আন্দোলনের চূড়ান্ত রূপ লাভ করে বাংলা সন মোতাবেক ৮ ফাল্গুন, ইংরেজি ২১ ফেব্রুয়ারি। তাহলে আমাদের  মাতৃভাষা দিবস ৮ ফাল্গুন হওয়া উচিত ছিল কি-না? যখন আমাদের ভাষা দিবস আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হচ্ছে, তখন ইংরেজি তারিখ অনুসারে দিবসটি পালন নিয়ে প্রশ্ন তোলা নিতান্তই হাস্যকর মনে হতে পারে। হ্যাঁ, এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করছি না। ২০০০ সাল থেকে ইউনেস্কোর সদস্য দেশগুলো দিবসটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে পালন করছে। তাতে আমাদের বাংলা ভাষার মর্যাদা বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু ২০০০ সালের আগে আমাদের ভাষা দিবসটি বাংলা তারিখ অনুসারে ৮ ফাল্গুন হওয়া উচিত ছিল।

একবিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে বলতে গেলে গোটা দুনিয়া আমাদের মাতৃভাষাকে সম্মান জানিয়ে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ পালন করছে। কিন্তু আমরা দৈনন্দিন জীবনে বাংলা শব্দ চয়নে কতটা যত্নশীল? ইতোমধ্যে আমরা শিক্ষিত বাঙালিরা বাংলা ও ইংরেজির সংমিশ্রণে এক অদ্ভুত ‘বাংলিশ’ ভাষার প্রচলন করেছি।

পারস্পরিক ভাব বিনিময়কে সহজ করাই ভাষার প্রধান কাজ। আর সেটি করতে গিয়ে যদি বিদেশি শব্দ ব্যবহার করা হয়, তাতে অন্যায়ের কিছু নেই। কিন্তু সহজে ভাব বিনিময়ের জন্য পর্যাপ্ত বা প্রয়োজনীয় শব্দ বাংলা ভাষার শব্দভান্ডারে থাকার পরও বিদেশি শব্দ ব্যবহার করলে তাতে বাংলা ভাষার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। যেমন ‘আমাদের প্রাকটিক্যাল লাইফে বিদেশি শব্দের প্রয়োগ অ্যাভয়েড করা উচিত।’ বাংলা ভাষার সৌন্দর্য ও মর্যাদা রক্ষার্থে উল্লিখিত বাক্যটির পরিবর্তে এই বাক্যটি ব্যবহার করা বাঞ্ছনীয় ‘আমাদের ব্যবহারিক জীবনে বিদেশি শব্দের প্রয়োগ পরিহার করা উচিত।’

একবার আমাদের ভাষা দিবসে বাংলাদেশে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের নিয়ে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। ওই অনুষ্ঠানে এক মার্কিন ভদ্রমহিলা বলেছিলেন, ‘আপনারা বাংলাদেশিরা বাংলা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা। অথচ বাংলায় কথা বলার সময় আপনারা এত বেশি ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করেন যা আমাকে অবাক করে।’ মজার ব্যাপার হলো, উল্লেখিত ভদ্রমহিলা আধো আধো করে পুরো অনুষ্ঠানে বাংলায় কথা বলেছিলেন, একটি ইংরেজি শব্দও ব্যবহার করেননি। উপর্যুপরি অনুষ্ঠানের উপস্থাপক বার বার ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করায় তাকে হাতেনাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘এই যে আপনিও বার বার ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করছেন, কেন? হা হা হা...।’

একজন বিদেশি নাগরিক শতভাগ বাংলা শব্দ চয়নে কথা বললেন, আর আমরা? এর থেকে লজ্জাজনক ঘটনা আর কী হতে পারে?

গত জানুয়ারি মাসের গোড়ার দিকে জুমার নামাজ আদায় করে মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় এক কিশোর আমার হাতে রাজধানীর একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের প্রচারপত্র ধরিয়ে দিল। বাসায় ফিরে প্রচারপত্রটি পড়ে আমার চোখ রীতিমতো কপালে উঠল। কারণ স্বনামধন্য বিদ্যালয়টির বাংলায় লেখা ওই প্রচারপত্রে অন্তত পৌনে এক ডজন ভুল। বিদ্যালয় থেকে সাধারণত ছেলেমেয়েরা ভাষার ব্যবহার শিখবে, সেই বিদ্যালয়ের অবস্থা যদি এই হয় তাহলে  মাতৃভাষার ব্যাপারে আমরা যে কতটা অযত্নশীল তা সহজে অনুমান করা যায়।

গত বছর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়টির দুজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী। পরিতাপের বিষয় হলো, অনুষ্ঠান উপস্থাপনাকালে ওই দুজনই বার বার বিভিন্ন শব্দ ভুলভাবে উচ্চারণ করছিলেন। তাদের ভুল উচ্চারিত শব্দগুলোর কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি। যেমন— অনুষ্ঠান, শ্রদ্ধেয়, মিষ্টি ও স্বাগতম ইত্যাদি।

উল্লেখিত শব্দগুলো তারা এভাবে উচ্চারণ করছিলেন, যথাক্রমে— ওনুস্ঠান্, চ্রোেদয়, মিিট, সাগতোম। কিন্তু শব্দগুলোর সঠিক উচ্চারণ হবে যথাক্রমে— ওনুশ্ঠান্, শ্রোেধয়ো, মিিট, শাগোতম্। এখানে প্রশ্ন হতে পারে— উপস্থাপকদ্বয়ের বাকযন্ত্রের ত্রুটি বা আঞ্চলিকতার কারণে এমনটি হতে পারে। বরং তারা বেশি ঢং করে বলতে গিয়ে বিকৃত উচ্চারণ করছিলেন। বিকৃত উচ্চারণে কী এমন মহত্ত্ব আছে তা আমার বুঝে আসে না। একদিন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে রাজপথে নেমে জীবন দিয়েছিলেন, আর আজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা (সবাই নয়) শব্দকে বিকৃতভাবে উচ্চারণ করে নিজেদের স্মার্ট মনে করেন।

আন্দোলন-সংগ্রাম, বুকের তাজা রক্ত ও জীবনের বিনিময়ে আমাদের মাতৃভাষার যে মর্যাদা আমরা অর্জন করেছিলাম, সে ভাষার প্রতি ন্যূনতম উদাসীনতা কাম্য নয়। বলা হয়ে থাকে, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। সংগত কারণে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় ব্যবহারিক জীবনে বাংলাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তবে তার অর্থ এই নয় যে, ইংরেজি বা অন্য কোনো ভাষা শেখা বা জানা যাবে না। বিশ্বায়নের এই যুগে বিশেষ করে ইংরেজি জানা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তবে বাংলা ও ইংরেজির সংমিশ্রণ পরিহারে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। বেঁচে থাকুক বাংলা, সুরক্ষিত হোক ভাষার স্বকীয়তা।

 

লেখক : প্রভাষক, ঢাকা মহিলা কলেজ

s.rahman.jnu@gmail.com

আরও পড়ুন



বাংলাদেশের খবর
  • ads
  • ads